বাংলার মিষ্টি : স্বাদ এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

বাংলার মিষ্টি : স্বাদ এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

—‘আপ কা গাঁও কাঁহা হ্যায় ? ’
—‘আজ্ঞে কলকাত্তা হ্যায়… ’
—‘রসগুল্লা আওর মিশ্টি দই …’হা হা হা !
কথা হচ্ছিল এলাহাবাদে গিন্নির মামাদের মিষ্টির দোকানে বসে । প্রশ্নকর্তা এলাহাবাদী, গালে পান ঠুসে মুখ উঁচু করে কথা বলছে আরে মাঝে মাঝেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে পানের পিক । যদিও অদ্ভুত কায়দায় সেটা পুনরায় প্রবেশ করাচ্ছে মুখগহ্বরে !
অবাঙালী হিন্দী ভাষীদের নিয়ে এই এক মুসকিল, যেন রসগুল্লা ছাড়া বাঙালীর আর কোন মিষ্টি নেই ! আদ্যাখলাপনা দেখলে গা জ্বলে যায় । বাংলার তো কতই মিষ্টি….লেডিকেনি, ল্যাংচা, কালোজাম ,এক পান্তুয়ারই তো অষ্টোত্তর শতনাম !

ক্যাশে বসে শুনছিলেন গিন্নির বড়োমামা , শুনে বললেন না বাবাজী এগুলো পান্তুয়া’র অন্য নাম নয়, ভাই বহেন বলতে পারো ! তবে একটা গল্প বলি শোনো । উনিও মুখের মধ্যে জর্দা সহ দুটো পান ঠুসে শুরু করলেন …..

এক পরিবারে গিন্নির নাম ক্ষীর আর কর্তা হলেন গিয়ে ছানা । ষষ্টী-ঠাকরুনের আশীর্বাদে সাত সন্তান নিয়ে তার ভরা সংসার ; পান্তুয়া, লেডিকেনি, কালোজাম, গুলাবজামুন, লালমোহন, ল্যাংচা আর নিকুতি৷

আরো পড়ুন:  নারকেলডাঙার কাছে তাঁর নামে একটি রেলস্টেশন আছে,কিন্তু আমরা কি মনে রেখেছি গুরুদাস ব্যানার্জীকে?

পরিবারের প্রথম সন্তান ‘পান্তুয়া’র জন্ম লগ্ন নিয়ে সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যায়না, তবে উনি জন্মেছেন তোমাদের বাংলায় । ‘পান্তুয়া’র কারিগর হিসাবে যার নাম সর্বাগ্রে আসে তিনি রানাঘাটের জগু ময়রা বা যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিক। তারা বংশ পরম্পরায় এখনও পান্তুয়া প্রস্তুত করে চলেছেন এবং জগু ময়রার নামে সেই দোকান আজও আছে।

‘লেডিকেনি’র জন্ম হয় কলকাতায়, বৌ বাজারের স্বনামধন্য মিষ্টির দোকান ভীম চন্দ্র নাগ এর আঁতুড়-ঘরে, সালটা বোধহয় ১৮৫৬ ; ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী (Charlotte Canning) লেডি ক্যানিং-এর জন্মদিনের স্মারক হিসেবে।

‘কালোজাম’ সম্পর্কে বিশেষ কিছু ধারণা দিতে পারবো না; শুধু জানি এতে খোয়া ক্ষীরের পরিমান বেশি থাকে, আর থাকে চিনি, তাই ভাজলে কালো হয়ে যায়। গায়ের রং কালো বলে বাপ-মা আদর করে নাম রেখেছিল ‘কালোজাম’।

আরো পড়ুন:  কলকাতায় মটন 'প্যান্থারাস'-এর একমাত্র ঠিকানা প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো শ্যামবাজারের বড়ুয়া এন্ড দে ফাস্ট ফুড সেন্টার

চতুর্থ সন্তান ‘গোলাপজামের’ বিয়ে হয়েছিল এদিকের এক অবাঙালি পরিবারে ; তাই সে আজ নাম বদলে হয়েছে ‘গুলাবজামুন’। এর পেটের ভিতরটা ফাঁপা নয়, নিরেট ।

‘ল্যাংচা’র জন্ম কালনায়, এ নিয়ে একটা মজার কাহিনী প্রচলিত আছে। কৃষ্ণনগরের রাজপরিবারের এক মেয়ের বিয়ে হয় বর্ধমান রাজ-পরিবারে। নতুন বৌ মিষ্টি মুখে দেয়না, সীতাভোগ এর দিকে মুখ ভেটকে তাকায়; বারবার কাকুতি মিনতি করার পর জানা যায়, তার বাপেরবাড়িতে এক ময়রা রোজ মিষ্টি নিয়ে আসতো, অনেকটা পান্তুয়ার মতো দেখতে কিন্তু একটু লম্বাটে, অপূর্ব তার স্বাদ। রাজার মেয়ে বলে নাম জানার দরকার পড়েনি, সে কোথায় থাকে তা জানেনা, তবে লুকিয়ে সেই দেবভোগ্য মিষ্টির কারিগরকে সে দেখেছে। লোকটি খুঁড়িয়ে হাঁটে তাই মিষ্টিটার কথায় তার মাথায় আসে ‘ল্যাংচা’ শব্দটা। খোঁজ খোঁজ.. অবশেষে কালনায় পাওয়াগেলো সেই ময়রাকে। রাজারাজরার ব্যাপার, ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে; কারিগরের পুরো গুষ্টিকে নাদিয়া থেকে বর্ধমান উঠিয়ে নিয়ে আসা হলো, এরাই বর্ধমানের বিখ্যাত ল্যাংচার জাদুকর, যে জাদু আজ ও অব্যাহত।

আরো পড়ুন:  রসমুন্ডির পায়েস আর শহরের অন্যতম সেরা কচুরির স্বাদ ৭০ বছরের পুরনো 'মৃত্যুঞ্জয় এন্ড সন্স'এ

‘পান্তুয়া’ আর ‘লেডিকেনি’র সঙ্গে ‘লালমোহন’ এর চেহারার এতো মিল যে বাইরে থেকে দেখে তফাৎ বোঝা খুব মুশকিল; লালমোহন বাবুর পরিবারের একটা শাখা এখন থাকেন বাংলাদেশে, আর অন্য শাখাটি থাকেন নেপালে।

কনিষ্ঠটি অর্থাৎ ‘নিকুতির’ আজ কাল বড়ো একটা দেখা পাওয়া যায়না, মাঝে মাঝে সীতা-ভোগের মধ্যে দুএকটা নজরে পরে। পান্তুয়ার ক্ষুদ্র সংস্করণ এই নিকুতি শুনছি নাকি কালনার দিকে বাড়ি করে উঠে গেছে।

পেন্নাম করা খুব একটা আসেনা কিন্ত সেদিন গল্প শেষ হতে দিলাম বুড়োকে একটা ঠুকে ! খুশী হয়ে বুড়ো দোকানের একটা ছেলেকে হাঁক মেরে বললো, “দামাদজীকে চারঠো রসগুল্লা দো”
! ঘুরে ফিরে আবার সেই রসগোল্লা………😃😂

লেখক – স্বপন সেন

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।