ভারতে বাইসাইকেল নির্মাণ ও ব্যবসার প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি সুধীরকুমার সেন-কে

ভারতে বাইসাইকেল নির্মাণ ও ব্যবসার প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি সুধীরকুমার সেন-কে

বাঙালি ব্যবসা করে না – কথাটা আমরা প্রায়ই শুনতে পাই | কিন্তু কথাটি একেবারেই সত্যি নেই | সুধীর কুমার সেন। নামটা চট করে চেনা মুশকিল। আত্মীয়তা সূত্রে ইনি কবি কামিনী রায়ের ভাই এবং ডাক্তার নীলরতন সরকারের জামাই। কিন্তু তাঁর নিজের পরিচয়েই তিনি ছিলেন অনন্য | ভারতে সাইকেল নির্মাণ ও সাইকেল বিকাশের প্রাণপুরুষ হলেন সুধীরকুমার সেন | বাঙালি মনে রাখেনি |

সুধীর কুমার সেন | জন্ম ১৮৮৮ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি বরিশালের বাসন্ডায় | পিতা চণ্ডীচরণ সেন,মা বামাসুন্দরী দেবী | সুধীর কুমার সেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন | অধ্যাপক পার্সিভালের শিক্ষা তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তিনি গর্বের সঙ্গে বলতেন, প্রেসিডেন্সিই তাঁর জীবনের ভীত সুদৃঢ় করে দিয়েছিল | প্রভিন্সিয়াল এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে চাকরির সুযোগ পেয়েও স্বেচ্ছায় তা পরিত্যাগ করেন | সেই সময় বাংলায় স্বদেশী শিল্পের জোয়ার | গৌরমোহন দত্তের বোরোলীন,সুরেন্দ্রমোহন বসুর ডাকব্যাক,আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালস – গড়ে উঠছে একের পর এক শিল্প | আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯০৯ সালে মাত্র চারশ টাকা পুঁজি নিয়ে বন্ধুকে নিয়ে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন শ্রী সুধীর কুমার সেন | স্থাপনা করেন ‘সেন অ্যান্ড পন্ডিত কোং’ | ইউরোপ থেকে সাইকেল ও সাইকেলের পার্টস আমদানি করার ব্যবসা শুরু করেন তারা | সাইকেলের প্রচলন বৃদ্ধির জন্য ১৯১৭ সালে তিনি ‘ইন্ডিয়ান সাইকেল অ্যান্ড মোটর জার্নাল’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন | ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে বিলিতি সাইকেল শিল্পপতিদের আয়োজিত বাণিজ্যিক সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর থেকে প্রতিবছর ইংল্যান্ড, জার্মানী, আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে সেলস ও মার্কেটিংয়ের জন্য পরিভ্রমণ করতেন | ব্যবসার সূত্রেই পৃথিবী বিখ্যাত ব্রিটিশ সাইকেল কোম্পানি ‘র‍্যালে’র সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের |

আরো পড়ুন:  মৃৎশিল্প : আবহমান গ্রাম-বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৮৮৫ সালে যখন প্রথম ‘সেফটি বাইসাইকেল’ তৈরি হয়েছিল ইউরোপে | এর কিছুদিন পরেই যাত্রা শুরু করে ‘র‍্যালে’ কোম্পানী | পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সাইকেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম | পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা সুনামের সাথে ব্যবসা করত | এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে ব্যবসা করত ‘র‍্যালে’ | সুধীরবাবু বুঝলেন ‘র‍্যালে’-র এই ‘ব্র‍্যান্ডভ্যালু’কে কাজে লাগাতে হবে আমাদের দেশে | পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে কন্যাপুরে ১৯৫২ সালে সেন-র‍্যালে সাইকেল কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন সুধীর কুমার সেন |

সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরী এই কারখানায় বছরে ২ লক্ষ সাইকেল তৈরি করার পরিকাঠামো ছিল | এমনকি কারখানার পাশাপাশি কর্মী আবাসন, অফিস-বিল্ডিং তৈরী করেছিলেন সুধীর কুমার সেন | কর্মসংস্থান হয় বহু মানুষের | যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে, সঠিক গুণমান বজায় রেখে উৎপাদন শুরু হয় এই কারখানায় | প্রথমদিকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আসত ইংল্যান্ড ও জার্মানি থেকে | কয়েক বছরের মধ্যেই আসানসোলের কারখানাতেই যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু হয় | খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এই কোম্পানির সাইকেল | দামও রাখা হয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই | শুধু ‘র‍্যালে’ নয়, ‘হাম্বার’, ‘রবিনহুড’-এর মত সে যুগের বিশ্বখ্যাত ব্র‍্যান্ডের রোডস্টার সাইকেল এদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই কোম্পানীর হাত ধরে | শুধু ভারতে নয়, যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে বিদেশেও রফতানি হতে শুরু হয় ‘সেন র‍্যালে’ বাইসাইকেল ।

আরো পড়ুন:  শুধু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনই নয়,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন "মাসিমা" মনোরমা বসু

বেশ কয়েক দশক একচেটিয়া ব্যবসা করে ‘সেন র‍্যালে’ বাইসাইকেল | কিন্তু এই সময়ের মধ্যে দেশের অন্য রাজ্যেও চালু হয় নতুন সাইকেল কারখানা | তারা অনেক কম দামে সাইকেল বিক্রি শুরু করে | এরই মাঝে ১৯৫৯ সালের ২৮ আগষ্ট জার্মানীতে পরিভ্রমণকালীন সুধীর কুমার সেনের জীবনাবসান হয় | এর পাশাপাশি ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসতে থাকে মোটর-গাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা | সরকারও নানাভাবে উৎসাহ দিতে শুরু করে গাড়ি তৈরির শিল্পে | সমাজের মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মোটরগাড়ির প্রতি ঝোঁক অনেকটাই থাবা বসায় সেনর‍্যালের এই উঁচু মানের সাইকেল শিল্পে | সেইসময় সেন র‍্যালে আরও কিছুটা কম দামে সাইকেল বিক্রি শুরু করে | কিন্তু তাতেও প্রতিযোগিতায় তারা পেরে ওঠে না | কোম্পানির অবস্থা এর পর থেকে ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। ১৯৭৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কারখানার পরিচালন বিভাগ অধিগ্রহণ করে ও Cycle Corporation of India Ltd নামে কিছুদিন উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু নানা কারণে, বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমার পর তাও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় নয় দশকে |

আরো পড়ুন:  মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রফুল্লচন্দ্র রায় চালু করেছিলেন ওষুধ তৈরীর প্রথম ভারতীয় কোম্পানী

‘র‍্যালে’ ব্র‍্যান্ডটি কিন্তু আজও আছে | বিভিন্ন দেশের নানান নামী কোম্পানির সঙ্গে জোট বেঁধে, কখনও বা মিশে গিয়ে, তার উজ্জ্বল উপস্থিতি ধরে রেখেছে আজও | তাইওয়ান, চীন বা ভিয়েতনামে তৈরি ভালো মানের যন্ত্রাংশ পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড কিংবা কানাডার মূল ফ্যাক্টরিগুলোতে – র‍্যালে সাইকেল তৈরির জন্য | আজও বজায় আছে তাদের সুনাম | কিন্তু আমরা এই ‘র‍্যালে’ ব্র‍্যান্ডটিকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

আজকেও কিছু ভুয়োদর্শী সাইকেল-রসিকের ঘরে আপনি পেতে পারেন যত্ন করে রাখা সেন-র‍্যালের পুরোনো একটি সাইকেল। এই সাইকেলের সুখ্যাতি নিয়ে একটি তথ্য না বললেই নয়। কয়েকটি সেন-র‍্যালে সাইকেল চুরি যাওয়াকে কেন্দ্র করে একবার কোর্টে মামলা পর্যন্ত উঠেছিল সে যুগে – এইরকম দৃষ্টান্ত আছে | আসানসোলের কন্যাপুরে ‘সেন-র‍্যালে’ কোম্পানির পরিত্যক্ত কারখানা আজও আছে | আসানসোল শহরের রাস্তা, ব্রিজ, বাসস্ট্যান্ড এমনকি খেলার মাঠের সঙ্গে এখনও জড়িয়ে আছে এই ‘সেন – র‍্যালে’ কোম্পানির নাম |

একসময় ‘সেন – র‍্যালে’ কোম্পানির বাইসাইকেল কতটা জনপ্রিয় ছিল কিছু ঘটনা থেকে বোঝা যায় | আজও বহু সাইকেল প্রেমিকদের বাড়িতে যত্ন করে রাখা আছে সেন-র‍্যালের পুরোনো একটি সাইকেল | একবার কয়েকটি সেন-র‍্যালে সাইকেল চুরি যাওয়াকে কেন্দ্র করে একবার কোর্টে মামলা পর্যন্ত উঠেছিল সেযুগে – এইরকম দৃষ্টান্ত আছে | যদিও সেই সবই আজ ইতিহাস….

তথ্য : উইকিপিডিয়া,সতনজীব গুপ্তর পোস্ট

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।