আমাদের বায়ুসেনার প্রথম ভারতীয় সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুব্রত মুখার্জী

আমাদের বায়ুসেনার প্রথম ভারতীয় সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুব্রত মুখার্জী

অনেক পুরোনো দিনের কথা | ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিল এয়ারফোর্সে ভারতীয়দের নেওয়া হবে । খবরটা চোখে পড়ল আইসিএস সতীশ চন্দ্র মুখার্জীর | কাগজের কাটিং তিনি ছেলে সুব্রত মুখার্জীকে পাঠিয়ে দেন কেমব্রিজে। সেটাতে লেখা ছিল ব্রিটিশ সরকার ছ’জন ভারতীয়কে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । ছেলে এক কথায় রাজি কারণ তার স্বপ্নই ছিল এয়ার ফোর্সে যোগদান করার | যদিও ছেলেটির মা সেই সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না | মা কে সুব্রত চিঠিতে লিখলেন, ‘নিশ্চিন্তে থেকো । কখনও আমার বিমান ভেঙে পড়বে না |’ এরপর সুব্রত মুখার্জী ক্র্যানওয়েল এনট্রান্স টেস্টে প্রথম হন এবং অন্য পাঁচ জন ভারতীয়’র সাথে যোগ দেন রয়্যাল এয়ার ফোর্সে । ছ’জনের মধ্যে তিনি ছাড়াও ছিলেন এইচসি সরকার, এবি আওয়ান, ভুপেন্দর সিং, অমরজিৎ সিং ও জেএন ট্যান্ডন। শুরু হল স্বপ্নের উড়ান | ১৯৩৩ সালের পয়লা এপ্রিল তৈরি হল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স, আর সেদিনই করাচি থেকে নাম্বার ওয়ান স্কোয়াড্রনের ফ্লাইট ‘এ’ নিয়ে আকাশে উড়লেন, সুব্রত মুখার্জী | ছয় বছরের মধ্যেই হয়ে গেলেন প্রথম ভারতীয় স্কোয়াড্রন লিডার | ১৯৪২ সালে রয়্যাল এয়ার ফোর্স স্টেশনের হেড | সেই পদেও তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় | ১৯৪২ সালে নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারে দুরূহ পরিস্থিতিতে অপারেশন চালানোর ‘অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল তাঁকে | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন তিনি | ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করল | লর্ড মাউন্টব্যাটন সুব্রত মুখার্জীকে বললেন তুমি কি চাও, আমাদের সব অফিসার এখান থেকে চলে যাক, না কয়েকজন থেকে যাক। সুব্রত নির্দ্বিধায় বললেন, আমাদের নিজস্ব অফিসার তৈরী না হওয়া অবধি, ট্রেনিং প্রয়োজন | এরপর তিনি নিজে গেলেন ইংল্যান্ডের ইম্পিরিয়াল ডিফেন্স কলেজে | ১৯৫৪ সালে সুব্রত মুখোপাধ্যায় ভারতীয় বায়ুসেনার সর্বাধিনায়ক হন | তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেন | দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি যুক্ত ছিলেন বায়ুসেনার সাথে | বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনাকে |

আরো পড়ুন:  প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন ‘মাখনলাল দাস এন্ড সন্স’ - এ আজও পাওয়া যায় দু টাকা দামের সন্দেশ

সুব্রত মুখার্জীর জন্ম কলকাতায় ১৯১১ সালের ৫ মার্চ । তার পিতামহ নিবারন চন্দ্র মুখার্জী সে সময়কার নামকরা সামাজিক ও শিক্ষা কর্মী ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য। পিতা সতীশচন্দ্র মুখার্জী খ্যাতনামা আই সি এস ও মাতা চারুলতা মুখার্জী ছিলেন প্রথম মহিলা ‘ঈশান স্কলার’ ও নিরলস সমাজকর্মী। তার মাতামহ ড. প্রসন্নকুমার রায় ছিলেন ভারতীয় শিক্ষা মন্ত্রকের কর্মকর্তা এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। তার মাতামহী সরলা রায় ছিলেন গোখালে স্মৃতি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা | মামা ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন প্রথম ভারতীয় যুদ্ধবিমান চালক | জ্যেষ্ঠা ভগিনী রেণুকা রায়, সাংসদ, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও সমাজকর্মী।দাদা প্রশান্ত মুখার্জী ছিলেন রেলওয়ে বোর্ডের প্রথম ভারতীয় চেয়ারম্যান | চার সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সুব্রত | তার স্বপ্ন বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়া | কিন্তু মা একেবারেই চাইতেন না ছেলে বিমান বাহিনীতে যোগ দিন । তাই প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন একরকম জোর করেই তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কেমব্রিজে, ডাক্তারি পড়তে | কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সুব্রত মুখার্জী যোগ দেন বিমানবাহিনীতে | আর বাকিটা ইতিহাস | সুব্রত মুখার্জীকে ‘ভারতীয় বায়ু সেনার জনক’ আখ্যা দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন:  ক্লাসিক্যাল ভঙ্গি এবং রোমান্টিক ভাবের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে দেহাত্মবাদী কবি মোহিতলাল মজুমদারের লেখনীতে

সুব্রত মুখার্জীর স্ত্রী সারদা মুখার্জী ছিলেন গুজরাটের রাজ্যপাল | দুজনে বহু অবসর প্রাপ্ত আর্মি পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন | ১৯৬০ সালে প্রথম এয়ার ইন্ডিয়ার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রী হয়ে তিনি টোকিও গিয়েছিলেন | সেখানে এক রেস্টুরেন্টে খাবার খাবার সময় শ্বাসনালীতে খাবার আটকে যায় সুব্রত মুখার্জীর | ১৯৬০ সালের ৮ নভেম্বর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন সুব্রত মুখার্জী |

আরো পড়ুন:  আমেরিকার স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে বাংলায় ফিরে "অর্গানিক ফার্মিং" পদ্ধতিতে চাষবাস করছেন বাঙালি দম্পতি

আরেকটা জিনিস অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় | ছোটবেলা থেকে ফুটবল প্রেমিক ছিলেন সুব্রত মুখার্জী | মোহনবাগানের অন্ধ ভক্ত ছিলেন | তাঁর মৃত্যুর পর ইন্টার স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট যখন চালু হল, তখন তাঁর নামেই এই টুর্নামেন্টের নাম রাখা হল সুব্রত কাপ |

সত্তরের দশক থেকে মাঝ নব্বই পর্যন্ত সুব্রত কাপে সাত বারের চ্যাম্পিয়ন,দুই বারের রানার্স দল মধ্যমগ্রাম বয়েস হাইস্কুল |

১৯৭৮- রানার্স আপ
১৯৮১- চ্যাম্পিয়ন
১৯৮২-চ্যাম্পিয়ন
১৯৮৩-চ্যাম্পিয়ন
১৯৮৫-চ্যাম্পিয়ন
১৯৮৮-চ্যাম্পিয়ন
১৯৮৯- রানার্স আপ
১৯৯৫-চ্যাম্পিয়ন
১৯৯৬-চ্যাম্পিয়ন

সুব্রত কাপের ইতিহাসে একমাত্র দল যারা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার হ্যাটট্রিক করেছে (৮১-৮২-৮৩)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।