চৈতন্যলীলা নাটক দেখে ভাবস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে বললেন,‘চৈতন্য হোক’

চৈতন্যলীলা নাটক দেখে ভাবস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে বললেন,‘চৈতন্য হোক’

হাতিবাগানে স্টার থিয়েটার দেখেছেন নিশ্চয়ই, এখন বোধহয় আর থিয়েটার হয়না । আর হলে দেখছেই বা কে ?
রাত বাড়লে কোনদিন দেখতে পাবেন ঘোমটায় মুখ ঢেকে এক বিগতযৌবনা উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে আছে বাড়িটার দিকে । কেউ খেয়াল করলেই হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যে হারিয়ে যাবে বুঝতেই পারবেন না । কানে আসবে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস!

১৮৬৩ সালে মেয়েটা জন্মেছিল কলকাতার কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটে, বাবা নেই মা দিদিমার তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া। অত্যন্ত গরীব, খোলার চালের বাড়ী তারই দু একটি ঘর আবার ভাড়া দেওয়া অন্নসংস্থানের জন্য। পুঁটি নামে ডাকত সবাই ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটিকে।
দিদিমা তারই মধ্যে বিয়ে দিয়ে দিলেন পুঁটির কিন্তু সে বিয়ে স্থায়ী হলনা। পুঁটিকে এবার ভর্তি করে দেয়া হলো পাড়ার এক অবৈতনিক স্কুলে — নাম লেখান হল বিনোদিনী দাসী ।

পুঁটি থেকে বিনোদিনীতে রূপান্তরিত হওয়া শুরু হল সেই মুহূর্ত থেকে। পড়াশোনা না হলেও গানের গলাও ছিল অদ্ভুত রকমের ভাল। বিনোদিনীর বাড়ীতে গঙ্গাবাঈ নামে এক গায়িকা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন । বয়সে বিনোদিনীর থেকে অনেক বড়। দারিদ্রের সঙ্গে যুঝতে না পেরে বিনোদিনীর মা দিদিমা এই গঙ্গাবাঈয়ের কাছেই গান শিখতে দিলেন তাঁকে। আশ্চর্য দরদভরা কণ্ঠ সুর লয় তালের জ্ঞান যেন এই মেয়ের সহজাত ক্ষমতা। তাই অল্প কদিনেই সে আয়ত্ত করে নিল সুমধুর সব গান। এদিকে গঙ্গার ঘরে গানের আসর বসত প্রায়ই। আসতেন তখনকার সমাজের গানের সমঝদার জ্ঞানীগুণীরা। বিনোদিনীর এই গান গাইবার ক্ষমতা পালটে দিল তাঁর জীবন, আর গঙ্গাবাঈ বিনোদিনীকে নামিয়ে দিলো বারাঙ্গনার ভূমিকায়। তখনকার সমাজে আসরে গান গাইতেন এরাই। গঙ্গাবাঈয়ের আসরে আসতেন পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় আর ব্রজনাথ শেঠ। তাঁরা বিনোদিনীকে ভর্তি করে দিলেন ‘বেঙ্গল থিয়েটারে-দশ টাকা বেতনে। মহেন্দ্রলাল বসুর উপর তাঁকে শেখানোর ভার পড়ল। পরে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফী, অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় -নাট্যজগতের এইসব দিকপালেরা তাঁর শিক্ষার ভার নিলেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে দু’চারটি মাত্র সংলাপের মাধ্যমে অভিনয় করলেন ‘শত্রুসংহার’ নাটকে। মাত করে দিলেন দর্শককুল ও নাট্যজগত । ‘চৈতন্যলীলা’ নাটকে চৈতন্য তথা নিমাইয়ের ভূমিকায় এক ও অদ্বিতীয় নটী বিনোদিনী। নাটক দেখতে উপস্থিত স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ । অভিনয় দেখে ভাবস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ বিনোদিনীর মাথায় হাত ছুঁইয়ে বলছেন, ‘চৈতন্য হোক’ । পরের নাটকে নামলেন নায়িকার ভূমিকায়, বয়স এত কম হওয়া সত্ত্বেও। সেই সময়ে ভদ্র ঘরের মেয়েরা নাটক-যাত্রায় অংশগ্রহণ করতেননা, তাই নাটক-জগতকে এই বারাঙ্গনাদের থেকেই স্ত্রী ভূমিকার জন্য মেয়ে যোগাড় করতে হতো ।

আরো পড়ুন:  ‘আমার লেখা গান যেন সুধীন ছাড়া আর কেউ সুর না করে’ বলেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

‘কপালকুণ্ডলা’ নাটক দেখতে এলেন ন্যাশনাল থিয়েটারের মালিক কেদারনাথ চৌধুরি,। সঙ্গে গিরিশ ঘোষ। মুগ্ধ ও বিস্মিত গিরিশ ঘোষ বিনোদিনীকে নিয়ে এলেন ন্যাশনাল থিয়েটারে, ১৮৭৭ সালে। শুরু হল আরেক পর্ব ও তাঁর অভিনেত্রী জীবনের শেষ অধ্যায়……বড় করুণ সে কাহিনী ।
গিরিশ ঘোষের দলে আসার পর তাঁর অভিনয় প্রতিভা স্বীকৃতি পায় বাংলার সর্বত্র এমনকি সংস্কৃতিবান রুচিশীল মহলেও। হয়ে উঠলেন তিনি নাট্যসম্রাজ্ঞী। ‘মৃণালিনী’ নাটকে ‘মনোরমা’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ দেখিব এমন আশা করি নাই। আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল | ‘
ন্যাশনাল থিয়েটারে বিনোদের শিক্ষাগুরু হলেন স্বয়ং গিরিশ ঘোষ, শুরু হল উঁচুদরের অভিনয় শিক্ষার উচ্চপাঠ। বয়স সেসময় তার মাত্র চোদ্দ বছর! কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন এই নারী– ভাবলেও অবাক হতে হয়। বারো বছর ধরে বিচ্ছুরিত হলো তার এই প্রতিভা ।

বিনোদিনীর অভিনয় জীবনে এরপরেই ঘনিয়ে এলো দুর্যোগ । অবস্থার বিপাকে পড়ে কেদারনাথ চৌধুরি ন্যাশনাল থিয়েটার বিক্রি করতে বাধ্য হন। দু’তিনবার হাতবদল হয়ে প্রতাপচাঁদ জহুরী কিনলেন ন্যাশনাল। গিরিশ ঘোষকে অধ্যক্ষ করা হয়। শুরু হয় নিয়মনিষ্ঠ ব্যবসায়িক থিয়েটারের এক নতুন যুগ। গিরিশের শিক্ষায় ততদিনে বিনোদিনীর রূপান্তর ঘটেছে বিস্ময়কর এক প্রতিভাশালিনী অভিনেত্রীতে ।
একবার পনেরো দিনের ছুটিতে কাশী গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে বিনোদিনী,এক মাস অভিনয়ে যোগ দিতে পারেননি। তাতে জহুরী তাঁর বেতন বন্ধ করেন। আত্মসম্মানী বিনোদ তখনই থিয়েটার ছেড়ে দিতে চাইলে গিরিশ ঘোষ ও অন্যরা নিজেদের থিয়েটার তৈরীর কথা বলে তাঁকে শান্ত করেন।

আরো পড়ুন:  অভিনয় করার জন্যে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিলেন,সেই ছেলেই পরবর্তীতে হয়ে উঠলেন "রবি ঘোষ"

সেই সময়েতেই গুর্মুখ রায় নামে এক পাঞ্জাবী যুবক বিনোদিনীর জীবনে আসে। সে টাকা দেবে থিয়েটার গড়তে কিন্তু বদলে চায় বিনোদকে। বিনোদ অনেক ভাবনা চিন্তা করে রাজী হলেন-কারণ থিয়েটার ও অভিনয়ই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। ৫০হাজার টাকা দিলেন সেই যুবক আর বিনোদ সেই টাকা ঢাললেন থিয়েটার গড়তে। বিডন স্ট্রীটে জমি নেওয়া হল। সমস্ত উদ্যোগ স্বয়ং বিনোদের। সবাই তাকে আশা দিয়েছিল থিয়েটারের নাম হবে ‘বি-থিয়েটার’, মানে বিনোদিনী থিয়েটার ।
কিন্তু দৈবের খেলা যাকে বলে তাই হল, থিয়েটারের নাম হল ‘ষ্টার থিয়েটার’।

আসলে গিরিশ প্রমুখের চোখে বিনোদ বড় অভিনেত্রী হলেও বারাঙ্গনার অতিরিক্ত কিছু নয়। এত বড় প্রবঞ্চনা বিনোদ ভুলতে চেষ্টা করলেন মহড়ায় এলেন, কিন্তু এসেই বুঝলেন গোটা পরিবেশ পালটে গেছে। আসা বন্ধ করলেন, দু’তিনমাস কেটে গেল। গিরিশ আবারও মধ্যস্থতা করে ফেরালেন বিনোদকে। ১৮৮৩সালের ২১শে জুলাই স্টার থিয়েটারের উদ্বোধন হল ‘দক্ষযজ্ঞ’ নাটক দিয়ে। সতীর ভূমিকায় বিনোদের অভিনয় আবারও সবার মন জিতে নেয় ।
১৮৮৩ সালের শেষ পর্যন্ত গুর্মুখ স্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘নলদময়ন্তী’-তে দময়ন্তী ও ‘ধ্রুবচরিত্র’-তে সুরুচির ভূমিকায় বিনোদিনীর অভিনয় আবারও প্রমাণ করল তাঁর অভিনয় দক্ষতা ।

কিন্তু আবার দুর্যোগের ঘনঘটা! গুর্মুখ পরিবারের চাপে পড়ে ষ্টারের স্বত্ব বিক্রী করতে মনস্থ করেন। বিনোদকে অংশীদার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বারাঙ্গনার অধীনে কাজে আপত্তি উঠল সুশীল সমাজের!
হায়রে সমাজ…. বারাঙ্গনার টাকা নেয়া যায়, রাতে পাশে নিয়ে শোওয়া যায়, কিন্তু তার অধীনে কাজ… তওবা তওবা ! হোকনা সে অসামান্যা , তিনি যে নটী !
স্বত্ব গ্রহণে অস্বীকার করতে গিরিশ রাজী করালেন বিনোদ ও তাঁর মাকে। ষ্টারের স্বত্বাধিকারী হলেন অমৃতলাল মিত্র দাশুচরণ নিয়োগী হরিপ্রসাদ বসু ও অমৃতলাল বসু।

আরো পড়ুন:  ভারতছাড়ো আন্দোলনে দুবরাজপুর আদালতের শীর্ষ থেকে ইউনিয়ন জ্যাক টেনে নামিয়ে এনেছিলেন কালীকৃষ্ণ মিত্র


ষ্টারে বিনোদের শেষ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘বিল্বমঙ্গলের’ চিন্তামণি। সেই সময়েই সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। অনেকসময় ষ্টারের জন্য তাঁর আত্মত্যাগের কথা মুখ ফুটে বলে ফেলতেন–তাই বিরোধ। সহকর্মীরা এটাকে বারাঙ্গনার ধৃষ্টতা বলে মনে করতেন। গিরিশ ঘোষ এসব ব্যাপারে একেবারে নিস্পৃহ ভাব দেখাতেন। এই অপমান, এই অবমাননা বিনোদিনী মেনে নিতে পারলেননা। ছেড়ে দিলেন থিয়েটার ১৮৮৭-র ১লা জানুয়ারী। তাঁর অভিনীত শেষ নাটক ‘বেল্লিক বাজার’।

মর্যাদাহীন জীবনকে সম্মানের শিখরে নেবার জন্য সরস্বতীর সাধনা করেছিলেন, লিখেছিলেন দুটি বই ‘আমার কথা’, ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’। ‘আমার কথা-য়’ তিনি বিবৃত করেছেন তৎকালীন বাঙালী সমাজ ও বাংলা থিয়েটারের কথা। লিখেছিলেন দুটি কবিতার বইও…….-‘বাসনা’ ও ‘কনক নলিনী’।

অদৃষ্টের কি পরিহাস,মাত্র ২৩ বছর বয়সে খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছেও তাঁকে ছাড়তে হল তাঁর ভালবাসার পেশা, নায়িকার জীবন !
স্বামী-সন্তানভরা সংসারের স্বপ্নও তিনি দেখতেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বেশিরভাগটাই পর্দার আড়ালে থেকে গেছে। পুরুষরা এসেছে গেছে তাঁর জীবনে কিন্তু প্রকৃত ভালবাসার জন্য তাঁর অন্তর কেঁদেছে সর্বদাই।

থিয়েটার থেকে বিদায় নেবার পর আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁর প্রকৃত উপকারী বন্ধু ও ভালবাসার জন রাঙাবাবুর কাছে। তিনিও চলে গেলেন পরপারে ১৯১২ সালে। সেই সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই শেষ ত্রিশ বছর তাঁর কিভাবে কেটেছে ভাল জানা যায়না। সম্ভবতঃ যে জায়গাকে ও যে পেশাকে তিনি সবচাইতে বেশী ঘৃণা করতেন, সেই জায়গায় ফিরে গেছিলেন পেটের দায়ে! মাঝে মাঝে ষ্টার থিয়েটারেও গিয়ে বসে থাকতেন। হয়তো ভিক্ষেও করতে হয়েছে ।

১৯৪২ সালে সবার অগোচরে চলে গেলেন তিনি । ফুল নিয়ে কেউ সেদিন হাজির হয়নি, কোথাও লেখা হয়নি একটি লাইন । নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে লাঞ্ছিত হয়ে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ ছাড়লেন নাট্য জগতের এক অবিসংবাদী সম্রাজ্ঞী 🌹🌹
‌🌲 সংকলনে ✍🏻 স্বপন সেন 🌲

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।