মানিকবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন,”এতবছর কাজ করলাম,সৌমিত্র কোনওদিন বলেনি সে বাঘাযতীনের আত্মীয় !”

মানিকবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন,”এতবছর কাজ করলাম,সৌমিত্র কোনওদিন বলেনি সে বাঘাযতীনের আত্মীয় !”

প্রয়াত হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় | আমরা অনেকেই জানি না বীর বিপ্লবী বাঘাযতীনের পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি | কি ভাবে ? আসুন দেখে নেওয়া যাক |

ছোট বয়সে বাঘাযতীন পড়তেন কৃষ্ণনগরের এংলো ভার্নাকুলার স্কুলে | থাকতেন নিজের বড়মামার কাছে কৃষ্ণনগরে | বড়মামা ছিলেন বড় উকিল | উৎসবের সময় বাঘাযতীন বড়মামার সঙ্গে মামারবাড়ির গ্রামে ফিরতেন | গ্রামে লালন ফকিরের শিষ্য বাউল পাঁচু ফকিরের আখড়ায় গান শুনতেন বাঘাযতীন | সেই বয়স থেকেই বাঘাযতীনের সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছোটমামা ললিতকুমার চ্যাটার্জী | ললিতকুমার চ্যাটার্জী ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দাদু |

 

 

ছোটমামা ললিত চ্যাটার্জীর সঙ্গে ছোটবেলায় প্রায়ই একসাথে নাটক করতেন বাঘাযতীন | দুর্গাপুজোর সময়ে চ্যাটার্জী বাড়িতে প্রায় চারশো কিলো ওজনের চালের ভাত হত | প্রসাদ নিতে আসতেন হাজার হাজার লোক | রান্নাতেও হাত লাগাতেন বাঘাযতীন | ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাঘাযতীন ও ললিত চ্যাটার্জী জাতি বর্ণ ভুলে গ্রামের হিন্দু মুসলিম বামুন চাঁড়াল সবাইকে একসাথে বসে মায়ের প্রসাদ খাইয়েছিলেন | গড়ে তুলেছিলেন সম্প্রীতি |

আরো পড়ুন:  হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন গায়ক ও অভিনেতা শক্তি ঠাকুর

কৃষ্ণনগরে মামা ললিত চ্যাটার্জীর সঙ্গে বাঘাযতীন গড়ে তুলেছিলেন ছোট ছোট সমিতি | এই সমিতিগুলো ফুটবল খেলা,কুস্তি লড়া জনপ্রিয় করে তুলেছিল | গীতাপাঠ,বিবেকানন্দের রচনা,দেশের ইতিহাস ইত্যাদি পড়ানো হত সেখানে | ললিত চ্যাটার্জী বাঘাযতীনের সঙ্গে যেতেন যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের কাছে | সেই সূত্রেই ললিত চ্যাটার্জীর আলাপ হয় মেয়ে সুধাময়ীর সঙ্গে | তারপর বিয়ে | সুধাময়ীদেবী হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের দিদিমা | ১৯০০ সালের এপ্রিল মাসে বাঘাযতীনের বিয়ে হয় ইন্দুবালা দেবীর সঙ্গে | কয়া থেকে পাঁচ মাইল হেঁটে বরযাত্রী যান ছোটমামা ললিত চ্যাটার্জী |

ললিত চ্যাটার্জী নিজেও ছিলেন বিপ্লবী | বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্তকে বাঘাযতীন যখন সামসুল আলম হত্যার জন্যে নির্বাচিত করেন,তখন সুরেশচন্দ্র মজুমদার (আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা,ডাকনাম পরান) সামসুল আলম হত্যার জন্যে বাঘাযতীনকে একটি ছয় ঘরা রিভলভার তুলে দেন | সুরেশচন্দ্র মজুমদারকে বাঘাযতীনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ললিত চ্যাটার্জী |

আরো পড়ুন:  ১৯১৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর উদ্যোগে তৈরী হয়েছিল বাঙালি মালিকানার প্রথম ফিল্ম কোম্পানী

 

 

 

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে |
১৯৭০ সালের কাছাকাছি বাঘাযতীনের নাতি পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ঠিক করেন গবেষণা-লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বাঘাযতীনের উপর একটি ডকুমেন্টরি বানাবেন | তিনি সত্যজিৎ রায়কে ফোনে বলেন এই কথা |

সত্যজিৎ রায় জানান “আমি সত্যজিৎ রায় বলছি। নকশালের প্রভাবে দিকভ্রষ্ট তরুণদের সামনে দেশপ্রেমের জ্বলন্ত প্রতীক বাঘা যতীনকে আমি তুলে ধরতে চাই। এখুনি আমার হাত খালি আছে।যত শীঘ্র পারেন, চলে আসুন।”

প্যারিসে বসবাসরত পৃথ্বীন্দ্রনাথবাবু কলকাতায় এলেন | দেখা করলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে |
পরের কথোপকথন পৃথ্বীন্দ্রনাথবাবুর কলমে |

কথা প্রসঙ্গে সত্যজিৎবাবু জানতে চাইলেন: “গৌতম গাঙ্গুলিকে চেনেন?” কবুল করলাম: “আমার ভাগ্নে।” উনি স্মিত হাসির সঙ্গে জানালেন: “ছেলেটা এসেছিল। তখনই নিতে না পারলে গড়পড়তা যে জবাব শুনি– ‘একবার সুযোগ পেলে দেখিয়ে দিতাম’ – তার পরিবর্তে গৌতম বলে গিয়েছে, ‘আপনার পছন্দমত ডাক পেলেই আমি আসব | ভারী ভাল লাগল ওর আচরণ—”

আরো পড়ুন:  ছো নাচের মুখোশ তৈরীর আঁতুরঘর পুরুলিয়ার "মুখোশগ্রাম" চড়িদা

আমি মন্তব্য করলাম: “ওর অনেক আগে আপনি আমাদের বাড়ির আর-একটি ছেলেকে আপন করে নিয়েছেন—”

ওঁর উত্তেজিত প্রশ্ন: “কার কথা বলছেন?”

সন্তর্পণে বললাম : “সৌমিত্র—”

সত্যজিৎ রায় বললেন “এত বছর একসঙ্গে কাজ করছি, কোনদিন সে তো বলেনি সে বাঘাযতীনের আত্মীয়—”

পৃথ্বীন্দ্রনাথবাবু বলেন “ওর ঠাকুরদা ললিতকুমার ছিলেন আমার ঠাকুরদা যতীন্দ্রনাথের আপন মামা ও বিপ্লবী সহকর্মী।”

দুর্ভাগ্যক্রমে কিছু কারণে “বাঘাযতীন” তথ্যচিত্রটি সত্যজিৎবাবুর হাতছাড়া হয়ে যায় ।

তথ্য : পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়,স্বাধীনতাযুদ্ধে অচেনা লালবাজার (সুপ্রতিম সরকার),বাঘাযতীন(পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।