শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্নেহধন্যেই অনন্য কামারপুকুরের ‌সাদা বোঁদে

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্নেহধন্যেই অনন্য কামারপুকুরের ‌সাদা বোঁদে

মিষ্টি নিয়ে ভালোবাসা, আবেগ শুধুমাত্র বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও জাতির এত গৌরব অথবা আবেগ যে নেই জোরগলায় বলা যায়৷ মিষ্টি যে শুধু মিষ্টি নয় বরং বাঙালির জীবনযাপনের সঙ্গে জুড়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।বাঙালির ভুরিভোজে মিষ্টির ভূমিকার কথা আমরা সবাই জানি৷নববর্ষ বলুন অথবা পয়লা বৈশাখ, বিজয়া দশমী কিংবা ক্রিসমাস আম বাঙালির রসনাতৃপ্তির অঙ্গ মিষ্টি৷

লাল-হলুদ নয় একদম ধবধবে সাদা বোঁদে | কামারপুকুরের সাদা বোঁদে পশ্চিমবঙ্গের স্বতন্ত্র ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি | কামারপুকুরের সাদা বোঁদে কে কবে প্রথম প্রস্তুত করেছিলেন তার সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায় না।আদিতে কামারপুকুরে এই সাদা বোঁদে তৈরী করতেন বিশেষ কিছু হাতে গোনা পরিবার। আনুমানিক ১২০০ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৯৩-৯৪ সাল নাগাদ কামারপূকুরে সাদা বোঁদে তৈরী করতেন জনৈক মধুসূদন মোদক।রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্ম ভিটে ছিল মোদক বাড়ির পাশেই। একটি মত অনুসারে গদাধর চট্টোপাধ্যায় মধুসূদন মোদকের পুত্র দুর্গাদাসের বাল্যবন্ধু ছিলেন। বালক গদাধর তার বন্ধু দুর্গাদাসের বাড়িতে গেলেই সাদা বোঁদে খেতেন। অন্য মতে গদাধর দুর্গাদাস মোদকের পুত্র সত্যকিঙ্করের দোকান থেকে সাদা বোঁদে কিনে খেতেন।সেই থেকে আজীবন কামারপুকুরের সেই সাদা বোঁদে খেতে খুব ভালোবাসতেন রামকৃষ্ণ পরমহংস। রামকৃষ্ণ কথামৃতে কামারপুকুরের সাদা বোঁদের উল্লেখ রয়েছে।

আরো পড়ুন:  পুঁটিরামের ডাল কচুরি,রাধাবল্লবী,রাজভোগে ১৫০ বছরের স্বাদ !

সারদাদেবীরও সাদা বোঁদে ভীষণ প্রিয় ছিল। তিনি দুর্গাদাস মোদকের পুত্র সত্যকিঙ্কর মোদকের দোকানের বোঁদে খুব ভালবাসতেন। তিনি ভক্তদের সাদা বোঁদে বা জিলিপি খেতে দিতেন। সেই থেকেই কামারপুকুরের সাদা বোঁদের সাথে মোদক পরিবারের নাম জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কর্তৃপক্ষ কামারপুকুরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্ম ভিটে অধিগ্রহণ করে নেন। ক্রমে কামারপুকুর ঠাকুরের ভক্তদের জন্য একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয় এবং ভক্তদের মাধ্যমে ঠাকুরের স্নেহধন্য কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জনপ্রিয়তা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

কামারপুকুরের সাদা বোঁদের প্রধান উপাদান হল রমা কলাইয়ের বেসন এবং আতপ চালের গুঁড়ো | তার সাথে লাগে গাওয়া ঘি বা বনস্পতি ঘি ও চিনির রস। রমা কলাই বা রম্ভা কলাই বলতে বরবটির বীজকে বোঝানো হয়।অতীতে কামারপুকুরের স্থানীয় চাষীরাই বরবটি চাষ করে পাকা বরবটির বীজের জোগান দিতেন | সেই বরবটির বীজ অর্থাৎ রমা কলাইকে প্রথমে জলে ধুয়ে তারপর রোদে শুকিয়ে নেওয়া হত। এর পর সেই শুকনো কলাইকে পিষে বেসন তৈরি করা হত | অতীতে সাদা বোঁদে ভাজা হত গাওয়া ঘিতে। কিন্তু খরচে পোষাতে না পেরে অধিকাংশ মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী বনস্পতি ঘি বা ডালডা ব্যবহার করেন। সাধারণ বোঁদের মত কামারপুকুরের সাদা বোঁদেয় কোনো কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না।প্যাকেটে রেখে দিলে এক মাস পর্যন্ত ভাল থাকে এই বোঁদে।

আরো পড়ুন:  পর্তুগিজদের হাত ধরেই 'ব্যান্ডেল চিজ' ঢুকল মিষ্টিপ্রেমী বাঙালির হেঁশেলে

২০১৭ সালের হিসেবে কামারপুকুরে মিষ্টির দোকানের সংখ্যা মোট কুড়িটি। তার মধ্যে তিনটি দোকান রামকৃষ্ণ পরমহংসের সমসাময়িক সত্যকিঙ্কর মোদকের বংশধরদের। দোকানগুলি মঠ চত্বর, লাহা বাজার ও কামারপুকুর চটি এই তিনটি অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি মিষ্টির দোকানেই এই সাদা বোঁদে পাওয়া যায় | শীতের সময় অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ কামারপুকুরে পর্যটক সংখ্যা সব চেয়ে বেশি হয়। তখন চাহিদা মেটাতে মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারকরা সাদা বোঁদের উৎপাদন বাড়িয়ে দেন। এই সময় প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ টন সাদা বোঁদে তৈরী হয় কামারপুকুরে। বছরের বাকি সময়টা দৈনিক ২-৩ টন সাদা বোঁদে উৎপাদন হয়।

আরো পড়ুন:  ইংরেজি বই চাইতে গেলে লাইব্রেরি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন,পরবর্তীতে তিনিই বাঙালিকে ইংরেজি শেখালেন

২০১৭ সালে রসগোল্লা জি আই স্বীকৃতি পাওয়ার পর কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জি আই স্বীকৃতির দাবী ওঠে। কামারপুকুরের মানুষ কামারপুকুরের ঐতিহ্যবাহী সাদা বোঁদের জি আই স্বীকৃতি দাবী করেন। গোঘাট-২ ব্লকের বিডিওর মতে যেহেতু এই সাদা বোঁদে কামারপুকুর ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না সেহেতু কামারপুকুরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের জি আই স্বীকৃতি দাবী করার অধিকার রয়েছে। ২০১৮ সালে জি আই স্বীকৃতির আবেদনের জন্য কামারপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাথে জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক কথাবার্তা সম্পন্ন হয়।হুগলি ও পাশাপাশি জেলা বর্ধমান, বাঁকুড়া, দুই মেদিনীপুর, হাওড়ায় সাদা বোঁদের নাম ছড়িয়েছে। কদর বাড়িয়ে তা প্যাকেটবন্দি হয়ে পাড়ি জমিয়েছে ওড়িশা, গুজরাত-সহ ভিনরাজ্যে ।

তথ্য : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।