নীরবে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়,বাঙালি মনে রাখেনি

নীরবে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়,বাঙালি মনে রাখেনি

অনেক পুরোনো দিনের কথা | আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় শ্রীপুর গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে এসেছেন | প্রায় রোজই সকালে তিনি বেরিয়ে পড়তেন গ্রামে | ঘুরে বেড়াতেন,কথা বলতেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে | এভাবেই তাঁর চোখে পড়ে যায় এক ছেলে | সেই বয়সেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সে কাঁধে তুলে নিয়েছিল লাঙল | আচার্য বুঝলেন এই ছেলেকে দিয়ে কাজ হবে | আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় চাইতেন বাঙালি সাবলম্বী হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক | আচার্য ছেলেটিকে বললেন, “চাষ কর” | কিভাবে কৃষির মাধ্যমে সাবলম্বী হওয়া যায় সেই নিয়েও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন সেই ছেলেটিকে | ছেলেটিও “গুরু”র পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চললেন | ঘটিয়েছিলেন কৃষি বিপ্লব | তিনি শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় |

আরো পড়ুন:  "বিজ্ঞানী নয়, রাষ্ট্রপতি নয়, শিক্ষক হয়েই মানুষের মনে বেঁচে থাকতে চাই" বলতেন আব্দুল কালাম

শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের গোবিন্দপুর গ্রামে | তাদের আদি বাড়ি বোড়াল গ্রামে | পড়াশোনার জন্যে তিনি থাকতেন শ্রীপুর গ্রামে | থাকতেন গাঁয়ের কবিরাজ মশাইয়ের বাড়িতে | সেই সূত্রেই আলাপ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে | পরিবারে আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল শিবপ্রসাদের | তাই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে ছোট বয়স থেকেই চাষবাস করতেন | কয়েক বছর পর বোড়াল গ্রামে ফিরে যান শিবপ্রসাদ | কিন্তু গুরু আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আদর্শ ভুলে যাননি তিনি |

চাষের জমিই ছিল শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণাগার | বিভিন্ন বীজ নিয়ে গবেষণা করতেন তিনি | এভাবেই একদিন বানিয়ে ফেললেন ‘ব্যানার্জিস পালং’। এই ব্যানার্জিস পালং একটি হাইব্রিড প্রকৃতির সবজি | মাটির নিচের অংশে বিট আর উপরের অংশে পালংশাক | ওজন ৮ থেকে ১০ কিলোগ্রাম কিন্তু খেতে অসাধারণ | বোড়াল-কৃষিখামারে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন চব্বিশ রকমের নতুন প্রজাতির গোলাপ | ব্রকোলি আর ফুলকপির মিশ্রণে তৈরী করেছিলেন ‘পলিফ্লাওয়ার’ | বিভিন্ন ফলেরও মিশ্রণ সৃষ্টি করেছিলেন শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় | কাজ করেছেন আম,জাম,কাঁঠাল,লিচু পেয়ারা প্রভৃতি ফল নিয়েও | চাষে কীটনাশক কিংবা রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন তিনি | সেই সময়ে দাঁড়িয়েই তিনি গোবর থেকে জৈব সার তৈরী করেছিলেন | চাষীদের বুঝিয়েছিলেন জৈব সার ব্যবহারের গুরুত্ব |

আরো পড়ুন:  গ্রামবাংলার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কড়ুই

কৃষকদের সাহায্য করতে শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরী করেছিলেন কৃষক সমিতি | চালু করেছিলেন কৃষিমেলা | এদিকে দেশের কৃষিব্যবস্থা তখন ধুঁকছে | শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় চাষীদের পাশে দাঁড়াতে ‘ফোলিয়ার ফিড’ পদ্ধতিতে চাষ করতে বললেন | ফোলিয়ার ফিড পদ্ধতিতে জল কম লাগে, সহজেই তৈরী হয় ফসল | এর সুফল পেলেন চাষীরা | শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন কৃষকদের পরম বন্ধু | বিধানচন্দ্র কৃষিবিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছিল সাম্মানিক ডি-এস-সি | মাটির মানুষ শিবপ্রসাদ সাহায্য করতেন গবেষকদের | বহু গবেষক তাঁর গ্রামে এসে কৃষি নিয়ে গবেষণা করতেন | এর পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও করতেন | ছিলেন অসাম্প্রদায়িক – মানতেন না জাত ধর্ম | সব মানুষকে সমানভাবে সাহায্য করতেন শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় | দাঙ্গার সময়ে তাঁর খামারে আশ্রয় পেয়েছিলেন বহু মানুষ |

আরো পড়ুন:  শব ব্যবচ্ছেদকারী প্রথম বাঙালি চিকিৎসক ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি মধুসূদন গুপ্তকে

জীবনের শেষদিন অবধি কৃষকদের পাশে থেকেছেন শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় | নীরবে ঘটিয়ে গিয়েছেন কৃষিবিপ্লব | আমরা মনে রাখিনি…..

তথ্য : বঙ্গদর্শন (ছন্দক গুহ)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।