কলেরার উৎস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার,তবুও নোবেল পাননি বিজ্ঞানী শম্ভুনাথ দে

কলেরার উৎস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার,তবুও নোবেল পাননি বিজ্ঞানী শম্ভুনাথ দে

গত এক বছর ধরে করোনার ত্রাসে প্রায় থরহরি কম্প গোটা বিশ্ব। প্রকোপ কিছুটা কমলেও এখনও পুরোপুরি যায়নি এই মারণ ভাইরাস। মহামারী না হলেও করোনা অতিমারী তো বটেই। অন্ন-বস্ত্রের মত স্বাস্থ্যও আমাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। শুধু করোনা নয়, মাঝে মাঝেই নানা রোগ জীবাণু ভাইরাস এসে মানব জীবনকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। এমনই এক অসুখ হচ্ছে কলেরা। আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন হলেও এক সময় কিন্তু আমাদের দেশে কলেরারা খুবই দৌরাত্ম্য ছিল। কলেরার জন্য দায়ী এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। আর এই ব্যাকটেরিয়া নিয়েই গবেষণায় অবদান রেখেছিলেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী।

আধুনিক অণুজীববিদ্যার অন্যতম প্রধান দিশারী জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কখ আবিষ্কার করেন এই রোগের জীবাণু। কলেরা নিয়ে গবেষণা করতে তিনি ভারতে এসেছিলেন। অনেকের মতে তিনি নাকি কলকাতাতেও এসেছিলেন। ভিব্রিও কলেরি নামে এক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণেই যে কলেরা রোগ হয়ে থাকে সেই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়া থেকে কীভাবে মানুষের মৃত্যু অবধি হতে পারে সেই নিয়ে তিনি কিছু ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। আর সেই ভুল শুধরে দিয়েছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী শম্ভুনাথ দে।

আরো পড়ুন:  রোগীর এক ফুঁ’তেই ধরা পড়বে পাকস্থলির ক্যান্সার,অভিনব আবিষ্কার বাঙালি বিজ্ঞানীর

কলকাতায় নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজের গবেষণাগার এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রোটিন ল্যাবরেটরিতে কলেরা নিয়ে গবেষণা করেন শম্ভুনাথ। পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসেন, ভিব্রিও কলেরি জীবাণুর টক্সিন অন্ত্রের মিউকাস থেকে জল বের করে দেয়। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার জলের মতো মলত্যাগ করতে থাকে। শরীর থেকে প্রচুর জল এবং খনিজ লবণ বের হওয়ায় রোগী মৃত্যু দিকে এগিয়ে যায়। শম্ভুনাথ দের এই গবেষণা বিজ্ঞানীমহলে এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। উপযুক্ত সাহায্যও মেলেনি। তাঁর অনেক গবেষণাই এখনও অবধি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তাই।

আরো পড়ুন:  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দন্ত চিকিৎসা করতেন তিনি, কবিগুরুর জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন নকল দাঁত

রবার্ট কখ নোবেল পেয়েছিলেন ১৯০৫ সালে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জোশুয়া লেডারবার্গ বারবার নোবেল কমিটিতে শম্ভুনাথের নাম উত্থাপন করেছেন পুরস্কারের জন্য। কোনো অজ্ঞাত কারণে নোবেল পাননি শম্ভুনাথ দে। ১৯৭৮ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁকে কলেরা ও ডাইরিয়ার ওপর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে তিনি নোবেল কমিটির থেকে অতীতে যথাযথ সন্মান না পাওয়ার জন্য আক্ষেপ জানান।

অনেক কষ্ট করে দারিদ্রের মধ্যে বড় হয়েছিলেন শম্ভুনাথ। হুগলি জেলার এক গ্রামে ১৯১৫ সালে জন্মেছিলেন। গ্রামের স্কুল থেকে ডিস্টিংশন নিয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে হুগলি মহসিন কলেজে পড়ার বৃত্তি অর্জন করেন। স্কলারশিপ পেয়ে ১৯৩৫ সালে  ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। তখন কলকাতার এক ধনী ব্যবসায়ী কেসি শেঠ তাঁকে আর্থিক সাহায্য করতেন। মেডিকেল কলেজে শম্ভুনাথ হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক-অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্র। প্যাথোলজি বিভাগের ব্যাকটেরিওলজির অধ্যাপক মণীন্দ্রনাথ দে নিজের মেয়ে তরুবালার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। ১৯৩৯ সালে এমবি এবং ১৯৪২ সালে ক্রান্তীয় চিকিৎসাবিদ্যায় ডিপ্লোমা লাভ করেন শম্ভুনাথ। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইউসিএল মেডিকেল স্কুল থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৪৯ সালে।

আরো পড়ুন:  বিজ্ঞানীর বেশে এক বিপ্লবী

কিন্তু এত মেধাবী হয়েও এবং কলেরার উৎস নিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করেও যথাযথ সন্মান পাননি এই বাঙালি বিজ্ঞানী। ১৯৮৫ সালে শম্ভুনাথ দে প্রয়াত হন। এখন কলেরা নিরাময়ের চিকিৎসা সহজলভ্য, যার পিছনে এই মহান বাঙালি বিজ্ঞানীর অবদান ভোলার নয়। কিন্তু সঠিক সন্মান না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই এই বিজ্ঞানীকে চলে যেতে হয়েছে।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।