বিজ্ঞানচেতনা এবং দেশের সর্বপ্রথম আই. আই. টি. প্রতিষ্ঠার পটভূমিকায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু

বিজ্ঞানচেতনা এবং দেশের সর্বপ্রথম আই. আই. টি. প্রতিষ্ঠার পটভূমিকায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু

‘পরাক্রম দিবস’ না ‘দেশনায়ক দিবস’? নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনের প্রাক্কালে রাজ্য-রাজনীতি  ছিলো সরগরম। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের আবহে যুযুধান রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে নেতাজিকে আপন করে নেওয়ার উন্মাদনাও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু নেতাজির আদর্শের সাথে আমরা কতটা একাত্ব হতে পেরেছি সেই প্রশ্ন বারে বারে ফিরে আসে। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে নেতাজির মতবিরোধ, জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা, হিটলারের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ, অথবা নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের পুনর্গঠন সংক্রান্ত ইতিহাস আজ সর্বজনবিদিত। আমরা এও জানি যে আজাদ হিন্দ ফৌজে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে কোনদিন স্থান পেতে দেননি নেতাজি। নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে বিস্তর । অথচ, নেতাজির বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে খুব একটা লেখালেখি ইদানিং-কালে একেবারেই চোখে পরেনি এবং এই বিষয়ে বিশদ আলোচনার পরিসর কিন্তু থেকেই গিয়েছে। আজকের যুগে একাধিক বার আমরা দেখেছি শুধুমাত্র অসমসাহসিকতা কিম্বা জাতীয়তাবাদই একজন সফল দেশনেতা হয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতানুয়ায়ী, ২০২০-তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পতনের পিছনে তার বিজ্ঞানমনস্কতার অভাবকে খানিকটা হলেও দায়ী করা চলে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কিছুদিন যাবদ ‘পলিটিক্যালি-ইনফ্লুয়েন্সড্‌ সিউডো-সায়েন্স’-এর যে চরম রমরমা তার সাথে প্রকৃত বিজ্ঞানচেতনাকে এক করে ফেললে চলবেনা। সবমিলিয়ে কোভিড পরবর্তী যুগে যেখানে বিজ্ঞানেরই জয়জয়কার, সেখানে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেমের আঙ্গিনায় নেতাজির বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে এই প্রবন্ধ অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

নীতি আয়োগ, ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন এবং নেতাজি

স্বাধীনোত্তর ভারতের ভিত মজবুত করে গড়ে তোলার জন্য বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে যে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন তা তুখোড় মেধাবী এবং সুদক্ষ প্রশাসনিক সুভাষ চন্দ্র বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। সেই দূরদর্শিতার নিদর্শন নেতাজি খুব অল্প সময়ের জন্য জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন প্রদর্শন করে গিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে মোদি সরকার প্ল্যানিং কমিশন বাতিল করে ‘নীতি আয়োগ’ চালু করেন, সম্প্রতি যার বিরোধিতা করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সরব হয়েছিলেন। সভাপতি থাকাকালীন এই প্ল্যানিং কমিশন গঠনের পিছনে সুভাষ চন্দ্র বোস অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন:  হ্যাকারদের হাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন রাখতে যুগান্তকারী আবিষ্কার বঙ্গ তনয়া জয়ী ঘোষ-এর

জানা যায়, নেতাজি পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে প্রবাদপ্রতিম বাঙালী বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন । ১৯৩৫ সালে মেঘনাদ সাহা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের রায়ের সহযোগিতায় ‘ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই সঙ্গে ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ নামক এক পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন।

 

১৭-ই ডিসেম্বর, ১৯৩৮: বম্বেতে ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি উদ্বোধনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

 

উদ্দেশ্য জনমানসে বিজ্ঞানচেতনার প্রসার ঘটানো এবং নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানের সাধনায় আগ্রহী করে তোলা। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী যেমন শান্তি স্বরূপ ভাটনগর ইত্যাদিদের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী নেতাজিকেও মেঘনাদ সাহা বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান এবং পত্রিকার প্রথম সংস্করণটি উপহার দেন। নেতাজি ডঃ সাহাকে উল্লেখ করেন যে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে শুধুমাত্র বিজ্ঞানীদের এগিয়ে এলেই চলবে না, যারা প্রকৃত অর্থেই এক উন্নততর দেশগঠনে আগ্রহী তাদের সবাইকে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দেশের ও দেশবাসীর সামগ্রিক উন্নতিসাধন করতে হবে। বিজ্ঞানীদের সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র রাজনীতিবিদরা এই গুরুদায়িত্ব পূরণে অপারগ। নেতাজি আরও বলেন, বিজ্ঞানের প্রকল্প রূপায়ণে গবেষদের এবং নীতিবিদদের মেলবন্ধন একান্ত প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা যে নতুন ধারণার প্রণয়ন করেন তা বাস্তবায়িত করে সমাজকে সমৃদ্ধ করে তুলতে গেলে চাই বিজ্ঞান ও রাজনীতির মধ্যে সুদূরপ্রসারী সহযোগিতা। তবে এই বিজ্ঞানচর্চাকে বলপূর্বক রাষ্ট্রশক্তির বশবর্তী করলে বা ক্ষুদ্র-স্বার্থে নিয়ন্ত্রণাধীন করলে বিজ্ঞানের অগ্রগতি স্তিমিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

আরো পড়ুন:  রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়ে যেত স্ত্রী-র,সমস্যার সমাধানে এয়ারলে ডিকসন আবিষ্কার করলেন ব্যান্ড-এড

অবশেষে নেতাজি এবং মেঘনাদ সাহার দীর্ঘ আলাপচারিতায় ভবিষ্যতে ভারতের বিজ্ঞানচর্চার মান উন্নত করে তুলতে কী করে আরও বেশী করে অর্থ বিনিয়োগ করা যায় তার একটি রূপরেখা তৈরী হয়। এরই ফলস্বরূপ, ১৯৩৮-এ কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন নেতাজি ‘ন্যাশানাল প্ল্যানিং কমিটি’-গঠনের প্রস্তাব রাখেন যা নিঃসন্দেহে স্বনির্ভর ভারত গড়ে তোলার এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে সুপারিশ করা হয় বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ বিশ্বেশ্বরাইয়ার নাম (পরবর্তীকালে যাঁর সম্মানার্থে ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং-দিবস পালিত হয়)। এই কমিটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য-ই ছিলো বিভিন্ন গবেষণা এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রশস্ত করা। বিজ্ঞান ও রাজনীতিতে সামঞ্জস্য বজায় রাখার খাতিরে মেঘনাদ সাহার অনুরোধে শেষপর্যন্ত বিশ্বেশ্বরাইয়া অন্যপদে নিযুক্ত হন এবং জওহরলাল নেহেরু কমিটির কার্যনির্বাহী সভাপতি হন। কমিটিতে ছিলেন বিখ্যাত রসায়নবিদ জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ-ও। যাইহোক, পরে গান্ধীজির সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নেতাজি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে যান। স্বাধীনতার পরে ১৯৫০ সালে প্ল্যানিং কমিটির পুনর্গঠন হয়। গঠিত হয় ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন। কৃষিবিজ্ঞান থেকে দেশজ-শিল্প, স্যানিটেশন থেকে টীকাকরণ কর্মসূচি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারায় প্রকল্প রূপায়ণে এই কমিশনের অবদান রয়েছে। অতএব স্বাধীনতা অর্জনেই শুধু নয়, স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের স্বরূপ নির্ণয়ে নেতাজির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

এছাড়াও দেশের প্রথম আই. আই. টি. গঠনের নেপথ্যে যে কাহিনী তা পরোক্ষভাবে নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত। কীভাবে?

আই. আই. টি খড়গপু্র নির্মাণের পটভূমিকায় নেতাজি

ভারতের সর্বপ্রথম প্রৌদ্যোগিকী সংস্থা, নামজাদা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আই. আই. টি. খড়্গপুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস যা কিনা জনসাধারণের অগোচরেই থেকে গিয়েছে। আজকের আই. আই. টি. খড়্গপুর স্বাধীনতার আগে ছিলো হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প। ক্যাম্পটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৩০-এ। তারপর এক দশক ধরে এই হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প ব্রিটিশ শাসকের অনেক অত্যাচারের সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে। বহু শহীদের রক্তে রাঙানো এই হিজলিতে ১৯৩১ সালের ১৬-ই সেপ্টেম্বর ইংরেজদের নির্বিচার গুলি চালনায় নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীনতা-সংগ্রামী সন্তোষ কুমার মিত্র (যার স্মৃতি-রক্ষার্থে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার) এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে ছুটে আসেন নেতাজি সুভাষ। মৃতদেহের সামনেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, উন্মুক্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন যে এই শহীদের রক্ত যেখানে ঝরেছে সেখান থেকেই স্বাধীনতার জয়যাত্রার সূচনা হবে, “Let on the blood of the martyrs be built the edifice of the freedom,” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদী কন্ঠে মুখর হয়ে ওঠেন, লেখেন ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি−ভগবান কোনোদিন কি এই নিষ্ঠুর কদাচারী শাসকদের ক্ষমা করে দিতে পারবেন?

আরো পড়ুন:  চন্দ্রপৃষ্ঠে ‘সফট ল্যান্ডিং’ করবে ISRO’র ল্যান্ডার, মডেল বানাচ্ছেন যাদবপুরের দুই অধ্যাপক

 

আই. আই. টি. খড়্গপুরের পুরনো বিল্ডিং যা স্বাধীনতার পূর্বে ছিলো হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প। এখান থেকেই নেতাজি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করেছিলেন

 

স্বাধীনতার পরে প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর তত্ত্বাবধানে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আদলে কলকাতায় আই. আই. টি. ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবা হলেও নেতাজির আদর্শ বিস্মৃত হননি পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। মূলত ডাঃ রায়ের উদ্যোগেই কলকাতায় নয়, বরং হিজলি ক্যাম্প ঘিরে গড়ে ওঠে দেশের প্রথম আই. আই. টি.−আই. আই. টি. খড়্গপুর। ১৯৫১ সালে উদ্বোধন করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং প্রথম ডিরেক্টর হিসাবে নিযুক্ত হন ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির প্রাক্তন সদস্য বিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ মহাশয়। না, নেতাজির প্রতিজ্ঞা বিফলে যাইনি। শহীদের রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠে দেশের সর্ববৃহৎ প্রযুক্তিবিজ্ঞানকেন্দ্র যা গত ৭০ বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে দেশের সেবায় ব্রতী হয়ে রয়েছে।

– রক্তিম হালদার

গবেষক (আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্ডট পোস্টডক্টরাল সায়েন্টিস্ট), হ্যানোফার অপটিক্যাল টেকনোলজি, লিবৎনিজ ইউনিভার্সিটি হ্যানোফার, জার্মানি

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।