ভারতের প্রথম আইসিএস বাংলার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারতের প্রথম আইসিএস বাংলার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিজের নতুন বৌ-কে বন্ধুর দেখতে ইচ্ছে হয়েছে বলে দিনের বেলা অন্য কোন উপায়ান্তর না দেখে রাতের বেলা কোন স্বামী নিজের শয়নকক্ষে বন্ধুকে ডেকে এনেছেন বধূমুখ দর্শন করানোর জন্য! না, এটা কিন্তু নাটকের দৃশ্য নয়; একেবারে নিখাদ সত্যি। হ্যাঁ! চমকে উঠতেই পারেন। কারণ সময়টা যে আঠারো শতক আর সেই প্রেক্ষাপটে রীতিমতো বৈপ্লবিক ঘটনাও বটে। তবে এহেন বৈপ্লবিক দুঃসাহস তাঁর জন্মগত। চিনতে পেরেছেন কি? এই নববধূটি হলেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, আর ঐ বন্ধু হলেন মনোমোহন ঘোষ। আর যে বছর কুড়ির যুবকটি এই পরিকল্পনাটির জনক, তিনি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম ভারতীয় হিসেবে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু পাশাপাশি ছিলেন নারী স্বাধীনতার অন্যতম কাণ্ডারী। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
বাংলা জুড়ে তখন নতুন তরঙ্গের ঝাপটা লাগছে। চিন্তা-চেতনা, সমাজদর্শন সবেতেই তখন এক নবজাগৃতির পদধ্বনি। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই তখনও ঘুমন্ত। যে ঠাকুরবাড়ি দ্বারকানাথ ঠাকুরের হাত ধরে পথ দেখিয়েছিল এই নবজাগরণের, সেখানে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরে আবার ফিরছে সংস্কারের দাপট। আর এরই মধ্যে হিন্দু অবিভক্ত ঠাকুরবাড়িতে ১৮৪২ সালের ১ জুন জন্ম নিলেন ভবিষ্যৎ বাঙলার নবোদয়ের এক আলোকবর্তিকা – মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ। প্রাথমিক ভাবে পিতার তত্ত্বাবধানে তিনি বাড়িতেই সংস্কৃত ও ইংরেজি শিখেছিলেন। একইসঙ্গে চলছিল কুস্তি ও ঘোড়দৌড়ের অনুশীলন। এরপর হিন্দু স্কুলের ছাত্র হিসাবে সত্যেন্দ্রনাথ ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন এবং প্রথম বিভাগে স্থান অধিকার করে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে এসে পেলেন সমমনস্ক কেশবচন্দ্র সেনকে। সত্যেন্দ্রনাথ ছোট থেকেই ছিলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথের অপৌত্তলিক দর্শনের অনুরাগী। তাঁর নিজের ভাষায় ‘আইকোনোক্লাস্ট’। কলেজে প্রবেশের আগেই ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়েছিলেন; পেয়েছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব। কেশবচন্দ্রের বন্ধুত্ব সেই আগুনে ঘি ঢালল। ১৮৬১ সালে কেশবচন্দ্রের সঙ্গে কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তবে এরই মধ্যে সব ওলটপালট করে দিলেন আর এক বন্ধু মনোমোহন ঘোষ। তিনি ছিলেন সত্যেনের যাবতীয় বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গী। একটি উদাহরণ তো প্রথমেই বলেছি। পরিবারের দস্তুর মতো, ১৮৫৯ সালে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যশোরের আট বছরের জ্ঞানদানন্দিনীর বিয়ে হয়েছিল। একমাথা ঘোমটা টানা বালিকাটিকে চিন্তায় কর্মে স্বাবলম্বী করে নিজের মনের সঙ্গী করতে সত্যেন্দ্রের উদ্যোগের অন্ত ছিল না। আর জ্ঞানদার আড় ভাঙাতেই মনোমোহনকে ডেকে এনেছিলেন নিভৃত কক্ষে। তো এহেন মনোমোহন পরামর্শ দিলেন, বিলেত গিয়ে দেখাই যাক নি, ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিসে নেয় কি না। বহু কষ্টে মহর্ষির মত আদায় করে, ১৮৬২ সালে দুই বন্ধু সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতির জন্য ইংল্যান্ডে গেলেন। সেখানে ভয়ানক পরিশ্রম শেষে মনোমোহন ফেল করলেন বটে, তবে সত্যেন্দ্র পাশ করে নজির গড়লেন। তিনিই হলেন প্রথম ভারতীয় সিভিলিয়ান। কাজ করার সুযোগ পেলেন বোম্বাই প্রেসিডেন্সীতে, যদিও তাঁর প্রথম নিযুক্তি হয়েছিল আহমেদাবাদে অ্যাসিস্ট্যান্ট কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। আর এই সুযোগেই বস্তুত বহু দিনের স্বপ্ন বাস্তব করার উপায় পেলেন তিনি।
জ্ঞানদানন্দিনীকে নিদর্শন রূপে সামনে রেখে, ঠাকুরবাড়ি তথা বাঙলার মেয়েদের কয়েদখানার তালাখানি ভেঙে দিলেন। বিলেতজয়ী সত্যেন্দ্র বলে দিলেন কর্মস্থল বোম্বাইয়ে ‘সস্ত্রীক’ যাবেন।বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর স্মৃতিতে, ‘‘আশৈশব ইনি মহিলা-বন্ধু।.. মহর্ষির কাছে মেয়েদের যদি কোন আবেদন থাকতো তবে তাদের ‘মুরুব্বি’ হয়ে সত্যেন্দ্রনাথই তা অসঙ্কোচে নিবেদন করতেন।’’
ইংল্যান্ডে পঠনকালে মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলেন মেয়েদের স্বচ্ছন্দ্য স্বাধীনতা। বোম্বাই যাত্রাকালে বাইরে বেরোনোর মতো মহিলাদের উপযুক্ত পোশাকের কথা ভেবে সত্যেন্দ্র ফরাসি মহিলা দর্জির কাছ থেকে তথাকথিত ‘ওরিয়েন্টাল’ পোশাক বানিয়েছিলেন। জ্ঞানদাকে নিজেই তা পরিয়ে দিয়েছিলেন। বম্বে গিয়ে পারসি জীবনে নারী-পুরুষের একত্র ভোজন, অবাধ নারী স্বাধীনতা ও উৎসবে বর্ণাঢ্য পোশাকে নারীসমাজের অংশগ্রহণ দেখে সত্যেন্দ্র মুগ্ধ। পারসিদের দৃষ্টান্তেই জ্ঞানদা সেই ওরিয়েন্টাল পোশাক ছেড়ে, ডান কাঁধের বদলে বাঁ কাঁধে আঁচল ফেলে বা ব্রোচ আটকে ‘বোম্বাই শাড়ি পরা’ রপ্ত করেন। সেই চলনেই শুরু হল ব্লাউজ় পরা। পরের ছুটিতে স্বামীর সঙ্গে এই পোশাকেই সরাসরি গাড়ি করে ঠাকুরবাড়িতে এলেন তিনি। এ দৃশ্যে পিতৃভবনে সত্যেন্দ্র প্রায় একঘরে হলেন। ক্রমে ঠাকুরবাড়িতে বিলেতের ছোঁয়া লাগল, সর্বভারতীয়তার রং ধরল, অন্তঃপুরে অবরোধপ্রথা লুপ্ত হল।
নানা স্থানে বদলির চাকরি করতে করতে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ৩২ বছরের কর্মজীবনে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ভারতবাসীর মধ্যে প্রথম সেশন জজ হয়েছিলেন। জজিয়তি করার সময়ে বাল্যবিবাহ, বালিকাহরণ, পণপ্রথার মতো সমাজের বহু উপদ্রবের মুখোমুখি হলেন তিনি। সমাজের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে বয়স্থ হলে পাত্রপাত্রীর ইচ্ছেয় বিবাহ, একান্নবর্তী পরিবারের অবসানের পক্ষে কলম চালালেন। তবু তিনি অকালে অবসর নিয়েছিলেন। কারণ স্বদেশচেতনা। ইংরেজের প্রভুত্ব করার অনিচ্ছা। তাঁর কর্মজীবনের গোড়ার দিকেই, যখন তাঁর বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে দেশাত্মবোধ ও রাষ্ট্রীয় মুক্তিচেতনা জাগানোর উদ্দেশ্যে হিন্দুমেলা শুরু হল, তিনি তার দ্বিতীয় অধিবেশনে নিজে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানের জন্য ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ নামে একটি ভারতসঙ্গীত লিখে দিয়েছিলেন। এই গানই বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’ ও ছোটভাই রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’র অগ্রদূত। বহু ক্ষেত্রেই এই গানকে দেশের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেওয়া হয়।
ঠাকুরবাড়ির ধারা মেনেই সত্যেন্দ্র ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ‘বোম্বাই চিত্র’, ‘আমার বাল্যকথা’ ইত্যাদিতে মুখের কথায় মনের ভাবপ্রকাশে তাঁর মুনশিয়ানা, যখন-তখন গান বাঁধার পারদর্শিতা, ভক্তিগীত ভেঙে গান রচনা, শেক্সপিয়র-তুকারাম-কালিদাস অনুবাদের প্রাঞ্জলতা, মনোমুগ্ধকর ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতা, অভ্রান্ত স্বরক্ষেপণে আবৃত্তির দক্ষতা, বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি। অবসরের পরে এলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে, হলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি। তাঁর হাত ধরেই ঠাকুরবাড়িতে নব্য নাটক ও গানের প্রবেশ ঘটল।
১৮৭৭ সালে সত্যেন্দ্র জ্ঞানদাকে তিনটি শিশুসন্তান-সহ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় একলাই বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন। এই ঘটনার পরে জ্ঞানদার সাঙ্ঘাতিক মনের জোরের কথা কিংবদন্তি হয়ে যায়। দ্বিমত নেই, এই মনের জোরের স্রষ্টা সত্যেন্দ্রনাথ। সোচ্চার আন্দোলন না করেও নিজের জীবনধারার বদল ঘটিয়ে সমাজে নতুন চেতনার সঞ্চার করা যায়,দেখিয়ে দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। এই সরল সত্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল সত্যেন্দ্রের ব্রহ্মতত্ত্ব গীতা উপনিষদ ব্যাখ্যান এবং বুদ্ধ বিষয়ক বইগুলির মধ্যে। সত্যেন্দ্রনাথ নয়টি বাংলা ও তিনটি ইংরেজি গ্রন্থ রচনা করেন। সে সবের মধ্যে সুশীলা ও বীরসিংহ নাটক, বোম্বাই চিত্র, নবরত্নমালা, স্ত্রীস্বাধীনতা, বৌদ্ধধর্ম, আমার বাল্যকথা ও বোম্বাই প্রয়াস, ভারতবর্ষীয় ইংরেজ, Raja Rammohan Roy ইত্যাদি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। বস্তুতঃ, বাঙালীর সংস্কৃতিতে পূর্ব ও পশ্চিমের অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রস্তুত করেছিলেন ঠাকুরবাড়ির বহুচর্চিত পরিবেশটি। সেই বাগানেই একদিন ফুটে উঠেছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য ও নাট্যচর্চার কুঁড়িটি। সেই উদ্যানেই তো ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বহু আয়াসে সত্যেন্দ্রনাথ পথ গড়ে দিয়েছিলেন মেয়েদের জন্য। বৃদ্ধাবস্থায় অবশেষে তৃপ্ত সুরে লিখেছেন, ”সত্যি সত্যিই অন্তঃপুরবাসিনীগণ এখন মেমের মত গড়ের মাঠে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন।…আমার মনস্কামনা অনেকটাই পূর্ণ হয়েছে।” কোন অপমান কোন বিরোধীতাই তাঁকে তাঁর সঙ্কল্প থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এক দীর্ঘ মহাজীবনের নাম সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম ভারতীয় আইসিএস থেকে সঙ্গীতরচয়িতা; ব্রাহ্মসমাজের সদস্য থেকে স্ত্রীকে পাশে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে মাঠে হাওয়া খেতে যাওয়া; ছোট ভাইদের প্রধান অনুপ্রেরণা, শিক্ষাগুরু, বোনেদের সাহস জোগানো; জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই বাঙালী ভাঙতে চেয়েছেন অন্ধ কারার বদ্ধ শিকল – সে ইংরেজদের গোলামীর শৃঙ্খল হোক বা সমাজের নিষেধাজ্ঞার বাঁধন! ১৯২৩ সালের ৯ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। তবু তিনি মৃত্যুর পরপারেও অনুপ্রাণিত করে চলেছেন সেই সকল মানুষকে যাঁরা সমানাধিকারে বিশ্বাসী; স্বাধীনতার পক্ষপাতী।
– শ্রেয়সী সেন
তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা ও উইকিপিডিয়া
আরো পড়ুন:  ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত নদীয়া জেলার মাটিয়ারি গ্রাম
Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।