মানিকবাবু ও হাতলহীন রিকশা,সঙ্গে ‘ওরা তিনজন’ : পর্দার আড়ালের টুকরো কথা

মানিকবাবু ও হাতলহীন রিকশা,সঙ্গে ‘ওরা তিনজন’ : পর্দার আড়ালের টুকরো কথা

(লেখক : পবিত্র মুখোপাধ্যায়)

১৯৭৮ সাল | বেনারসের রাস্তায় তিনজন আরোহীকে নিয়ে একটা হাতলহীন রিক্সা তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে | আঁতকে উঠছেন ? কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে ? ভৌতিক কাণ্ড ভাবছেন ?
একটু আগেই ঘোষাল বাড়িতে রীতিমতো হুমকি দিয়ে গিয়েছেন মগনলাল মেঘরাজ | হ্যাঁ , হুমকিই বটে | বলে গিয়েছেন , ‘থার্টি থাউজ্যান্ড উমানাথ | সবার কাছ থেকে আমি জিনিস চেয়ে নিই না,দরকার হলে নিয়ে নিই | তাতে আমার পয়সাও লাগে না | তোমার সাথে আমি খোলাখুলি কাম করছি |’
আর এর কিছুক্ষণ পরেই পর্দায় দেখা গেল বেনারসের রাস্তায় রিক্সায় সওয়ার ফেলুদা এন্ড কোম্পানিকে | ফেলুদা নিজে একটিতে এবং অপরটিতে তোপসে ও বিখ্যাত লেখক লালমোহনবাবু |
রিক্সায় যেতে যেতে ফেলুদা এন্ড কোম্পানির সেই অমলিন সংলাপ আজও ফিরে ফিরে আসে ———-
তোপসে : তার চেয়ে হাতটা মাথায় ঠেকিয়ে রাখুন না | হাত ব্যথা হয়ে যাবে যে |
লালমোহনবাবু : কাশীতে কত মন্দির আছে জানো ?
তোপসে : কত ?
লালমোহনবাবু : ফেলুবাবু , কাশীতে মন্দিরের সংখ্যা কত ?
ফেলুদা : তেত্রিশ কোটি |
আচ্ছা আমরা ক’জন জানি যে , লালমোহনবাবু ও তোপসে যে রিক্সায় বসে হাসি- ঠাট্টায় আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন সেই রিক্সার কোন হাতল ছিল না |
নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে পর্দার আড়ালের এই কাহিনি |
চলুন একটু শোনা যাক ——–
চিত্রগ্রাহক সৌমেন্দু রায়ের কথায় , সাইকেল- রিক্সায় শুটিংয়ের সময় কেবলমাত্র যাত্রীদের ছবি তোলা বড়ই কষ্টকর | কেননা সেক্ষেত্রে রিক্সা চালকের ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়বে | শুধু তাই নয় , ক্যামেরাম্যান ছবি তোলার জন্য বসবেন কোথায় ?
আর এই মুশকিল আসানের জন্য মানিকবাবু অনুসরণ করেছিলেন এক বিশেষ পন্থা |
তোপসে ও লালমোহনবাবুর রিক্সার সামনের চাকা-সমেত চালকের সিটটা খুলে পেছনের অংশটা একটা ট্যাক্সির ডিকির সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল |
এরপর ডিকির ঢাকনাটা খুলে দিয়ে ডিকিতে ক্যামেরা বসানো হয়েছিল |
মানিকবাবু প্রথমে ভেবেছিলেন শটটা ওইভাবে নেওয়া যাবে | কিন্তু ক্যামেরায় চোখ রেখে দেখা গেল আঙ্গেলটা ঠিক আসছে না |
এরপরেই ট্যাক্সির পেছনের আচ্ছাদন খুলে পেছনের সিটে ক্যামেরা নিয়ে বসা হল উল্টো দিকে মুখ করে |
শুটিংয়ের সময় ট্যাক্সিটাকে চালানো হল এতটাই ঢিমে তালে যাতে করে মনে হয় রিক্সাটি চালানো হচ্ছে |
ফেলুদাকে বসানো হয়েছিল ওই একই রিক্সায় | ব্যাপারটি যাতে পর্দায় দর্শকরা ধরতে না পারেন তার জন্য ছিল অন্য ব্যবস্থা | একটা অন্য ছবি তোলা হয়েছিল যেখানে সাইকেল-রিক্সা চালক রিক্সা চালাচ্ছেন | এক্ষেত্রে ওই সাইকেল – রিক্সায় যাত্রীর সিটে ক্যামেরা নিয়ে বসা হয়েছিল |
পরবর্তী সময়ে দুলাল দত্তের সম্পাদনায় পর্দায় মনে হয়েছিল সাইকেল – রিক্সাতেই ফেলুদা এন্ড কোম্পানি স্বাভাবিক ভ্রমণ করছেন |
সাধে কি আর দুলালবাবু সম্পর্কে মানিকবাবু বলতেন , ‘ ছবি কেটে জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইনি ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র সম্পাদক |’
এই দৃশ্যগ্রহণের সময়ে বেনারসের রাস্তায় মানিকবাবু ও তাঁর দলবলকে সামলাতে হয়েছিল আরও এক উটকো সমস্যা |
হাতলহীন সাইকেল – রিকশার কাটাছেঁড়া করে মানিকবাবু যখন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দিতে মগ্ন , ঠিক তখনই ছন্দপতন | আচমকাই হাজির বেনারসের কিছু মস্তান |লালমোহনবাবু ও তোপসের রিকশার পাশেই সাইকেলে করে শহর ভ্রমণে মত্ত | উদ্দেশ্য নিজেদের ক্যামেরাবন্দি করা |
নেমে পড়ল মানিকবাবুর দলবল | প্রায় মাইলখানেক যাওয়ার পরে একটা সময়ে পিছু হটলো স্থানীয় গুন্ডার দল | আর এরপরেই ট্যাক্সি থেকে পাঠানো হল সবুজ সংকেত লালমোহনবাবু ও তোপসের উদ্দেশ্যে | ক্যামেরাবন্দি হল এক অমলিন দৃশ্যের |

আরো পড়ুন:  ৪২ সিনেমায় অভিনয় দেখে জুতো ছুঁড়লেন দর্শক, বিকাশ বলেছিলেন,"আজ আমার অভিনয় সার্থক"

লেখক : পবিত্র মুখোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।