তিলোত্তমার ব্যস্ততম এলাকায় জব চার্ণকের স্মৃতি আর থমকে যাওয়া সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে সেন্ট জন’স গির্জা

তিলোত্তমার ব্যস্ততম এলাকায় জব চার্ণকের স্মৃতি আর থমকে যাওয়া সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে সেন্ট জন’স গির্জা

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বলিদান আর ত্যাগের ফসল হিসেবে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন। কলকাতা ব্রিটিশদের সবচেয়ে পছন্দের ছিল। এখানে রাজধানীও ছিল। ব্রিটিশরা চলে গেলেও তাঁদের তৈরি মেডিক্যাল কলেজ থেকে হাওড়া ব্রিজ, রাইটার্স বিল্ডিং, রাজভবনসহ এমন অনেক স্থাপত্য রয়ে গেছে। তেমনই হল সেন্ট জন’স গির্জা, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস।

বিবাদি বাগের লাল দীঘির পাশেই এই সেন্ট জন’স গির্জা। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততম এলাকা পেরিয়ে এখানে ঢুকলে মনে হবে যেন সময় থেমে গেছে হঠাৎ। এক টুকরো সবুজ নিয়ে সেই ১৭৮৭ সাল থেকে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এই গির্জা। গির্জাটিকে ঘিরে প্রহরীর মতন দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি নির্মাণ। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা (তর্কসাপেক্ষ) জব চার্নকের স্মৃতিসৌধ। সাবেকি ঢঙে নির্মিত এই সৌধটিও অন্যান্য সৌধের মতন কতক গম্বুজাকৃতি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিন্তু এর স্থাপত্য মৌলিক, কারণ এটির পৃষ্ঠতল আটকোণা। সৌধটি প্রতিষ্ঠা করেন চার্নকের জামাতা চার্লস এয়ের, ১৬৯৫ সালে, অর্থাৎ গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ারও প্রায় ৯২ বছর আগে।

আরো পড়ুন:  কলকাতার আইন দেবতা,মামলা-মোকদ্দমার সময় উকিল থেকে মক্কেল "হাইকোর্টেশ্বর শিব" এর সামনে মাথা ঠেকান অনেকেই

এছাড়া এই সেন্ট জন’স গির্জায় বেশ কয়েকটি অমূল্য পেইন্টিং আছে। প্রধান আঁকাটার নাম ‘লাস্ট সাপার’ যা প্রবাদপ্রতিম মাইকেল এঞ্জলোর দা লাস্ট সাপারের অনুকরণে আঁকা। এঁকেছিলেন জার্মান শিল্পী ইয়োহান জোফান্নি। গ্রিক ধর্মযাজক ফাদার পার্থেনিওকে যিশু খ্রিস্টের আদলে আঁকা হয়েছে। যদিও এইসব পেইন্টিং-এর অন্যান্য চরিত্ররা সেই যুগের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা।

আরো পড়ুন:  আদি গঙ্গাকে পাশে রেখে গড়ে উঠেছিল টালিগঞ্জ,এলাকা দিয়ে চলাচল করত জাহাজ

২৩৩ বছরের পুরনো এই গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সেই সময়ের ভারতবর্ষের গভর্নর জেনেরাল ওয়ারেন হেস্টিংস স্বয়ং। দিনটা ছিল ৬ এপ্রিল, ১৭৮৪-এ। আর চার্চের জন্য জমি দিয়েছিলেন শোভাবাজার রাজ-পরিবারের কুলপতি মহারাজা নবকিষান বাহাদুর। প্রসঙ্গত, ইতিহাসে এই গির্জাটির মূল গুরুত্ব ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার প্রথম অ্যাংলিকান ক্যাথিড্রাল হিসেবে। ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের বিরোধে সমন্বয়কারী মধ্যপন্থার কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছিল অ্যাংলিকান ক্যাথিড্রালগুলি। পরে অবশ্য সেন্ট পলের এই গির্জা ক্যাথিড্রাল হিসেবেই বিবেচিত হতে শুরু করে। গির্জাটিকে এক সময়ে পাথুরে গির্জা বলা হত। গির্জাটি তৈরি করতে যে বিপুল পরিমাণ পাথর লেগেছিল। যে গৌড় অঞ্চলে (অধুনা মালদা জেলায়) পাল রাজাদের আধিপত্য ছিল, পরে তা সেনাবংশের সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়, যে গৌড় অঞ্চল বাংলার কেন্দ্র ছিল কম-বেশি তিনটে শতক, প্রথমে আফঘানদের পরে মুঘল শাসকদের অধীনে, সেই গৌড়ের মধ্যযুগীয় ধ্বংসাবশেষ থেকেই প্রচুর পাথর একরকম লুঠ করে এনে গির্জাটি তৈরি করেছিলেন ইংরেজরা। প্রধান স্থাপত্যশিল্পী ছিলেন জেমস এ্যাগ। গির্জাটির মাঝেই রয়েছে এর একটা বিশেষ অংশের আশ্চর্য গড়ন। মাথা-সরু, লম্বাটে অনেকটা পিরামিডের মতো। উচ্চতায় ১৭৪ ফিট। আর সেখানে যে বিশাল ঘড়িটি আছে, সেটায় আজ অবধি প্রত্যেকদিন নিয়ম করে দম দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন:  কবিতা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম প্রেম,যত কবিতা লিখেছেন তা সবই নীরার জন্য

কলকাতার ব্যস্ততম অঞ্চলে এমন গির্জা সম্পূর্ণ বৈপরীত্য বহন করছে। আজও যেন অদ্ভুত এক নিরালা আর রহস্যে মোড়া সেন্ট জনের এই গির্জা।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।