সাইকেল চালিয়ে তিনবার বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস

সাইকেল চালিয়ে তিনবার বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস

বিশ্বকে নিজের চোখ দিয়ে দেখার বাসনা মনে কার না থাকে বলুন তো ? আমরা যে কোন জায়গাতে ঘুরতে গেলে দ্রুততম যান যেমন ট্রেন,চারচাকা গাড়ি,প্লেনকেই ব্যবহার করে থাকি। বর্তমানে তবে অনেকেই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত কে জয় করার লক্ষ্যে নিজেদের মনের জোরে সাইকেল নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করতে বেরিয়ে পড়ছে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় বহু বছর আগে অর্থাৎ ১৯৩১ সালের কথা, তখন প্রথম সাইকেল চড়ে বিশ্বভ্রমনের স্বাদ বাঙালিকে বুঝিয়েছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। তাঁর প্রধান নেশায়ই ছিল ভ্রমণ। তাই তিনি এই ভ্রমণ পিপাসু মন কে কখনোও দমিয়ে রাখতে পারেননি। সাইকেল নিয়েই তিনি তিনবার বিশ্ব ভ্রমণ করে ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে নিদর্শন হয়ে আছেন আজও।

রামনাথ বিশ্বাস ছিলেন কমিউনিস্ট মনোভাব সম্পন্ন মানুষ। রাজনীতি করতে তিনি বরাবর ভালোবাসতেন | রামনাথ বিশ্বাস রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে গেছেন। বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যদলে যোগ দিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেরিয়েছেন। শুধু যে ভ্রমণ করে গেছেন তা কিন্তু নয়,তার সাথে সাথে নিজের ভ্রমণের সমস্ত কাহিনী বই আকারে লিখে গেছেন।এখনকার বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামে ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন রমানাথ বিশ্বাস। তাঁর পিতার নাম বীরজানাথ বিশ্বাস ও মাতার নাম গুণময়ী দেবী।ছোটবেলায় পড়াশোনা শুরু করেন গ্রামের স্কুল হরিশচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি অল্প বয়সেই পিতৃ হারা হন। তাই অষ্টম শ্রেণীতে তার পড়াশোনা থমকে যায়। সেই সময়ই রাজনীতির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন। অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন সুশীল সেনের সঙ্গে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় প্রথম হবিগঞ্জের জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়ে। সেখানেই তিনি সাইকেল চালানোয় দক্ষ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে ম্যানেজারের কাজ ছেড়ে অন্যত্র একটি কাজে যোগ দেন। তবে বিপ্লবী কাজে যুক্ত থাকার জন্য সেই কাজ থেকেও বহিস্কৃত হন।

আরো পড়ুন:  মাতঙ্গিনী হাজরার মুখের শেষ উক্তি অনুসারে এই গ্রামের নাম হল "পিছাবনী"

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রামনাথ বিশ্বাস যুদ্ধে যোগদান করেন। বাঙালি পল্টনের সঙ্গে তিনি মেসোপটেমিয়াম যান। ১৯২৪ সালে মালয়ে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনী একটিতে চাকরিতে যোগ দেন। রামনাথ বিশ্বাস সাইকেলে করে প্রথম বিশ্ব যাত্রা করেন ১৯৩১ সালে। সঙ্গে ছিল একজোড়া চটি, দুটি চাদর ও চলযান সাইকেল। সাইকেল মেরামত করার জন্য সাইকেলের ক্যারিয়ারে রাখা থাকতো মেরামতির সরঞ্জাম। সাইকেলের গায়ে লেখা থাকতো রাউন্ড দ ওয়ার্ল্ড, হিন্দু ট্রাভেলার। প্রথমে তিনি পাড়ি দেন সিঙ্গাপুরে। সেখানকার কুইন স্ট্রীট থেকে প্রথমবারের জন্য সাইকেল নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ শুরু করেন ।সিঙ্গাপুরের চাকরিরত প্রবাসী ভারতীয়রা রামনাথকে সেদিন শুভেচ্ছা জানিয়ে ছিলেন। সাইকেল চড়ে তিনি মালয়, শ্যাম, ইন্দোচীন, চীন,কোরিয়া, জাপান হয়ে কানাডায় পৌঁছান।১৯৩৪ সালে তিনি গ্রামে ফিরে এলে বানিয়াচংয়ের গ্রামবাসীর তাঁকে সংবর্ধনা দেন।রামনাথ বিশ্বাস বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বানিয়াচং কে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম বলে উল্লেখ করেন।

আরো পড়ুন:  বছরে দক্ষিণা দু’টাকা,সাড়ে তিনশো দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষাদান করছেন ৭৬ বছরের 'মাস্টারমশাই'

১৯৩৪ সালে রামনাথ বিশ্বাস দ্বিতীয় বিশ্ব ভ্রমণ যাত্রা শুরু করেন।আফগানিস্তান,পারস্য,ইরাক ,সিরিয়া ,লেবানন ,তুরস্ক ,বুলগেরিয়া ,হাঙ্গেরী ,অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ,ফ্রান্স ,ব্রিটেন পৌঁছান। এই যাত্রায় তার শরীর খুব খারাপ হয়ে যায়। ১৯৩৬ সালে লন্ডন থেকে পোর্ট সৈয়দ হয়ে মুম্বাই প্রত্যাবর্তন করেন। সুস্থ হয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর কাছে যান | কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর প্রশংসা করেছিলেন |

আরো পড়ুন:  অতীশ দীপঙ্করেরও আগে ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন এক বাঙালী

রামনাথ বিশ্বাস তৃতীয়বার বিশ্বযাত্রা করেন ১৯৩৮ সালে। মুম্বাই থেকে জাহাজে মেম্বাসায় যান।তারপর সেখান থেকে সাইকেলে করে কেনিয়া-উগান্ডায় ,দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে জাহাজে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান।১৯৪০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তিনি প্রায় ৪০ টি মতো বই লিখেছিলেন।বেদুইনের দেশে, জুজুৎসু জাপান, তরুণ, তুর্কি, অন্ধকারের আফ্রিকা আফগানিস্তান, ভ্রমণ প্রভৃতি বই খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। কলকাতায় বসবাসকালে আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তার ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ হত।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে অসমের সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান।।তাঁর ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করার জন্য কোন প্রকাশনা সংস্থা তাকে সাহায্য করেনি। তাই নিজেই একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে বই প্রকাশ করেন। তারপর পূর্ব-পাকিস্তানের পাঠ শেষ করে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৫৫ সালে ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস কলকাতাতেই পরলোকগমন করেন।

তথ্য : বঙ্গদর্শন (শ্রেয়ন)

Tripti Das Roy

Tripti Das Roy

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।