নোবেলের মানে, শান্তিনিকেতনের ড্রেনেরা জানে…

নোবেলের মানে, শান্তিনিকেতনের ড্রেনেরা জানে…

লেখিকা : ঈশিতা দে

১৯১৩ সাল, ১৩ ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার – না! অবশেষে বোলপুরের গেঁয়ো যোগী ভিখ পেলো, সুদূর সুইডেন থেকে; কারণ সেইদিন স্টকহোম নোবেল কমিটি ঘোষণা করলো –
” The Nobel Prize For Literature For 1913 Has Been Awarded To The Indian Poet Rabindranath Tagore ”

কিন্তু, বাধ সাধলো অন্য জায়গায়, তারা ফলাও করে ঘোষণা তো করে দিলো বটে, কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, তাকেও তো সে কথা জানাতে হবে! কিন্তু, নোবেল কমিটির জানা ছিলো না রবীন্দ্রনাথের ঠিকানা।
একে ভারতীয়, দুইয়ে প্রথম ভারতীয়; যিনি নোবেল পাচ্ছেন, তাই ভারতের ম্যাপের অলিগলির ঠিকানা, জানা হয়নি ওদের তখনও। পরে অবশ্য জেনেছিলেন ভারতীয় ম্যাপের খুঁটিনাটি, তবে তা আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় না।
এবার আসি মূল গল্পে। ভুললে হবে না এখনও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জানেন না; তিনি, নোবেল পেয়েছেন।

তো যাই হোক, নোবেল কমিটি না জানলেও, লন্ডনের ম্যাকমিলান কম্পানির মাধ্যমে, ১৪ই নভেম্বর, কলকাতায় একটা টেলিগ্রাম এলো।
” XF PH LONDON PO 14 EASTN LN 19 RABINDRANATH TAGORE 6 DN-LANE JORASANKO CALCUTTA
SWEDISH ACADEMY AWARDED YOU NOBEL PRIZE LITERATURE PLEASE WIRE ACCEPTATION
SWEDISH MINISTER ”

তবে এবারেও বিধিবাম, রবীন্দ্রনাথ নেই কোলকাতাতে, তিনি তখন রয়েছেন বোলপুরে। অতএব কি উপায়? রবীন্দ্রনাথের জামাই, নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় করলেন সেই উপায়! ১৬ই নভেম্বর, অর্থাৎ আজকের তারিখে, সকাল সাতটা দশ মিনিটে
কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম করলেন রবিকে।
” Following Cable Received Midnight
Swedish Academy Awarded You Nobel Prize Literature Please Wire Acceptation
Swedish Minister=nagen ”

টেলিগ্রামটা পৌঁছালো বোলপুর। কিন্তু সেদিন ঠিক কি ঘটেছিলো; তা আমাদের জানাবে কে? ভুললে হবে, সেই সময় বিশ্ব ভারতী কিন্তু চাঁদের হাট। সুযোগ্য আশ্রমিক, ছাত্ররা, ঘুরঘুর করছে, চারপাশে। তাদের মধ্যে কেউ লিখে রাখবেন না
সেদিনের কথা, তা কি হয়!

তো আমাদের সেই সুযোগ্য বন্ধুটির নাম, প্রমথনাথ বিশী। তার লেখা ” রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন ” বইয়ে ( ৯০ – ৯১ পাতায় ) তিনি ধরে রেখেছেন, সেদিনের বর্ণনা।
তাঁর কথা এবং তার সাথে নিজের কিছু অনুভূতি যোগ করে, তোমাদের দেখাবো সেই দিনটা, সেই বিশেষ বিশেষ দিনটা ( ১৬ই নভেম্বর, ১৯১৩ )।

আরো পড়ুন:  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের শেষ ইচ্ছা কি পূরণ হয়েছিল ?

সেদিন যখন বোলপুরে টেলিগ্রামটি আসে, তখন রবি ছিলেন না আশ্রমে। তিনি তখন নেপালবাবু এবং আরও দু’একজন অধ্যাপকের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন রাঙামাটির দেশের ইতিউতি।
এমনি এমনি কি আর ঘুরছিলেন, পায়ের নিচে রাঙামাটি, রোদের তাপ ছুঁতে না দেওয়া গাছেদের মায়াবী আকর্ষণ, খোলা আকাশ, খোলা মাঠ, শান্তিনিকেতন তো তখন মর্তের নন্দনকানন।
হয়তো তারই মধ্যে থেকে একটা সুর চুরি করছিলেন, নিজের সৃষ্টির জন্য। রবিকে যারা চোর বলে, তারা বিশেষ ভুল বলে না কিন্তু। পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় নারী, প্রকৃতি রাণীর মন চুরি করতে পারে যে পুরুষ, তার চেয়ে বড় চোর, আর কেই বা আছে!

দেখেছো, আবার খেই হারিয়ে ফেলেছি। আসলে, আমি রবির ব্যাপারে বরাবরের একপেশে, বলতে শুরু করলে থামি না। তো যেটা বলছিলাম, অবশেষে বহু দেশ ঘুরে, সে খবর পৌঁছালো রবির কাছে। না না ভুল বললাম, তখন তো তিনি নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ।
প্রথম কথা ভারতীয়, তার ওপর বাঙালি, তার ওপর প্রথম নোবেল, সে এক গর্ব করবার মতন ব্যাপার বটে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো রবীন্দ্রনাথই, সূর্যের সূর্য বলে কথা! এমন ভারি নাম বইতে পারে যে, তার প্রতিক্রিয়া কি সাধারণ মানুষের মত হবে!

তিনি টেলিগ্রামটা হাতে পেয়ে পড়েছিলেন নীরবে, তারপর সেটা নেপালবাবুর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ” এই নিন নেপালবাবু, আপনার ড্রেন তৈরি করার টাকা “। তখন আসলে, আশ্রমে টাকার খুব টানাটানি চলছিলো এবং একটা পাকা নর্দমা অর্ধেক হয়ে পড়েছিলো।
এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলে রাখা ভালো, আমরা হয়তো ভাবি গীতাঞ্জলী রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দিয়েছে, সারা পৃথিবীর মাথা নত করিয়েছে ওনার প্রতিভার কাছে, এর থেকে বড় পাওয়া আর কিই বা হতে পারে!

উনি কিন্তু অমনটা ভাবতেন না। সে কথা উনি ভীষণ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ওনার এক বক্তৃতাতে। ২৩শে নভেম্বর, শান্তিনিকেতনে, ওনার নোবেল পাওয়ার আনন্দে যে উৎসব আয়োজিত হয়েছিলো, এই বক্তৃতা সেই উৎসবেরই অঙ্গ। পুরো উৎসবের গল্প নাহয় আরেকদিন হবে,
কিন্তু এই দিনটাকে বোঝার জন্য, বক্তৃতার কিছুটা অংশ, জানা প্রয়োজন, রবির ভাষায় – ”
গীতাঞ্জলী আমি যাকে নিবেদন করেছিলুম, তিনি তা গ্রহণ করেছেন এতেই আমি ধন্য, পুরষ্কার যদি কিছু পেয়ে থাকি তা আমার অন্তরেই সঞ্চিত হয়ে আছে, অন্য কোনো পুরষ্কারে, নিজের চিত্তকে উচ্ছসিত করে তোলার দুর্ভাগ্য যেন আমার কখনও না হয়।
যারা আজ আমাকে অভিনন্দিত করতে এসেছেন, তাঁদের সম্মানার্থে তাঁদের প্রদ্যোত অভিনন্দন আমি গ্রহন করলুম কিন্তু অন্তরের সঙ্গে নয়। ”

আরো পড়ুন:  রানাঘাট সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা করে ডাকাতির উদ্দেশ্যে বেরোতেন রনা ডাকাত

( পুনশ্চ:১ যাদের কাছে গীতাঞ্জলীর উৎসর্গপ্ত্র চাক্ষুষ করবার সুযোগ আছে, তারা দেখতে পারো বটে কিন্তু এই গল্পটা শেষ করে উঠো। গল্পের রেশ কাটিয়ে যাওয়া কিন্তু আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
পুনশ্চ:২ অনেক হয়েছে ২৩শে নভেম্বরের গল্প জানা, এবার ১৬ই নভেম্বরে ফেরা যাক, গল্প এখনও অনেক বাকি ।)

নেপালবাবুর হাতে ড্রেনের নামে টাকা দিলেও, নোবেল প্রাইজের মূল্য তো ছিলো লক্ষাধিক। ড্রেন বানাতে এর সবটার প্রয়োজন ছিলো না। বাকি টাকা খরচের ব্যাপারে তিনি নিলেন দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত। যদিও আমরা আগেই জেনেছি, আশ্রমে তখন
টাকার টানাটানি চলছিলো কিন্তু তার চেয়েও বেশি টানাটানি চলছিলো ওনার জমিদারিভুক্ত কৃষক পরিবারে, তার কারণ চাষের জন্য; চড়া সুদে মহাজনের থেকে টাকা ধার। নোবেলের বাকি টাকাটা দিয়ে, রবীন্দ্রনাথ সেই সমস্ত চাষিদের জন্য একটা কৃষি ব্যাঙ্ক খুললেন।
নামমাত্র সুদে, সেখান থেকে কৃষকদের লোন দেওয়া হলো চাষের জন্য, যাতে করে তারাও একটু সুদিনের মুখ দেখতে পারে।

তবে যতই হোক, রবি তো একজন মানুষই, তারও অনুভূতি তো হয়েছিলো নিশ্চয়ই নোবেলকে ঘিরে। তিনি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন প্রথমটায়, খবরটা পেয়ে। সে কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন, বেশ কিছু বছর পরে। ১৯২১ সালের ২৬শে মে
স্টকহোমে আয়োজিত নোবেল বক্তৃতা অনুষ্ঠানের ভাষণে।

” I remember the afternoon when I received the cablegram…and I opened and read the message, which I could hardly believe, I first thought that
possibly the telegraphic language was not quite correct and that I might misread the meaning of it, but atlast I felt certain about it. ”

অনেক হয়েছে গুরু গম্ভীর আলোচনা, এবার দেখবে সেদিন আশ্রমে কি চলছিলো। সেই আমাদের মধুসূদন প্রমদবাবু, উনি আশ্রমিকদের আনন্দময় ঘটনাগুলো সুন্দর করে লিখে গেছেন, এবারে সরাসরি তাঁর ভাষাতেই দেখবো সেদিনটা। এবারে আর নিজের কথা নয়।

” সহসা অজিত কুমার চক্রবর্তী রান্নাঘরে ঢুকিয়া, চিৎকার করিয়া বলিলেন, ‘ গুরুদেব নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন ‘, লক্ষ করলাম অজিত বাবুর চলাফেরা প্রায় নৃত্যের তালে পরিণত হইয়াছে, অজিতবাবু অল্পেই খুশি হন, কাজেই তাহার সনৃত্য ঘোষণা
অস্বাভাবিক মনে হইলো না। বিশেষ তখন পর্যন্ত নোবেল প্রাইজের নাম শুনি নাই।

আরো পড়ুন:  নিজের হাতে মাহেশের রথের নকশা করেছিলেন প্রথম বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার নীলমণি মিত্র

তারপরে ক্ষিতিমোহনবাবু প্রবেশ করিলেন, তিনি গম্ভীর প্রকৃতির লোক, চলাফেরায় সংযত, কিন্তু তাহাকেও চঞ্চল দেখিলাম। ব্যাপার কি? তারপরে যখন জগদানন্দবাবু পৌঁছাইয়া ঘোষণা করিলেন, তিন চারদিনের ছুটি, তখন বুঝিলাম, ব্যাপার কিছু গুরুতর। …
তখন আলোচনা আরম্ভ হলো, নোবেল প্রাইজ কি বস্তু, ডান পাশে যে ছেলেটি বসিয়াছিলো, সে বলিলো, ‘ ওটা Noble প্রাইজ, গুরুদেব মহৎ লোক বলিয়া তাহাকে দেওয়া হইয়াছে ‘। বাম পাশের ছেলেটি বলিলো, ‘ ওটা Novel প্রাইজ, গুরুদেব একখানা নভেল লিখিয়া
পাইয়াছেন “।

বড়রা বলে না! কথায় কথা বাড়ে। ঠিকই বলে, একটা দিনকে লিখতে গিয়ে এত কথা বাড়লো, যে দুই ঘন্টা আর একটা নতুন জেল পেনের কালি কিভাবে শেষ হলো, বুঝতে পারলাম না। তবুও বলা শেষ হলো না। যাই হোক, ‘ এবার যাবার সময় হলো বিহঙ্গের ‘,
‘ যে শেষ কথাটি বলে যাবো আমি চলে ‘ – সেটি হলো নোবেল সার্টিফিকেটের ওপর লেখা কি ছিলো! শুরুতে বলি রবি স্বশরীরে নোবেল গ্রহণ করতে পারেননি। গ্রেট ব্রিটেনের চার্চ দ্য আফেয়ার মিস্টার ক্লাইভ রবির হয়ে ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট ও সোনার পদক গ্রহণ করেন।
সেই সার্টিফিকেটে লেখা ছিলো –
” Awarded to Rabindranath Tagore because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetric thought,
expressed in his own English words, a part of the literature of the west. ”

আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি ঘুমোলো।

লেখিকা : ঈশিতা দে

তথ্যসূচিঃ
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন – প্রমথনাথ বিশী
তদেব।
বিশ্ব পথিক – কালিদাস নাগ।
Tagore and Nobel Prize, Indian Literature Volume IV.
পিতৃ স্মৃতি – রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
Imperfect Encounter.
চিঠিপত্র ১৫ এবং ১৭।
রবী জীবনী – প্রশান্ত কুমার পাল।
The Calcutta Municipal Gazette, Tagore Memorial Special Supplement.
এবং
আমার রবি চর্চা, ২০১১ থেকে এ অবধি।

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।