নিজে স্কুলের গণ্ডিও পার হননি,গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের জন্যে গ্রন্থাগার বানালেন “পুঁথিদাদু”

নিজে স্কুলের গণ্ডিও পার হননি,গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের জন্যে গ্রন্থাগার বানালেন “পুঁথিদাদু”

সমাজে এমন মানুষ থাকেন,আপাতদৃষ্টিতে যারা হয়ত অনেকের চোখে নিতান্ত সাধারণ ! কিন্ত তাঁরা আলো ছড়িয়েছেন সমাজের চারপাশে৷সমাজের জন্য তাঁর কাজ হয়ে উঠেছে অনেকের অনুপ্রেরণা৷পুঁথিদাদুর জীবনের গল্প তেমন এক না বলা উপাখ্যান৷মানুষের জীবনে লাইব্রেরি,বইয়ের প্রয়োজনীয়তা হাসপাতালের তুলনায় খুব কম বোধহয় নয় ! নিশ্চিতভাবে অনেকের মনে হবে,রসিকতার একটা সীমা আছে ! মুঠোফোন আর টেলিভিশনের চ্যানেলগুলো যখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়াচ্ছে,তখন আমাদের রাজ্যের পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বইপাগল একজন মানুষ আর্থিক প্রতিকূলতার মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটা লাইব্রেরি৷তিনি গুরুচরণ গড়াই,সবার প্রিয় পুঁথিদাদু৷হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল মানভূম জেলায়। যা থেকে বিহার ভেঙে তৈরি হয়েছিল বাংলার একটা জেলা নাম — পুরুলিয়া | সেই জেলার বাঘমুণ্ডি থানার বুড়দা গ্রামের পুঁথিদাদু গুরুচরণ গড়াই আট থেকে আশি সকালের কাছে পুঁথিদাদু নামেই পরিচিত ।

আরো পড়ুন:  বিনা চিকিৎসায় হারিয়েছেন মাকে,পরবর্তীতে তিনিই হয়ে উঠলেন সকলের অ্যাম্বুলেন্স দাদা

খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন৷ জীবন সংগ্রামটা তখন থেকেই শুরু৷তবে থেমে যায়নি তাঁর বইয়ের প্রতি প্রীতি,ভালোবাসা আর আবেগ৷বাবার প্রয়াণের পর সংসারে অভাব৷এবার বন্ধ হয়ে গেল স্কুলের রাস্তা৷ চেয়েচিন্তে তিনি বই আনতেন৷ ধান বিক্রির টাকায় কেনা হত বই৷মা ফুটিবালা নিরক্ষর,তবে বইয়ের কদর খুব ভালো বুঝতেন৷ মানুষকে,সমাজকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন এক জন বইপ্রেমীর ভূমিকায় লাইব্রেরি নিয়ে তাঁর উদ্যোগ সব দিক থেকেই অভূতপূর্ব।একটা লাইব্রেরি কেবল চিত্তবিনোদনের স্থান নয়, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক নীরব সাধনক্ষেত্র তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন নিরলস পরিশ্রমে,আর উপার্জিত অর্থ জলের মত ব্যয় করে৷তিনি ছিলেন সকলের প্রিয় পুঁথিদাদু ৷কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা তাঁর বই প্রীতিতে থাবা বসাতে পারেনি৷তিনি নিজে স্কুলের গণ্ডিও পার হননি৷ তবে জ্ঞান যে সবসময় প্রথাগত শিক্ষার ধার ধারে না তার বড় উদাহরন ছিলেন পুঁথিদাদু ৷ কত বিশেষণ তাঁর নামের পাশে৷কেউ বলতেন চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া,কেউ বলতেন বই পাগল৷ঠাকুরদা গদাধর গড়াইয়ের লেখা গল্প পড়ে পড়াশোনার প্রতি ঝোঁকটা বাড়ে৷ ঠাকুরদার লেখা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়নি৷কিন্তু সেইসব লেখা ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা৷আর সেখান থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গ্রামের মানুষের জন্য গ্রন্থগার প্রতিষ্ঠা করবেন৷কিছু বই কিনলেন,কিছু মানুষের থেকে বই জোগাড় করে বুড়দা গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন “চৈতন্য গ্রন্থগার”৷যখন তিনি গ্রন্থগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন সাকুল্যে বইয়ের সংখ্যা ছিলো একশোর আশেপাশে৷ সেই বই নিয়ে অবশ্য পড়েছিলেন বেশ বিপদে ৷বই না হয় জোগাড় হল৷কিন্তু বইগুলো ভালো ভাবে রাখার মত আলমারি যে নেই৷বাবার দাদার কাপড়ের দোকান থেকে আলমারি কিনে বই রাখার ব্যবস্থা হল।

আরো পড়ুন:  রক্তের অভাবে মৃত্যু হয়েছিল দিদির,সেই থেকে রক্তদানই একমাত্র নেশা বাপন দাসের

তারপর সময় যত গড়িয়েছে,পুঁথিদাদুর গ্রন্থগারে বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে৷একশো বই নিয়ে “চৈতন্য গ্রন্থগার” প্রতিষ্ঠা হলেও আজ সেখানে হাজারের বেশি বই আছে৷অনেক দুর্লভ বই সেখানে পাঠকরা খুঁজে পাবেন৷রবীন্দ্রনাথ যেমন স্বমহিমায় আছেন সেখানে তেমন “চৈতন্য গ্রন্থগারে” আছে ইতিহাস,বিজ্ঞান সম্পর্কিত হরেক রকমের বই৷পেশায় কৃষক পুঁথিদাদুর কাছে পড়তে আসেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ছাত্রছাত্রীরা | জ্ঞান যে সবসময় প্রথাগত শিক্ষার ধার ধারে না তার বড় উদাহরন ছিলেন পুঁথিদাদু৷তাঁর প্রতিষ্ঠিত “চৈতন্য গ্রন্থাগারে”বই পড়তে পাওয়া যায় বিনা পয়সায়৷পুঁথিদাদু টিউশানের অর্থের সম্পূর্নটা ব্যয় করতেন গ্রন্থাগারের বইয়ের জন্য৷গুরুচরণ গড়াই নিজে সাহিত্য চর্চা করতেন৷ “কোরক” নামে একটি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা তিনি স্বয়ং৷বুড়দা গ্রাম থেকে বাঘমুন্ডি ব্লকের আবালবৃদ্ধ বনিতা একবাক্যে স্বীকার করেন পুঁথিদাদু ও তাঁর লাইব্রেরি না থাকলে এলাকায় শিক্ষার প্রসার এত দ্রুত ঘটত না৷ খুব কম মানুষ আছেন যিনি পড়াশোনার জন্য তাঁর সাহায্য পাননি৷পুঁথিদাদু সবসময় বলতেন কি পেয়েছি,কি পাইনি জানি না,তবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছি সমাজে আর সেটা তাঁর জীবনে সেরা প্রাপ্তি মনে করতেন৷

আরো পড়ুন:  ‘যে স্বপ্ন দেখতে পারে না, অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারে না’-চারু মজুমদার

-অরুনাভ সেন

ছবি – এই সময়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।