প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হাত ধরেই আদালতে স্থান পেয়েছিল বাংলা ভাষা,বাঙালি মনে রাখেনি

প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হাত ধরেই আদালতে স্থান পেয়েছিল বাংলা ভাষা,বাঙালি মনে রাখেনি

১৮৩৭-৩৮ সালের কথা | ততদিনে উকিল হিসেবে যথেষ্ট নাম করে গেছেন তিনি | এই সময় আদালতে তাঁর আয় ছিল বাৎসরিক দুই লক্ষাধিক টাকা | কিন্তু তখনও আদালতের নিত্যদিনের কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হত না | ফার্সির সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও আদালতের প্রাঙ্গণে আনতে হবে। তাতে বাংলার সমস্ত মানুষেরই উপকার হবে। শুরু হল এক লড়াই, ভাষাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার লড়াই। আদালতের দরবারে নিজের বক্তব্য তুলে ধরাই শুধু নয়; পত্রিকায় একের পর এক লেখা লিখতে লাগলেন | শেষমেশ ব্রিটিশরা মেনে নিল তাঁর প্রস্তাব | ১৮৩৮ সালে প্রথমবার বাংলা ভাষা পা রাখল আদালত চত্বরে | প্রসন্নকুমার ঠাকুর, উনবিংশ শতকে বাঙালি সমাজের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব | প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হাত ধরেই আদালতে ঢুকেছিল বাংলা ভাষা | বাঙালি মনে রাখেনি |

প্রসন্নকুমার যখন জন্মগ্রহণ করলেন, ততদিনে দু’ভাগ হয়ে গেছে ঠাকুর পরিবার। শেষ পর্যন্ত বিস্তর কোর্ট কাছারির পর নীলমণি ঠাকুর চলে যান জোড়াসাঁকোয় এবং জোড়াবাগান পাথুরিয়া ঘাটায় একাই রাজত্ব চালাতে লাগলেন ‘রাজা’ দর্পনারায়ণ ঠাকুর। তাঁর পুত্র গোপীমোহনও নেহাত কম বিদ্বান ছিলেন না। হিন্দু কলেজের (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষা, দীক্ষা, সংস্কৃতিতে পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবার সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে লাগল। গোপীমোহন ঠাকুরের পুত্র প্রসন্নকুমার ঠাকুর ১৮০১ সালের ২১ শে ডিসেম্বর প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন।প্রসন্নকুমার স্বগৃহে ও শেরবার্ন’স স্কুলে লেখাপড়া শেখেন। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানেও ভর্তি হন। স্মৃতিশাস্ত্র ও পাশ্চাত্য আইনবিদ্যায় তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করে দেওয়ানি আদালতে আইনব্যবসা শুরু করেন।

আরো পড়ুন:  বর্ধমানে মহামারী,নিজের প্রাণ বিপন্ন করে আর্তের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন "চিকিৎসক" বিদ্যাসাগর

অতি স্বল্পকালের মধ্যেই তিনি সরকারী উকিল নিযুক্ত হন।তখন জোড়াসাঁকো থেকে নিজের ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেছেন দ্বারকানাথ ঠাকুরও। সেই কাজে তিনি নিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুরকে | প্রসঙ্গত, বিচ্ছেদের পর পাথুরিয়াঘাটা এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মধ্যে বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। সেখানে দ্বারকানাথের, প্রসন্নকুমারকে সহযোগী করার ভাবনা একটু অন্যরকমই মনে হতে বাধ্য | যাইহোক প্রসন্নকুমার যোগ দিলেন ‘কার, টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’-তে |

যখন ১৮৫৪ সালে ভাইসরয়ের কাউন্সিল তৈরী হল, তখন প্রসন্নকুমার সেখানে করণিক নিযুক্ত হলেন | এরপর বাংলার কাউন্সিল গঠিত হলে তিনি দুবার এখানকার সদস্য নির্বাচিত হন | ধীরে ধীরে আইনজ্ঞ হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র এবং জীবনের এই পর্ব থেকে প্রসন্নকুমারের প্রতিপত্তির শুরু | ১৮২৩ সালে রক্ষণশীল গৌড়ীয় সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নির্বাচিত হন। রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের প্রতিনিধি হলেও রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদের পক্ষে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন প্রসন্নকুমার ছিলেন তার সমর্থক ও সহায়ক। পরে তিনি ব্রাহ্ম হয়ে যান এবং ব্রাহ্মসমাজের প্রথমদিককার একজন ট্রাস্টি নিযুক্ত হন |

আরো পড়ুন:  ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এই বঙ্গকন্যা

ভাইসরয়ের কাউন্সিল গঠিত হলে তিনিই হলেন প্রথম বাঙ্গালী যিনি এখানকার সদস্য মনোনীত হন। এরপর বাংলার কাউন্সিল গঠিত হলে তিনি দুবার এখানকার সদস্য নির্বাচিত হন | সেই সময়ের অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে ছিলেন প্রসন্ন কুমার। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহযোগী হিসাবে তিনি ‘জমিদার সমাজ’ (Land holders’ Soceity) ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭১ সালে তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন | প্রসন্নকুমার ঠাকুর যে সময় ওকালতি শুরু করেন, তখন আদালত চত্বরে ফার্সি ভাষাই ব্যবহৃত হত। সেটাই ছিল সরকারি কাজের ভাষা। প্রসন্নকুমার দেখলেন, এর ফলে তো অনেক সমস্যা হচ্ছে। বনেদি সমাজ ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে ফার্সি শেখার প্রবণতা থাকলেও, সাধারণ মানুষরা তো এই ভাষা সম্পর্কে অবগত নয়। তাহলে? তাঁদের সুবিধার কথা ভাবা হবে না ? সেই জায়গা থেকেই তিনি শুরু করলেন বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার লড়াই | তাঁর লড়াইয়ের ফলেই আদালতে ঢুকেছিল বাংলা ভাষা |

আরো পড়ুন:  কৃত্রিম নখেই নেতাজি থেকে ভগৎ সিংহের ছবি,ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসে নাম তুললেন বর্ধমানের বুবুন পাল

শুধু এখানেই নয়; প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হাত ধরে বাংলার প্রথম থিয়েটারও প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩১ সালে শুরু হয় ‘হিন্দু থিয়েটার’-এর যাত্রা। বাংলার সংস্কৃতির দিকটিও খেয়াল রেখেছিলেন প্রসন্ন। আর তারই অঙ্গ হিসেবে শুরু হয় থিয়েটার | ১৭৯৬ সালে রাশিয়ান পণ্ডিত অভিযাত্রী গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ প্রথম বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। কিন্তু এর পর এই ধারায় বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। ১৮৩২ সালে প্রসন্নকুমার তার নারকেলডাঙার বসতবাড়িতে একটি অস্থায়ী নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেন। সেখানে মাত্র কয়েকটি ইংরেজি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল | যদিও এখানে ইংরাজী নাটক অভিনীত হত তবুও প্রসন্নকুমারকেই বাংলার নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা যায়।

শিক্ষাবিস্তারেও তিনি অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। তাঁর দেওয়া টাকার সুদেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের “টেগোর ল প্রফেসর” এর খরচ চালানো হয় | সেই সময়ে লেখক হিসাবেও তিনি খ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর লেখা অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হল, “An appeal to the countrymen” ও “Table of succession according to the Hindu law of Bengal.” ১৮৮৬ সালের ২০ আগষ্ট ৮৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন প্রসন্নকুমার ঠাকুর |

তথ্য : উইকিপিডিয়া,বিজন ব্যানার্জী,খেয়ালখুশির পাতা(অরবিন্দ ঘোষ)

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।