প্ল্যানচেটে ডেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আত্মা”-কে আবৃত্তি শোনালেন প্রবোধকুমার সান্যাল

প্ল্যানচেটে ডেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আত্মা”-কে আবৃত্তি শোনালেন প্রবোধকুমার সান্যাল

প্ল্যানচেটে আগ্রহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ি থেকেই উত্তরাধিকার হিসাবেই এই আগ্রহ জন্মেছিল তাঁর মধ্যে। শোনা যায়, একবার তিনি নাকি প্ল্যানচেট করে সুকুমার রায়কে ডেকেছিলেন। মৃত্যুর পরও যেন প্ল্যানচেট পিছু ছাড়েনি কবির। রবীন্দ্রনাথকে প্ল্যানচেট করে কে ডেকেছিলেন জানেন? তিনি হলেন আরেক বাঙালি সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল। তাঁর বই ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ আকৃষ্ট করেছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও। শান্তিনিকেতন থেকে ডাকও এসেছিল। প্রবোধকুমার সাক্ষাৎ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। শোনা যায়, কবির সঙ্গে প্রবোধকুমারের এমন সখ্য ছিল যে, মারা যাওয়ার পর তাঁকে প্ল্যানচেটেও ডাকেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা খুব ভাল আবৃত্তি করতেন প্রবোধকুমার। রবীন্দ্রনাথের আত্মা নাকি তাঁর মুখে একটি কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে মানে তাঁর আত্মাকে ‘কঙ্কাল’ কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন প্রবোধকুমার সান্যাল।

এই ঘটনাটি বিশ্বাস করুন বা নাই করুন প্রবোধকুমার মানুষটি কিন্তু অদ্ভুত উন্নাসিক ছিলেন। লিখতে লিখতে কোনোদিকে খেয়াল থাকত না তাঁর। একদিন মাটিতে বসে লিখছেন, হঠাৎ হাজির হল একটা তেঁতুলবিছে। প্রবোধকুমার সান্যালকে সামনে পেয়ে এক কামড় দিয়েছে বিছেটি। কিন্তু কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই তাঁর! যেন কিছুই হয়নি, এইভাবে লিখেই যেতে লাগলেন। যন্ত্রণায় মুখটি এতটুকুও বিকৃত হল না। শুধু তাই নয়, যখন লিখতেন তখন কারোর সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতেন না,খেতেনও না। তবে ভেতরে ভেতরে তখনও যাত্রা চলত তাঁর। লেখার সময় তাঁর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত। টানা লিখে যেতেন। জীবনের সবচেয়ে বড়ো উপন্যাস ‘হাসুবানু’ লিখেছিলেন ছ’মাস ধরে। লেখার পরে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেলেন কারণ লিখতে লিখতেই পা থেকে কোমর পর্যন্ত অবশ হয়ে গিয়েছিল।

আরো পড়ুন:  হাসিনার মুখে মুজিবর হত্যার কাহিনী শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত,বলে উঠলেন "জয় বাংলা"

আবার লেখা না থাকলে এই মানুষটাই কিন্তু সম্পূর্ন আলাদা। ঘরে কিছুতেই মন টিকত না। বারে বারে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তেন এক অমোঘ আকর্ষণে। নিয়মে ঘেরা জীবনের প্রতি তাঁর ছিল বড়ই অনীহা। ছোট থেকেই চাঞ্চল্য আর দুষ্টুমি তাঁর নিত্যসঙ্গী। ছোট্ট বেলাতেই দিদিমার মুখে কাশী যাওয়ার গল্প শুনে বাগবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন কাশীর পথ খুঁজতে। রাস্তার এক পাহারাওয়ালা তাঁকে রাস্তায় ঘুরতে দেখে কোলে করে ফিরিয়ে দিয়ে যান। প্রবোধকুমারের বয়স তখন চার কিংবা পাঁচ।

শোনা যায়, একবার নাকি পকেটে মাত্র পঁয়ষট্টি টাকা নিয়েই হিমালয় যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে পড়েছিলেন। মাত্র আটাশ দিনে পায়ে হেঁটে ঋষিকেশ থেকে আলমোড়ার রাণীক্ষেত অবধি ৬৪৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করেছিলেন প্রবোধকুমার। সেই গল্পই আবার লিখেছিলেন তাঁর ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ বইতে। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাসের নাম ‘যাযাবর’। একেবারে আদর্শ নামকরণ। কখনও পাহাড় থেকে ফিরেই কয়েকমাসের মধ্যেই পালিয়ে গেছেন রেঙ্গুনে। সেনাবাহিনীর চাকরি নিয়ে চলে গেছেন অধুনা পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির পাহাড়ে। সেখানেও ঘুরে বেড়াতেন নিজের মত। কিছুদিন পর সেই সেনাবাহিনীর চাকরিও ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসেন। বিয়ে করে সংসারী হলেও চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নেন। লিখেই জীবিকা নির্বাহ করবেন স্থির করেন। সেই সময় এমন সিদ্ধান্ত বেশ কঠিন ও অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল। কিন্তু প্রবোধকুমার এমনই সিদ্ধান্ত নেন। টানা লিখে যেতেন আবার লেখা শেষ হলেই পাহাড়ে চলে যেতেন। এমনই বোহেমিয়ান জীবন যাপন করতেন তিনি।

আরো পড়ুন:  কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগুরু বিহারীলাল চক্রবর্তীই আধুনিক বাংলা গীতিকাব্যের প্রধান পুরোধা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখার প্রশংসা তো করতেনই। একইসঙ্গে তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষরাও। আরো কত বিখ্যাত মানুষ যে তাঁর ভক্ত, প্রিয়পাত্র ছিলেন। এমনকী সেই সময় বাংলা চলচ্চিত্রেও প্রবোধকুমারের লেখার খুব চাহিদা ছিল। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে প্রায়ই আসতেন উত্তমকুমার। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সঙ্গেও ভারী ভাব ছিল তাঁর।

তবে প্রবোধকুমারের ছোটবেলা কিন্তু খুব সুখের ছিল না। বরং স্কুলজীবন কেটেছে অভাবে। খুব দুষ্টু ছিলেন, একইসঙ্গে মেধাবীও ছিলেন। মাস্টারের টিকি ধরে টেনে শাস্তি পেয়েছেন আবার বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন। চিত্তরঞ্জন দাশের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্বদেশি আন্দোলনে। জেলও খেটেছেন। পাশাপাশি চলেছে কবিতা ও গল্প লেখা। বাড়িতে রাতে আলো জ্বলত না। তাই খাতা-কলম নিয়ে সোজা চলে যেতেন শিয়ালদা স্টেশন। একটা শান বাঁধানো জায়গা খুঁজে নিয়ে লেখা শুরু করতেন। পাশ দিয়ে হাজারো লোক আসত-যেত, ফেরিওয়ালার চিৎকার ঢুকে পড়ত কানে, ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যেত শব্দ তুলে। কিন্তু প্রবোধকুমার মগ্ন থাকতেন নিজের খেয়াল, নতুন নতুন চরিত্রের সৃষ্টি করতে।

আরো পড়ুন:  ব্রিটেনের সি বি ই পুরস্কারে সম্মানিত হলেন বঙ্গতনয়া বাসবী ভট্টাচার্য ফ্রেজার

প্রবোধকুমারের লেখার মূল উৎস ছিল নিজের এই ঘুরে বেরনোর নেশা। যদিও এই নেশার জন্য বিপদেও পড়তেন। মানস সরোবরে গিয়ে ভয়ঙ্কর তুষারঝড়ের কবলে পড়েছেন। আবার পঁচাত্তর ছুঁইছুঁই বয়সে গেছেন উত্তরমেরু। তার আগে ৭৪ বছর বয়সে ঘুরতে গিয়েই চোট পেলেন ডান হাতের আঙুলে। নিজের হাতে লেখা বন্ধ হয়ে গেল তারপর। ৭৮ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে অবধি আর কলম ছুঁতে পারেননি তিনি। তবুও তিনি ছিলেন চির যাযাবর। ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে থাকা এক মানুষ। তাঁকে ছোঁয়া যায়, অনুভব করা যায় কিন্তু ধরে রাখা যায় না।

তথ্য – বঙ্গদর্শন, উইকিপিডিয়া

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।