আর্ট কলেজে পড়ার খরচ চালাতে শ্যামবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন তিনি

আর্ট কলেজে পড়ার খরচ চালাতে শ্যামবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন তিনি

পাশ্চাত্য চিত্রকলায় তিনি মুগ্ধ হলেও মন সন্তুষ্ট ছিল না। কিছু একটা অনুপস্থিত ছিল সেই ছবিগুলোর মধ্যে | তাই ছবি এঁকেও মন ভরছিল না সেই যুবকের | একদিন কালীঘাটের মন্দিরের আশেপাশে ঘুরছিলেন | সেখানে তিনি দেখলেন কিছু পটশিল্পী পটচিত্রের মাধ্যমে মা কালীর কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন | থমকে দাঁড়ালেন তিনি | খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন সব পটচিত্র | বুঝলেন তার আগের আঁকা ছবিগুলোতে অনুপস্থিত ছিল দেশীয় সংস্কৃতি, স্বদেশের মানুষ, তাদের জীবনাচার ও প্রকৃতি। পথের সন্ধান পেয়ে গেলেন তরুণ চিত্রকর। সিদ্ধান্ত নিলেন, বাংলার লোকশিল্পকেই পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবেন। আর বাকিটা ইতিহাস |

তিনি যামিনী রায় | বলতেন, ‘আমি পটুয়া’| গ্রামীণ জীবন-জীবিকা, লাঙল হাতে চাষী, কীর্তন গায়ক, কিশোরী কন্যাদের হাসি, ঘরোয়া বধূ, বাঁশীবাদক ক্লান্ত পথিক, নৃত্যরত তরুণীদ্বয়, বাঘ, মাছ, বিড়াল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রভৃতি হলো তার অঙ্কনের বিষয়াদি। পটচিত্রের উপাদানে আরও রসদ যুগিয়েছে প্রিয় ধর্মকাহিনীগুলো। যেমন- রামায়ণ কথা, চৈতন্যের জীবনী, ক্রুশবিদ্ধ যীশুর জীবন, রাধা-কৃষ্ণ, জগন্নাথ-বলরাম ইত্যাদি। রঙের ব্যবহার যামিনী রায়কে সবচেয়ে বেশি পৃথক করেছে সকল আঁকিয়ে থেকে। পটুয়াদের মতো তিনিও মেটে রঙে ছবি এঁকেছেন। একটি তথ্য না দিলেই নয় যে, স্বদেশপ্রেমিক শিল্পী যামিনী রায় তার পটচিত্রে শুধুমাত্র দেশজ রঙই ব্যবহার করেছেন।

আরো পড়ুন:  মহানগরী কলকাতার বুকে এক টুকরো তিব্বতের স্বাদ

এই যে মাটির কাছাকাছি নয়, মাটিতেই বাঁচা, এ জিনিস তাঁর রক্তে। তাঁর পূর্বপুরুষ যশোরের প্রতাপাদিত্য রায়ের বংশধর | ১৮৮৭ সালের ১১ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে যামিনী রায় জন্মগ্রহণ করেন | তাঁর বাবা রামতারণ রায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে এসে চাষির জীবন শুরু করলেন। ইংরেজি-জানা, ব্রহ্মসংগীত-গাওয়া মানুষটা তুলোর চাষ করতেন, নিজের হাতে সুতো তৈরি করে গ্রামের তাঁতিদের দিয়ে ধুতি-শাড়ি বানিয়ে নিতেন ঘরের লোকেদের জন্য। নিজে হাতে খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন খেতখামারে। যামিনী রায় শৈশবে ঘরের দেয়ালে, মেঝেতে কিংবা হাতের কাছে যা-ই পেতেন, তাতেই পুতুল, হাতি, বাঘ, পাখি ইত্যাদি এঁকে গেছেন নিজের মনে। কারিগর, ছুতোর, কুমোর, পটুয়াদের কাজ কাছ থেকে দেখাটাই শিল্পের ভিত গড়ে দিয়েছিল। যামিনীর প্রতিভা নজরে পড়েছিল জেলা-প্রশাসকের, তিনিই ব্যবস্থা করেছিলেন ষোলো বছরের ছেলেটা যাতে কলকাতায় সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে পারে। বিশ শতক শুরুর সেই কলকাতায় যামিনীর বড়দাদা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। যামিনী কিন্তু দাদার বিলাসী আশ্রয়ে উঠলেন না, উত্তর কলকাতায় বাসা ভাড়া নিলেন। রুটি-রুজির জন্যে কত বিচিত্র কাজ যে করেছেন! ইহুদি ব্যবসায়ীর অর্ডারি কার্ড এঁকেছেন, একশো কার্ড আঁকলে দশ-বারো আনা, তাতে এক প্লেট ভাত মেলে। উত্তর কলকাতার এক বাড়ির রোয়াকে বসে লিথোগ্রাফির কাজ করেছেন। শ্যামবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করেছেন, শাড়ি কেনাবেচা করতে গিয়ে বুঝে গিয়েছিলেন নানা পেশার মানুষের রঙের পছন্দ-অপছন্দ! কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের তৎকালীন অধ্যক্ষ, ভারতের আধুনিক চিত্রকলার অগ্রপথিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠছিলেন তিনি দিনে দিনে।

আরো পড়ুন:  পয়সা উপার্জনের জন্যে কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ইলাস্ট্রেশনের ফরমায়েশির কাজ করতেন গণেশ পাইন

বেলিয়াতোড় গ্রামের আশেপাশেই ছিল সাঁওতাল আদিবাসীদের বসবাস। যামিনী রায় ১৯২১ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যকার সময়ে নতুন এক গবেষণা চালালেন সাঁওতাল আদিবাসীদের নিয়ে। তাদের জীবনাচারকে তিনি তুলির রঙে নতুন করে দেখবেন বলে ঠিক করলেন। সেখানে স্থান পেলো সাঁওতাল নারীদের নাচ, পরিবার, জীবনযাপনের দৃশ্যসহ দৈনন্দিন জীবনের রূপ।

আরো পড়ুন:  দিনে ২৫-৩০ বার চা খেতেন নেতাজী,পছন্দ করতেন নারকেলের তৈরী মিষ্টি

নিজস্ব বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাবধারার জন্য তিনি গর্বিত ছিলেন। তিনি বহুবার বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ পেলেও কখনও বিদেশে যাননি।তিনি বলেছিলেন “আমরা গরিব দেশের মানুষ, এত পয়সা খরচ করে ওদের দেশে যাব কেন? ওদের অনেক পয়সা, ওরা এসে আমাদেরটা দেখে যাক।” ১৯৩৪ সালে যামিনী রায় তার আঁকা একটি চিত্রকর্মের জন্য ‘ভাইসরয় স্বর্ণপদক’ পান। ভারতীয় সরকার থেকে ১৯৫৫ সালে তিনি ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ করেন। যামিনী রায়ই সর্বপ্রথম চারুশিল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মাননা, ‘ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার’ পান ১৯৫৫ সালে। তিনি আছেন বাঙালির দেওয়ালে, সস্তার নড়বড়ে বাঁধাইয়ে, ডেস্ক-ক্যালেন্ডারে, নতুন বছরের শুভেচ্ছাবার্তার ছবিতে, বিয়ের কার্ডে, মেলায়। তাঁর ছবির সরল বলিষ্ঠতা এখনও বাঙালির গৃহসজ্জায় কুটোবাঁধা।

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া, আনন্দবাজার
লেখক- অভীক মণ্ডল

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।