জেদ ধরে জেলে সরস্বতী পুজো করিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

জেদ ধরে জেলে সরস্বতী পুজো করিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

১৯২৩ সাল | ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তখন মধ্যগগনে | বাংলার পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ | ১৯২৩ সালে সুভাষচন্দ্র বসুকে বন্দি করে ব্রিটিশ পুলিশ | পরের বছর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বহরমপুর জেলের সাত নম্বর ঘরে | এখানেই প্রায় দুই মাস বন্দি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু | এখন সেটি হয়েছে মানসিক হাসপাতাল |

জেলে থাকার সময় এল সরস্বতী পুজো | সেই সময় বহরমপুর জেলে সরস্বতী পুজো হত না | জেলের ভিতরে সরস্বতী পুজো করার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু জেদ ধরেন | প্রথমে রাজি না হলেও শেষমেশ দাবি মেনে নেয় জেল কর্তৃপক্ষ | লোকসংস্কৃতি গবেষক পুলকেন্দু সিংহ ‘মুর্শিদাবাদে সুভাষচন্দ্র’ গ্রন্থে লেখেন, ‘‘বহরমপুর জেল থেকে সুভাষচন্দ্র ৮।১২।১৯২৪ তারিখে শরৎচন্দ্র বসুকে লিখেছেন, ‘গত বুধবার আমি এখানে এসে পৌঁছেছি।’ অর্থাৎ তিনি বহরমপুরে এসেছিলেন ৩।১২।১৯২৪ তারিখে। এখান থেকে তিনি যান ২৫।১।১৯২৫ তারিখে। তখন দুর্গাপুজোর সময় নয়। সময়টি ছিল সরস্বতী পুজোর।’’ সেই সরস্বতী পুজোর সময় জেলের বাইরের বহু লোক পুজো দেখতে এসেছিলেন বহরমপুর জেলে |

মুর্শিদাবাদের সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর সম্পর্ক বহু পুরোনো | বহরমপুরে এলে হয় শশাঙ্কশেখর বা মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ব্রজভূষণ গুপ্তের বাড়িতে উঠতেন তিনি | তাঁর এই জেলায় প্রথম আসা সম্ভবত ১৬-১৭ বয়সে, ছাত্রজীবনে, ১৯১৩-১৪ সাল নাগাদ। সুভাষের বাল্যবন্ধু, কৃষ্ণনগরের হেমন্ত সরকার লিখেছেন, ‘‘কৃষ্ণনগর থকে ট্রেনে আমরা পলাশি গেলাম।…যুদ্ধক্ষেত্রে ভ্রমণ করতে করতে আমি কবি নবীন সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ আবৃত্তি করলাম। সেই আবৃত্তি শুনে সূভাষচন্দ্র চোখের জল ফেললেন।’’ পলাশি ভ্রমণের পরে সুভাষকে নিয়ে কয়েক বন্ধু যান বহরমপুরে হেমন্তকুমারের আত্মীয়ের বাড়ি়। পরদিন লালবাগ গিয়ে নবাব সিরাজের সমাধিক্ষেত্র দেখতে যান সুভাষ। ভাগীরথী সান্নিধ্যে আবৃত্তি করেন, ‘‘এই গঙ্গায় ডুবিয়াছি হায় ভারতের দিবাকর হে/ উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার হে।’’ বহরমপুর ছাড়াও বেশ কয়েক বার নানা কর্মসূচিতে জঙ্গিপুর, রঘুনাথগঞ্জ, জিয়াগঞ্জ লালবাগ, বেলডাঙা, কান্দি, লালগোলা, গোকর্ণ, জেমো, পাঁচথুপি গিয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু | স্বাধীনতা সংগ্রামের তহবিল সংগ্রহের জন্য বহরমরপুরে কৃষ্ণনাথ কলেজে এসে বক্তৃতাও করেছেন তিনি | ১৯৩৯ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন। জিয়াগঞ্জের কংগ্রেস প্রার্থী তাজ বাহাদুর দুগরের হয়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারে এসে যা বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা পরের প্রজন্ম মনে রেখেছিল | সে বার, রাজা সুরেন্দ্রনারয়ণ সিংহকে হারিয়ে তাজ বাহাদুর বিপুল ভোটে জয়ী হন। সে বার তাঁকে জিয়াগঞ্জ থেকে রুপোর তরবারি উপহার দেওয়া হয়েছিল।

আরো পড়ুন:  ন'বছর বয়সে স্কুলের হেডমাস্টার !বাবর আলী নিজের স্কুলে পড়িয়েছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীকে

এখানেই শেষ নয় আলিপুর জেলে বন্দি থাকার সময় সেখানেও সরস্বতী পুজো করিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু | সেই সময় আলিপুর জেলে কনডেমড সেলে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাচ্ছিলেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস | তারাও যোগ দিয়েছিলেন সেই সরস্বতী পুজোয় | জেলের সকল বন্দিদের জন্যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল খিচুড়ি ভোগের |

আরো পড়ুন:  নীলগঞ্জ ও ঝিকরগাছাতে ব্রিটিশরা হত্যা করেছিল ৫০০০ আজাদ হিন্দ সৈন্যকে,ইতিহাসের অলিখিত অধ্যায়

মান্দালয় জেলে বন্দি থাকার সময়ও সরস্বতী পুজো ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ভাতা চেয়ে বার্মা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে জেল থেকে সুভাষচন্দ্র বসু চিঠি লিখেছিলেন |

চিফ সেক্রেটারি
বর্মা সরকার
মান্দালয়
২-২-২৬

প্রসঙ্গ : ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্য বরাদ্দ ভাতা ।

প্রিয় মহাশয়,

আমাদের দাবীদাওয়ার প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সরস্বতী পূজার খরচ সম্পর্কে ১৬ জানুয়ারি, ১৯২৬-এ প্রেরিত পত্রটির কোনাে জবাব এখনও আমরা পাইনি।

আমরা ইন্সপেকটর জেনারেল অব প্রিজনসকে অনেক আগেই জানিয়েছিলাম যে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান (যেমন—সরস্বতী পূজা, হােলি ও দোলপূর্ণিমা উৎসব এবং দুর্গাপূজা) আমরা এখানে পালন করতে চাই। এই প্রসঙ্গে অনুরােধ জানিয়েছিলাম, এই উৎসবাদির খরচপত্র যেন সরকার বহন করে।

সরস্বতী পূজানুষ্ঠান পালিত হয়েছে প্রায় একপক্ষকাল আগে, ওই বাবদ খরচ হয়েছে ৭৬ টাকা ৯ আনা। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং পরবর্তী দু-দিন হােলি উৎসব সম্পন্ন হবে, এই উৎসব বাবদ খরচ সরস্বতী পূজার চাইতে সামান্য কিছু বেশি, কিন্তু ওই অর্থের পরিমাণ কোনােমতেই ১০০ টাকার বেশি হবে না। সরস্বতী পূজা এবং দোল-উৎসব বাবদ খরচের টাকা আমাদের দেবার জন্যে অনুরােধ জানাচ্ছি।

আরো পড়ুন:  পড়াশোনা দ্বিতীয় শ্রেণী অবধি,পরবর্তীতে ট্যাক্সি চালিয়ে দুটি স্কুল বানিয়েছেন গাজী জালালউদ্দিন

এখানে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের উল্লেখ করা বােধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না, ওই জেলে
খ্রিস্টান কয়েদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের জন্য বছরে ১২০০ টাকা দেওয়া হয় (১৯১৯-২০
সালের ভারতীয় জেল কমিটি বিবরণের তৃতীয় খণ্ডের ৭৪৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বাংলার জেলকয়েদী এবং রাজবন্দীদের সরকারি খরচে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সুযােগ দেওয়া হয়—আমরা এ-তথ্যও আপনাদের জানিয়েছি। বর্মার জেলে বন্দীদের সরকারি খরচে কী কী সুবিধে দেওয়া উচিত—সে-সম্পর্কে আপনি এবার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আশা করি ।

অর্থবরাদ্দ করার ক্ষমতা এখন বর্মা সরকারের হাতে, সুতরাং চিঠির উত্তর পেতে আশা করি দেরি হবে না। দোল-উৎসবের প্রস্তুতি নিতে কিছু সময় লাগবে, আশা করি, এই মাসের মাঝামাঝি আপনার জবাব পাব।

বিনীত
স্বাক্ষর/এস. সি. বি.
এস. সি. এম.
টি. সি. সি.
বি: বি. জি.
এম. এম. বি.
এম. এম. জি.
এস. এস. সি.
জে. এল. সি.

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।