নেতাজির জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকে হত্যা করেছিলেন রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট-এর সদস্যা নীরা আর্য

নেতাজির জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকে হত্যা করেছিলেন রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট-এর সদস্যা নীরা আর্য

ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর ছিলেন শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস | শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ইংরেজ প্রভুভক্ত অফিসার | ব্রিটিশরা শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে গুপ্তচরবৃত্তি করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল | একসময় সুযোগ পেয়ে শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নেতাজিকে হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গুলি নেতাজির গাড়ীর চালককে বিদ্ধ করে | সেখানেই সেই মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের ’রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এর সদস্যা নীরা আর্য।জয়রঞ্জনকে তিনি দ্বিতীয় সুযোগ দেননি | চোখের পলকে নীরা আর্য শ্রীকান্ত জয়রঞ্জনের পেটে বেয়নেট চালিয়ে হত্যা করে | শুধু এটুকুই তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখানে একটা অভাবনীয় চমক আছে | শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন ছিলেন নীরা আর্যের স্বামী | হ্যাঁ, নেতাজি ও দেশের জন্যে নিজের স্বামীকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করেননি নীরা আর্য | এই ঘটনার পর নেতাজি নীরাকে অভিহিত করেছিলেন ‘নাগিনী’ নামে।

পৃথিবীর প্রথম সশস্ত্র নারী বাহিনী গঠন করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরঙ্গনা ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈকে স্মরণ করে আজাদ হিন্দ বাহিনীর রেজিমেন্টের নাম দিয়েছিলেন রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট | জাপানিরাও এর বিরোধিতা করেছিলেন | তাঁদের আশঙ্কা ছিল, মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলে অস্ত্রের সদ্ব্যবহার হবে না এবং অর্থ অপচয় হবে | কিন্তু নেতাজি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় | এইসময় ডাক্তারির ছাত্রী লক্ষ্মী এগিয়ে আসেন | ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে ঝাঁসি রেজিমেন্ট পথ চলা শুরু করে, এই রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মী সেহগল । প্রথম প্রথম এই বাহিনীতে খুব বেশি মেয়েরা যোগ দেয়নি | সেই সময় লক্ষী সেহগল মেয়েদের সমাবেশের ব্যবস্থা করেন | সেখানে নেতাজির বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয় নারীরা | লক্ষ্মীর ভাষায়, ‘he was cheered and applauded and women, young and old, and even those with babies in arms offered to join the regiment immediately. As the days and weeks passed the number of volunteers steadily increased.’ ১৯৪৩-এর ২২ অক্টোবর সিঙ্গাপুর ক্যাম্পের উদ্বোধন করলেন নেতাজি | ১৯৪৩ সালের ২৩ শে অক্টোবর প্রাথমিকভাবে এই মহিলাদের নিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প শুরু হয় সিঙ্গাপুরে । ঝাঁসি রেজিমেন্টের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে নেতাজি বলেন : ‘Today while we are facing the gravest hour in our history I have confidence that Indian womanhood will not fail to rise to the occasion. If for the independence of Jhansi India produced a Laxmi Bai, today for the independence of whole India, India shall produce thousands of Ranis of Jhansi,’ (22nd October, 1943). নারী সৈনিকদের কাছে তাঁর অকপট বক্তব্য, ‘Today I can only offer you strenous physical work, no comfort, the barest of food and probably death, but do not fear – the fight for freedom will continue with your efforts.’ বাহিনীর বিভিন্ন পদ তৈরী হয়েছিল শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুসারে । দুর্গম জায়গায় পাহাড় ফাটানো,রুট মার্চ,অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং হত । বার্মার জঙ্গলে চলত অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ । সন্ধ্যায় বসত ইতিহাস পাঠের আসর – ভারতবর্ষের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা পড়তেন রিজিয়া সুলতান, চাঁদবিবি, ঝাঁসির রাণী, রানী ভবানীর উপাখ্যান | ১৯৪৪ সালের ২৩ শে মার্চ বাহিনীর প্রায় ৫০০ জনের বেশী সিঙ্গাপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে রুট মার্চ করে। এর মধ্যে আবার ২০০ জন নার্সিং এর কাজে যুক্ত হয় । মেয়েদের থাকা-খাওয়া, ইউনিফর্ম, প্রশিক্ষণ পুরো কাজের ব্যবহার বহন করতেন প্রবাসী ভারতীয়রা | ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আইএনএর দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনানায়কেরা | নেতাজির নির্দেশ ছিল, ‘the training given to the Ranis must be similar in every way to the other infantry units.’

আরো পড়ুন:  "আমরা মরতেই চেয়েছিলাম,দেশের লোক জেগে উঠবে বলে" বুড়িবালামের যুদ্ধের সময় সতীর্থদের বলেছিলেন বাঘাযতীন

নীরা আর্য ১৯০২ সালের ৫ মার্চ ভারতের তৎকালীন ইউনাইটেড প্রদেশের অধুনা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাগপত জেলার খেকড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন | তাঁর পিতা শেঠ ছজুমল ছিলেন সে সময়ের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর পিতার ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই কলকাতাতে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। নীরা আর্য হিন্দি, ইংরেজি, বাংলার পাশাপাশি আরও অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে বিবাহ করেন।স্বামীর সঙ্গে মতাদর্শগত কোনও মিল ছিল না নীরার।নীরা আর্য নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টে যোগ দেন। নীরা আর্যের স্বামী শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ইংরেজ-ভক্ত অফিসার। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর পিছনে নজরদারির দায়িত্ব দিয়েছিল। সুযোগ পেলে নেতাজিকে হত্যা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু শ্রীকান্তর চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন তাঁর স্ত্রী।নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে নীরা আর্য নিজের স্বামীকে হত্যা করেন।নীরা আর্যের ভাই বসন্ত কুমারও আজাদ হিন্দ ফৌজে ছিলেন।

আরো পড়ুন:  ২০০ টাকার যন্ত্রপাতিও লাগেনি গবেষণায়,সি ভি রমনের নোবেল জয়ের সাথে জড়িয়ে আছে কলকাতা

পবিত্র মোহন রায় আজাদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহিলা এবং পুরুষ উভয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর ছিলেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজেই নীরাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন।এই কাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন মনবতী আর্য,সরস্বতী রাজামণি,দুর্গা মল্লা গোর্খা এবং যুবক ড্যানিয়েল কালে | নীরা আর্যের আত্মজীবনীতে বর্ণিত গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কিত এক সময়ের একটি অংশ নিম্নরূপ –

“আমার সাথে আরও একটি মেয়ে ছিল, নাম সরস্বতী রাজামণি। সে আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল এবং তাঁর জন্ম বার্মায়। সে এবং আমি একসময় ইংরেজ অফিসারদের গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমরা মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরি এবং ব্রিটিশ অফিসারদের বাড়ি এবং সামরিক শিবিরে কাজ শুরু করি। আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্য এভাবে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছি। আমাদের কাজটি ছিল কান খোলা রাখা,সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলি নিয়ে আলোচনা করা, তারপরে নেতাজীর কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। কখনও কখনও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিও বহন করতে হত। যখন মেয়েদের গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল,আমাদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে,ধরা পড়লে নিজেরাই নিজেদের গুলি করতে। একটি মেয়ে তা করতে মিস করেছে এবং তাকে ইংরেজরা জীবন্ত গ্রেপ্তার করেছিল। এতে আমাদের সংগঠনের সমূহ বিপদ ও ক্ষতি হবে বুঝে আমি এবং রাজামণি স্থির করেছিলাম যে, আমরা আমাদের সঙ্গীকে যে কোনভাবে মুক্ত করব। আমরা নপুংসক নর্তকীর পোশাক পরে যেখানে আমাদের সঙ্গী দুর্গাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখানে পৌঁছেছিলাম। আমরা অফিসারদের মাদক খাওয়ালাম এবং আমাদের সঙ্গীকে সাথে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার পথে পাহারায় থাকা এক সেনা গুলি চালায় এবং তাতে রাজামণির ডান পা গুলি বিদ্ধ হয়। কিন্তু তা স্বত্বেও সে কোনক্রমে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এদিকে ধড়পাকড়ের জন্য অনুসন্ধান শুরু হলে আমি এবং দুর্গা একটা লম্বা গাছের উপরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। অনুসন্ধান নীচে অব্যাহত ছিল, যার কারণে আমাদের তিন দিন ধরে গাছের উপরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকতে হয়েছিল। তিন দিন পরে আমরা সাহস করে সুকৌশলে সঙ্গীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘাঁটিতে ফিরে আসি। রাজামণির সাহসিকতায় নেতাজি খুশী হয়ে তাকে আইএনএর রানি ঝাঁসি ব্রিগেডে লেফটেন্যান্ট এবং আমাকে অধিনায়ক করেছিলেন।”

আরো পড়ুন:  নয় দশক পরেও নট আউট হাওড়া স্টেশনের "বড় ঘড়ি"

আজাদ হিন্দ ফৌজের সমস্ত বন্দী সৈন্যকে দিল্লির লাল কেল্লায় বিচারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নীরাকে স্বামী হত্যার কারণে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। জেলে বন্দীদশায় তাঁকে অকথ্য শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল নীরা আর্য- কে | স্বাধীনতার পরে, ফুল বিক্রি করে জীবনযাপন করেছিলেন | তবে কোনও সরকারী সহায়তা বা পেনশন গ্রহণ করেননি নীরা আর্য।নীরা স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আত্মজীবনীও লিখেছেন। উর্দু লেখক ফারহানা তাজ’কে তিনি তাঁর জীবনের অনেক ঘটনা শুনিয়েছিলেন |

শেষ জীবনে হায়দরাবাদের ফালকনুমার একটি কুঁড়ে ঘরে বাস করতেন নীরা আর্য। সরকারি জমিতে থাকার কারণে তার কুঁড়েঘরটিও শেষ মুহুর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বার্ধক্যজনিত অবস্থায়, চারিমিনারের নিকটে ওসমানিয়া হাসপাতালে ১৯৯৮ সালের ২৬ শে জুলাই, রবিবার তিনি দরিদ্র, অসহায়, নিঃস্ব অবস্থায় প্রয়াত হন। স্থানীয় মানুষেরা তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে |

কেউ মনে রাখেনি | কেউ মনে রাখে না |

তথ্য : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।