মনোহরার স্বাদে মুগ্ধ ছিলেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়

মনোহরার স্বাদে মুগ্ধ ছিলেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়

মিষ্টি নিয়ে ভালোবাসা, আবেগ শুধুমাত্র বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও জাতির এত গৌরব অথবা আবেগ যে নেই জোরগলায় বলা যায়৷ মিষ্টি যে শুধু মিষ্টি নয় বরং বাঙালির জীবনযাপনের সঙ্গে জুড়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।বাঙালির ভুরিভোজে মিষ্টির ভূমিকার কথা আমরা সবাই জানি৷নববর্ষ বলুন অথবা পয়লা বৈশাখ, বিজয়া দশমী কিংবা ক্রিসমাস আম বাঙালির রসনাতৃপ্তির অঙ্গ মিষ্টি৷

মনোহরা | এই মিষ্টি অবশ্য না পুরোপুরি রসগোল্লার গোত্রের, না সন্দেশ গোত্রীয়৷অমৃতসম এই মিষ্টি যারা খেয়েছেন তারা জানেন এর স্বাদ৷ দুধ-চাঁচি ক্ষীর আর ছানার সঙ্গে এলাচ, জায়ফল আর জয়িত্রীর মিশ্রণে তৈরি ‘পুর’ চিনির মোটা রসের আস্তরণে ঢেকে রাখার অননুকরণীয় শিল্পের নাম মনোহরা৷ পরাধীন ভারতে ব্রিটিশদের পছন্দের মিষ্টি ছিল মনোহরা। বিদ্যাসাগর মহাশয় থেকে ছবি বিশ্বাস, উত্তম কুমার, ছায়া দেবী সবাই এই মিষ্টির ভক্ত ছিলেন।বাংলার মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে যারা চর্চা করেন মনোহরার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে তাদের মধ্যেই আছে অনেক মতভেদ।

হুগলী জেলার জনাই নাকি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা মনোহরার আদি নিবাস ! সেই নিয়ে আছে নানা মত৷ তবে সেকালে কালাপানি পাড় হয়ে মনোহরা ছড়িয়ে পড়ে ছিল সাহেবদের দেশেও। চাঁচি ক্ষীর আর ছানার সঙ্গে এলাচ, জায়ফল আর জয়িত্রীর মিশ্রণে তৈরি ‘পুর’ চিনির মোটা রসের আস্তরণে ঢেকে রাখার অননুকরণীয় শিল্পের অনন্য মিষ্টি মনোহরা,একই পদ্ধতিতে তৈরি হলেও ওপার বাংলায় এর নাম প্রাণহরা ।

আরো পড়ুন:  প্রবাদপ্রতিম গণিতজ্ঞ অয়লারের পৌনে দুশতকের পুরোনো তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছিলেন রাজচন্দ্র বসু

মোহিতলাল মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের রসিকতা করে বলতেন, “তোরা মিষ্টির নাম রাখিস প্রাণহরা, আর আমরা নাম রাখি মনোহরা”৷কোন বাংলার মিষ্টি সেরা সেই নিয়ে তর্কে মাতে পদ্মা,মেঘনা,ভাগীরথীর পাড়ের বাঙালি৷অনেকে বলেন ওপারের প্রানহরা প্রাণহরণ করলে, জনাইয়ের মনোহরা কিন্তু মনহরণ করে৷ বাংলা টপ্পার জনক রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুবাবু শহরের বাবুগিরির গানে লিখেছেন “খাওয়াইব গণ্ডা গণ্ডা মনোহরা দেদো মণ্ডা। খেয়ে খেয়ে যাবে প্রাণটা বলবে বলিহারি যাই।”বাইরে চিনির কড়া আস্তরণ কিন্তু ভেতরে চাঁচি ক্ষীর আর নরম ছানার মিশ্রন মুখে দিলেই অপূর্ব স্বাদ৷ বাংলার আশ্চর্য মিষ্টি মনোহরা৷

হুগলির জনাই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার মধ্যে মনোহরার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মিষ্টিপ্রেমী বাঙালির হৃদয় জয়ী মনোহরার আদি নিবাস নিয়ে রয়েছে নানা মত৷অন্তত দুশো বছর আগে জনাইয়ে মনোহরা মিষ্টি প্রথম তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন বেশিরভাগ ঐতিহাসিক৷অনেকে বলেন পরাধীন ভারতে এক সাহেব কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন জনাইয়ে৷সেই সময় ছিল না কোনো রেফ্রিজারেটর,যেখানে মিষ্টি কিছুদিন রেখে দিলেও নষ্ট হবে না৷৷ ভীমচন্দ্র নাগের বংশধরদের কয়েকজন নাকি জনাইয়ের ষষ্ঠীতলায় বসবাস করতেন! কলকাতা থেকে বেড়াতে আসা সাহেব ময়রাদের হুকুম করলেন এমন এক মিষ্টি তৈরি করে দিতে হবে পাঁচ দিনেও নষ্ট হবে না৷ময়রারা কিছুটা বুদ্ধি করেই ছানার আসল মিষ্টির উপর চিনির আস্তরণ দিয়ে দিলেন,যেন ব্যাক্টেরিয়ার উৎপাত না হয়,কয়েকটা দিন রেখে দিলেও খাওয়া যাবে মিষ্টি৷ অনেকে বলেন মনোহরার আবিষ্কারক আর কেউ নন,তিনি ভীমচন্দ্র নাগের বাবা পরাণচন্দ্র নাগ। জনাইয়ের ললিত ময়রা ১৮৬০-এর দশকে মনোহরা উদ্ভাবন করেছেন বলেও অনেকে বিশ্বাস করেন৷এরপরেও মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা অনেক মানুষের অভিমত জনাইয়ের ময়রারা সন্দেশ সংরক্ষণ করতে গিয়ে ভুল করে চিনির রসে ডুবিয়ে দেন,আর সেখান থেকে সৃষ্টি অমৃতসম মনোহরার৷ একটি মতানুসারে মুর্শিদাবাদের নবাবদের খাস ময়রা এটি অষ্টাদশ শতকে আবিষ্কার করেন। জনৈক ময়রা বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার দহগ্রামের নিকট কিরীটকোনা গ্রামের কিরীটেশ্বরী মন্দিরের নিকট বাস করতেন। সেখানেই তিনি প্রথম মনোহরা প্রস্তুত করেন৷অর্থাৎ একেবারে সঠিক ভাবে বলা মুশকিল মনোহরা নামক মন জয় করা মিষ্টির সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে৷জনাইয়ের মনোহরা একসময় কলকাতার রসগোল্লা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা ও বর্ধমানের সীতাভোগের মত সমান জনপ্রিয় ছিল। মুখে মুখে এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায় এবং ক্রমে সারা ভারতে। ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ অভিজাতরা অতিথি আপ্যায়নের জন্য জনাইয়ের মনোহরা আনাতেন।জনাই বা বেলডাঙার মনোহরা অত্যন্ত বিখ্যাত মিষ্টি অনেকেই জানেন৷কিন্তু সেই মনোহরার নেই আধুনিক বিপণন ও প্রচার৷ঐতিহ্যবাহী মনোহরার কারিগররা এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন নানা জায়গায়,বানাচ্ছেন অন্য মিষ্টি৷ক্রমশ কমছে এই অমৃতসম মিষ্টির কারিগরদের সংখ্যা৷সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মেলায় মনোহরার প্রচার হলে,এবং সরকারি ও বেসরকারি স্তরে মনোহরার বিপণনের ব্যবস্থা হলে হয়ত মিষ্টিপ্রেমী মানুষ সুযোগ পেতেন যখন খুশী মনোহরা মুখে ভরে তার অমৃতসম স্বাদ আস্বাদন করার৷

আরো পড়ুন:  আইআইটি থেকে পাস করে চাকরি না করে ব্যবসা,শিল্পপতি অশোক মুখার্জী অনুপ্রেরণার আরেক নাম

-অরুনাভ সেন

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।