শেক্সপিয়ার চেষ্টা করলেই নিউটন হতে পারে,জটিল অঙ্কের সমাধান করে দেখিয়ে দিলেন মধুসূদন

শেক্সপিয়ার চেষ্টা করলেই নিউটন হতে পারে,জটিল অঙ্কের সমাধান করে দেখিয়ে দিলেন মধুসূদন

মধুসূদন দত্ত। বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও বরাবর তাঁর ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ছিল গভীর মনোযোগ ও অপার আগ্রহ।তিনি মনে করতেন প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে ইংরেজি সাহিত্য ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সেই কারণেই নিজেকে সেই ভাষায় পারদর্শী করে তুললেন।

ইংরেজি ভাষার প্রতি তাঁর অধ্যাবসায়ের একটি উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মধুসূদন তখন কলেজে পড়েন, স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আয়োজিত হতে চলেছিল কলেজে। যা হতে চলেছে ইংরেজি ভাষায়। অন্যান্যরা সকলে ভাষার কারণে একপ্রকার মনস্থির করে নেয় যে তারা এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। কিন্তু মধুসূদনের বন্ধু ভূদেব মুখোপাধ্যায় মধুসূদনকে প্রায় জোর করেই এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখানো করান।এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর জন্য যথাক্রমে সোনা এবং রুপোর মেডেল | যথাসময়ে প্রতিযোগিতার দিন আগত, দেখতে দেখতে তা শেষ হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ফলাফল মিলল। আর তাতে দেখা গেল প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন মধুসূদন দত্ত। বন্ধু ভূদেবের তাঁর প্রতি ইংরেজি সাহিত্যের দক্ষতা নিয়ে অগাধ বিশ্বাস তিনি ক্ষুণ্ন হতে দেননি।

শুধু ইংরেজি সাহিত্যে প্রবন্ধ লেখাই নয়, মধুসূদনের মেধার পরিচয় মেলে আরো বহু ঘটনায়। তিনি যে শুধু ইংরেজি সাহিত্যকেই ভালোবেসে ছিলেন বা শুধু যে তাতেই নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছেন তা নয়, যেকোন বিষয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রপ্ত করে তাতে পারদর্শিতা দেখানোর ক্ষমতা রাখতেন তিনি।মধুসূদন কোনদিনই অঙ্কে খুব একটা ভালো ছিলেন না। বা বলা ভাল অঙ্ক বিষয়টিকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব কোনোকালেই দেননি | দেবেনই বা কি করে! তিনি তো তখন শেক্সপিয়ারের লেখনীর জাদুতে বুঁদ। সারাক্ষণ সেই মায়াজালের স্বপ্নই বুনে চলেছেন।

আরো পড়ুন:  পাঠক মহলে ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়,লেখক বিমল মিত্রের নামে উপন্যাস লিখতেন "নকল" বিমল মিত্ররা

মধু কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তখন হিন্দু কলেজে অধ্যয়নরত। এখন যা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। তখন তাঁর সহপাঠী রাজনারায়ণ বসু, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, গৌরদাস বসাক,ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।যদিও সকলের মধ্যে ভূদেবের সঙ্গেই মধু কবির বেশি সখ্যতা ছিল।বন্ধু মধুসূদনের অঙ্কের প্রতি উদাসীনভাব মোটেই ভালো লাগত না ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের। এতো মেধাবী হয়ে তাঁর বন্ধু যদি ওই একটি বিষয়ের কারণে পিছিয়ে পড়ে সেই চিন্তা ভূদেবকে বড় পীড়া দিত। বারবার তিনি বন্ধুকে বুঝিয়েছেন কিন্তু তাও কোনো ফল না পেয়ে একদিন তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করে বলে ফেলেন- “নিউটন চাইলেই শেক্সপিয়ার হতে পারবেন কিন্তু শেক্সপিয়ার চাইলেও কখনোই নিউটন হতে পারবেন না”।
নিজের এতো কাছের বন্ধুর থেকে এমন কড়া কথা বড়ো আঘাত দিয়েছিল কবির মনে।তিনি সেদিন কোনো উত্তর দেননি। তবে মনে মনে এ কথার জবাবের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন।

আরো পড়ুন:  বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান-নির্ভর সাহিত্যের সৃষ্টিকর্তা ছিলেন বিজ্ঞান-সাধক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

রোজকার মতোই চলতে লাগল জীবনধারা,সেই কলেজে যাওয়া,শেক্সপিয়ারের রচনায় বুঁদ হয়ে থাকা কোনো কিছুরই বদল ঘটল না। তবে একান্তে চালিয়ে যেতে লাগলেন অঙ্কের সমস্ত জটিল সমস্যার চর্চা। যা কাউকে টেরও পেতে দিলেন না।এভাবে বেশ কয়েক মাস কাটল। কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক রিজ সাহেব একদিন ক্লাসে এসে একটি কঠিন অঙ্ক বোর্ডে লিখে তা ছাত্রদের সমাধান করতে বললেন। সকলেই চুপ করে বসে রইল,কারোর খাতাতেই পেন্সিল সরে না। তারই মধ্যে ভূদেব দেখলেন অঙ্কে উদাসীন তাঁর বন্ধুটি গভীর মনোযোগ সহকারে খাতায় কি সব যেন লিখছে। একটু উঁকি মারতে সে বুঝতে পারল বোর্ডে লেখা অধ্যাপকের অঙ্কটা প্রায় শেষ করে ফেলেছে মধুসূদন। আনন্দে চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করে উঠল ভূদেবের। সকলের মাঝে সগর্বে দাঁড়িয়ে সে অধ্যাপককে জানালো অঙ্কটি মধুসূদন সম্পূর্ণ করে ফেলেছে।
স্বাভাবিকভাবেই একটু অবাক হয়ে অধ্যাপক রিজ সাহেব মধুসূদনকে বোর্ডে অঙ্কটি সকলের সামনে করে দেখাতে বললেন।অত্যন্ত সাবলীল ভাবে, দ্রুততার সঙ্গে মধুকবি বোর্ডে নির্ভুল একটি গণনা ফুটিয়ে তুললেন। ক্লাসের সকলে যেন আকাশ থেকে পড়লো, সারাক্ষণ ইংরেজি সাহিত্যের মধ্যে ডুবে থাকা ছেলেটি কোথা থেকে পেল এই অঙ্কের সমাধান।

আরো পড়ুন:  প্ল্যানচেট করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,সাড়া দিলেন "প্রয়াত" সুকুমার রায়

সকলের হতবাক চাহনি উপেক্ষা করে মধুসূদন ফিরে এসেছিলেন তার বন্ধু ভূদেবের কাছে, এবং খুব হালকাভাবে তাকে বলেছিলেন “শেক্সপিয়ার যে চেষ্টা করলেই নিউটন হতে পারে, প্রমাণ পেলে তো?”এমন উত্তর পেয়ে রাগ তো দূরের ব্যাপার বন্ধুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়।সেদিন মধুসূদন আরও বলেছিলেন, তিনি অঙ্ক পারেন না তা নয়, ভালোবাসেন না তাই করেন না। সেদিনের সেই সমাধান দিয়েই তিনি অঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টেনে ছিলেন।

এতো বিপুল মেধা আর অধ্যাবসায় কবির পাথেয়। একে সম্বল করেই কবি রচনা করেছেন নিজের সকল অনন্য সৃষ্টিদের।ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায় নানা দেশ ঘুরে রপ্ত করেছেন তার খুঁটিনাটি,যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে তাঁকে দিয়েছে এক আলাদা স্থান। তাই তো তিনি বাংলা সাহিত্যের চেনা গদ পাল্টে তাকে এক নতুন পথের দিশা দেখিয়েছেন।

– লিলি চক্রবর্তী

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।