স্কুলে খেলতে গিয়ে কোমরে চোট পেয়ে বাড়ি চলে এলাম,স্কুল শেষ হতেই সাঁতরাবাবু বাড়ি এলেন দেখতে

স্কুলে খেলতে গিয়ে কোমরে চোট পেয়ে বাড়ি চলে এলাম,স্কুল শেষ হতেই সাঁতরাবাবু বাড়ি এলেন দেখতে

কালের স্বাভাবিক নিয়মেই সাঁতরা বাবু চলে গেলেন। চলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না, বরং অদ্ভুত এই ‘থেকে’ যাওয়াটা। কি ভীষণভাবে থেকে গেছেন স্যার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী, অগণিত গুণমুগ্ধের মনে। একজন সাধারণ স্কুল-মাস্টার যে কী বিরাটরকম অসাধারণ হতে পারেন, সেটা সাঁতরা বাবুকে না দেখলে সত্যি বোঝা যায় না।

বেশ কয়েকবছর আগের কথা। HS এর ইংরাজি সিলেবাসে তখন ‘Gulliver’s Travels’ রয়েছে। স্যার আমাকে দায়িত্ব দিলেন ওই বইয়ের একটা guide – বই লেখার কিছুটা করার। করলাম সময় মতন । কাজ হয়ে গেলে একটা খামে পুরে কিছু টাকা দিলেন। বাড়ি এসে খাম খুলে মনে হল- পারিশ্রমিকটা স্যার বড্ড কম দিলেন | কিন্তু বলতে পারলাম না মুখ ফুটে। তিন চার দিন পর স্যার ফোন করে তাঁর অফিসে আবার ডাকলেন। গেলাম। খামে করে আবার কিছু টাকা। বুঝলাম- জীবতত্ত্বের শিক্ষক হলেও মনস্ততত্ত্বের জ্ঞানও কিছু কম ছিল না মানুষটার ।

আরো পড়ুন:  মহিষাসুর তাদের পূর্বপুরুষ,তাই দুর্গাপুজোয় অংশ নেয় না অসুর সম্প্রদায়

ছেলেবেলায় যখন মামার বাড়ি, মাসির বাড়ি বেড়াতে যেতাম কেউ জিজ্ঞেস করলে বুক ফুলিয়ে বলতাম- আমি মধ্যমগ্রাম হাই স্কুলে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসত সুব্রত কাপের কথা। আর হ্যাঁ, অবধারিত ভাবেই উঠে আসত সাঁতরা বাবুর কথা। সমবয়সী অচেনা ছেলে-মেয়েরা এসে জিজ্ঞেস করত-‘তুমি দুলাল সাঁতরা কে দেখেছ? কেমন উনি?…’। একজন স্কুল শিক্ষক তাঁর বইয়ের মাধ্যমে এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, এটা ভাবলে সেদিন এক ছাত্র হিসেবে যেমন গর্ব বোধ করতাম, আজ একজন শিক্ষক হিসেবেও ঠিক সমান গর্বিত হই।

একজন শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক যে কত মধুর এবং বন্ধুভাবাপন্ন হতে পারে(মর্যাদার এতটুকু হানি না ঘটিয়েও), দুলালবাবুকে না দেখলে সেটা জানতেই পারতাম না।মাঝে –মাঝে ছাত্রদের তিনি ‘আঁশ ধোয়া জল’(ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায়) দিতেন, তাতে স্যারসুলভ গাম্ভীর্যের হানি ঘটত কিনা জানিনা,তবে বইয়ের পাতা থেকে শব্দগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত; না বুঝে মুখস্থ করার পার্টটা ঘুচে যেত চিরকালের জন্য। আজ শিক্ষকতার পেশায় প্রায় ১৫ বছর নিযুক্ত থাকতে থাকতে বুঝি, এটাই একজন শিক্ষকের কাছে সব থেকে challenging – পাঠ্য বিষয়কে মনোগ্রাহী করে ছাত্রের কাছে তুলে ধরা ।

আরো পড়ুন:  ছবি দেখে সত্যজিৎ রায় বললেন,ক্যামেরা ধরার অ্যাঙ্গেল দেখেই বোঝা যায় ও ভাল ছবি তোলে

আজ স্যারের চলে যাওয়ার খবরটা পেতেই নাকে ভেসে এলো ‘রসে বসে’-র চাটনি দিয়ে গরম সিঙ্গারার গন্ধটা। মাঝে মাঝেই আমাদের কয়েকজনকে টিফিন টাইমে নিয়ে গিয়ে ওইটা খাওয়াতেন স্যার। পরেও বহুবার খেয়েছি, কিন্তু কি জানি, সেই স্বাদটা যেন পাইনি আর। আসলে একজন শিক্ষকের ভালোবাসা আর স্নেহের গন্ধটা সারাজীবন এভাবেই সঙ্গে থেকে যায় আমাদের।

আরো পড়ুন:  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি , বাঙালির কাছে জনপ্রিয়তায় আজও অপ্রতিরোধ্য "পকেটবন্ধু" বাপুজি কেক

স্কুলে খেলতে গিয়ে কোমরে চোট পেয়ে বাড়ি চলে এলাম ক্লাস এইটে থাকতে। স্কুল শেষ হতেই স্যার বাড়ি চলে এলেন। স্যারের সুগার ছিল, তাই মা শসা কেটে দিলেন, সেটাই পরম তৃপ্তিতে খেলেন।

ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ভাল-মন্দ খোঁজ নেওয়ার মতন শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। তাই, আজ দূর থেকেই স্যারের কাছে চেয়ে নিলাম শেষ আশীর্বাদ-দেখবেন স্যার, আপনার বই পড়ে, নোটস পড়ে যেমন ছাত্র হিসেবে উৎরে গেছি, তেমনই শিক্ষক হিসেবেও যেন আপনার স্নেহ-ভালোবাসার কিছুটা পরশ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে যেন উৎরে যেতে পারি; অলক্ষে থেকে আপনি যেন সেই পরিচিত হাসিটা হেসে বলতে পারেন- ‘ বাহ, সুমন, তুই তো আমার মুখ উজ্জ্বল করেছিস’।

লেখক : সুমন ভট্টাচার্য
(মধ্যমগ্রাম এপিসি স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।