রেসিপি লুকাতে রাতে দরজা বন্ধ করে সরভাজা,সরপুরিয়া বানাতেন অধরচন্দ্র দাস

রেসিপি লুকাতে রাতে দরজা বন্ধ করে সরভাজা,সরপুরিয়া বানাতেন অধরচন্দ্র দাস

কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগর নাম শুনলেই প্রথমেই মাথায় আসে মাটির পুতুল, জগদ্ধাত্রী পুজো, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ী আর তার সাথে সাথে সরভাজা ও সরপুরিয়ার কথাও ছড়িয়ে রয়েছে। আর এই সমস্ত কথা কে জানে না বলুন তো, কমবেশি সকলেই জানে।এই মিষ্টি যুগলের ইতিহাস ৫০০ বছরের পুরনো। এই সরভাজা, সরপুরিয়া মিষ্টি জুটিকে কেন্দ্র করে কত রসালো গল্প উঠে এসেছে কবি-সাহিত্যিক দের কলমে। কত ঐতিহ্য বয়ে চলেছে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের এই সরভাজা, সরপুরিয়া।

তার আগে আমাদের নদিয়ার যে কৃষ্ণনগর সম্পর্কে কিছু জানতে হবে।কি করে তার নাম হল, আগে কারা বাস করত, জানি অনেকেই জানেন তাও কিছুটা বলার চেষ্টা করলাম – নদিয়া রাজের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদারের পৌত্র রাজা রাঘব রায় নবদ্বীপ-শান্তিপুর-কামালপুর-বিল্বপুষ্করিণী-বিল্ব গ্রাম- বহিরগাছির পন্ডিত সমাজের সান্নিধ্য লাভের জন্য, তাঁর জমিদারি প্রায় মাঝামাঝি স্থানে জলঙ্গী তীরবর্তী রেউই গ্রামে, চতুর্দিকে পরিখা বেষ্টন করে এ রাজধানী স্থাপন করেন। রাঘবের পুত্র রাজা রুদ্র রায় রেউই এর পরিবর্তে কৃষ্ণনগর নাম রাখেন। কারণ তখন নাকি এখানে বহু কৃষ্ণ উপাসক বাস করতেন | রাজবাড়ির মুসলিম স্থাপত্যানুগ চারমিনার বিশিষ্ট তোরণ পথটিও বিচিত্র ধরনের। সেটি পার হয়ে সামনেই একটি বড় কামান দেখা যায়। তা পাদপীঠের লিপি :“ Plassey Gun Presented By Lord Clive, 1757.” জনশ্রুতি বলে, পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত এসব কামান লর্ড ক্লাইভের কাছ থেকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র উপহার পেয়েছিলেন। এখানে ভবানন্দ মজুমদারকে জাহাঙ্গীর প্রদত্ত দুটি বিরাট ধাতব ডঙ্কাও পড়ে আছে। আগে এই ডঙ্কা বাজিয়ে নাকি রাজাদেশ জারি করা হত। কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে নির্মিত একটি কামান মুর্শিদাবাদের নবাব প্রাসাদে আছে। কামানের গায়ে সংস্কৃত অক্ষরে লিখিত আছে- মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে কিশোরদাস কর্মকার এই কামান নির্মাণ করেছেন এবং অক্ষর খোদিত করেছেন রূপরাম চট্টোপাধ্যায়।কৃষ্ণনগরে শতাধিক বছরের প্রাচীন কয়েকটি মসজিদ আছে। তাছাড়া, কবি, নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও বিজ্ঞানী শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের বাস্তুভিটা, রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত ‘ রানীকুঠি ‘( প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস ) এবং অন্যান্য প্রাচীন ইমারতের মধ্যে কৃষ্ণনগর কলেজ ও ( ১৮৪৬ খ্রী: স্থাপিত) উল্লেখযোগ্য।

আরো পড়ুন:  ব্যাঘ্রপাদ মুনির স্মৃতি থেকে বাঘকে হরি নামে বশীভূত করার ঘটনা,বাঘনাপাড়াকে নিয়ে রয়েছে বহু ইতিহাস

কৃষ্ণনগরে ঘুর্ণী পল্লীর মৃৎশিল্প পৃথিবী বিখ্যাত।সেখানকার কয়েকজন খ্যাত নামা মৃৎশিল্পীর বংশধরদের কাছে শতাধিক বৎসরের প্রাচীন প্রশংসা পত্র ও পদকাদি আছে। নদিয়া জেলার নানা স্থানের মিষ্টান্ন বিখ্যাত।মিষ্টান্ন আমাদের সকলের প্রিয়।জানা যায়, একসময় নাকি এই কৃষ্ণনগর ও সন্নিহিত এলাকায় গোপালন ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের কেন্দ্র ছিল।শহরের একাংশের নাম গোয়াড়ী,গো বাড়ির বিবর্তিত রূপ।বাংলার মিষ্টান্ন প্রধানত গো দুগ্ধজাত দ্রব্য।মূলত মিষ্টান্নের উপাদান হয় দুগ্ধ,সরবরাহ, ক্ষীর, চিনি ও খেজুর গুড় | নদিয়ায় এগুলি সহজলভ্য ছিল।ফলে নদিয়ায় মিষ্টান্ন শিল্প গড়ে ওঠে।

আরো পড়ুন:  প্রথম ভারতীয় হিসেবে লন্ডনের ‘রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস' এর ‘ফেলো’ নির্বাচিত হয়েছিলেন অসিতকুমার হালদার,বাঙালি মনে রাখেনি

কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, সরভাজা ও সরতক্তি বিখ্যাত। ছানা ও ক্ষীরের বাটা মাখা সন্দেশের ( হলুদ রঙের ) উপর সর যুক্ত নরম মিষ্টির নাম সরপুরিয়া, এক ধরনের সন্দেশ বলা যেতে পারে। চারকোনা মোটা সর চিনির রসে ডুবিয়ে সরভাজা এবং শুকিয়ে সরতক্তি তৈরি করা হয়। আবার শীতকালে কৃষ্ণনগরের নতুন খেজুর গুড়ের সন্দেশ দেদোমন্ডা ও অন্যসময় বাদামের বরফি সন্দেশ বিখ্যাত। এই দুই মিষ্টির ইতিহাস অন্তত সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরোনো।কারণ অনেকে বলেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও নাকি এই সরপুরিয়া খেয়েছেন।নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব ও জানিয়েছেন, এই দুই মিষ্টি একান্তভাবেই কৃষ্ণনগরেরই মিষ্টি।

১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সবার উপরে চলচ্চিত্রে ছবি বিশ্বাসের বিখ্যাত সংলাপ ‘ আমার কুড়িটা বছর ফিরিয়ে দাও ‘- এর সংলাপ ও দৃশ্য অধরচন্দ্র দাসের মিষ্টির দোকানে দৃশ্যায়িত হয়েছিল । রাজীব গান্ধী ও মহানায়ক উত্তম কুমার কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, সরভাজায় মুগ্ধ ছিলেন | এ শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন মিষ্টির দোকান। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল অধরচন্দ্র দাসের মিষ্টির দোকান। একসময় বাংলার রূপকার ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের খাবার হিসাবে পাঠানো হত কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, সরভাজা।

আরো পড়ুন:  "আমি চললাম,তোমরা কিন্তু থেমো না"এই বলে অনন্তলোকে পাড়ি দিলেন জালালাবাদের যুদ্ধের প্রথম শহীদ ১৪ বছরের টেগরা বল

সরপুরিয়ার ঐতিহাসিকতা নিয়েও মতভেদ আছে। প্রচলিত মত অনুযায়ী, সরপুরিয়ার সৃষ্টিকর্তা কৃষ্ণনগরের অধরচন্দ্র দাস।আবার মতান্তরে সরপুরিয়ার সৃষ্টিকর্তা তাঁরই পিতা সুর্য কুমার দাস। কথিত আছে, অধরচন্দ্র দাস রাতে দরজা বন্ধ করে ছানা, ক্ষীর ও সরকারি দিয়ে তৈরি করতেন সরপুরিয়া ও তার অপর আবিষ্কার সরভাজা। ১৯০২ সালে নেদেরপাড়ায় অর্থাৎ বর্তমান অনন্ত হরি মিত্র রোডে প্রতিষ্ঠা করেন মিষ্টির দোকান।

এছাড়া সরভাজা ও সরপুরিয়ার সাথে আরও একটি ইতিহাস আছে।কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে ভালো মিষ্টি আনতে বলেন রাজা। সেই মিষ্টি ব্যবসায়ী একরাতেই বানিয়ে ফেলেন সরপুরিয়া বা সরভাজা। রাজবাড়ির প্রশংসা পায় এই মিষ্টি। সেই থেকেই মানুষের মুখে মুখে ফেরে কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, সরভাজার নাম।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘চৈতন্যচরিতামৃত‘ তে উল্লেখ আছে, যে চৈতন্যদেব যে সব মিষ্টান্ন খেতে ভালোবাসতেন তার মধ্যে অন্যতম সরপুরিয়া। আবার অদ্বৈত আচার্য নিজেই চৈতন্য দেবকে সরপুরিয়া পাঠাতেন।

-রিয়া দাস (রাই)

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।