বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাভারত অনুবাদে কাশীরাম দাস শ্রেষ্ঠ। কাশীরাম দাস বা কাশীরাম দেব মধ্যযুগীয় সপ্তদশ শতাব্দীর বাঙালি কবি। তিনি সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত বাংলা পদ্যে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অনুদিত গ্ৰন্থ ‘ ভারত পাঁচালী ‘ বা ‘কাশীরাম সংহিতা ‘ যা আজ বাংলায় ‘মহাভারত'( কাশীদাসী মহাভারত) নামে পরিচিত। তাঁর অনুদিত মহাভারতই বাংলা ভাষায় সবচেয়ে জনপ্রিয়।

খ্রীষ্টিয় সপ্তদশ শতকে বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে ইন্দ্রাণী পরগণার অন্তর্গত সিঙ্গি গ্রামে কাশীরাম বর্তমানে ছিলেন। মহাভারতের আদিপর্বে আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে কাশীরাম দাস বলেছেন :–

“কায়স্থ কুলেতে জন্ম বাস সিঙ্গি গ্রাম।
প্রিয়ঙ্কর দাস সুত সুধাকর নাম।।
তস্য সুত কমলাকান্ত কৃষ্ণদাস পিতা।
কৃষ্ণদাসানুজ গদাধর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।”

মহাভারত অনুবাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কাশীরাম দাস পথিকৃৎ নন। কারণ এর আগে আমরা পেয়েছি কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, গঙ্গা দাস সেন, নিত্যানন্দ ঘোষ প্রমুখ কয়েকজনকে। ১৮০২ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে উইলিয়াম কেরীর উৎসাহে পন্ডিত জয়গোপাল তর্কলঙ্কারের সম্পাদনায় কাশীরাম দাসের নামে ৪ খন্ডে সমগ্ৰ মহাভারত প্রকাশিত হওয়ায় মহাভারত অনুবাদের ক্ষেত্রে কাশীরাম দাসের নাম সার্বভৌম অধিকার স্থাপন করে।

আরো পড়ুন:  সুভাষ চক,সুভাষ বাউলি কিংবা মেহর হোটেল-ডালহৌসির সর্বত্রই শুধু একটাই সুর শোনা যায় ''নেতাজী''

কাশীরাম দাস কোন সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তার বিশেষ কোনো প্রমাণ নেই। কবিকঙ্কণ, কৃত্তিবাস ইত্যাদি রচনার থেকে কাশীরাম দাসের রচনা আধুনিক। কারন কৃত্তিবাস ও কবিকঙ্কণ এর ভাষার থেকে কাশীরাম দাসের ভাষা অনেক অংশে মার্জিত, স্পষ্ট ও সরল এবং শব্দগত বৈষম্য ও রয়েছে। কাশীরাম দাস কায়স্থকুলোদ্ভব এবং তাঁদের ‘দেব ‘ উপাধি ছিল। কায়স্থ জাতিরা উপাধির আগে ‘দাস’ বলে উল্লেখ করেন। কাশীরাম দাস ও মহাভারতের কোথাও’দেব’, আবার কোথাও ‘দাস’ উল্লেখ করেন:–

“শান্তিপর্ব ভারতের অপূর্ব কথনে।
কাশীরাম দেব কহে গোবিন্দ চরণে।। ”

কাশীরাম দাস ব্রাহ্মণ ভক্ত ছিলেন। তিনি মহাভারতের মধ্যে ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য অতিশয় সরল অন্তঃকরণে লিখেছেন :–

আরো পড়ুন:  তিনি ছিলেন বিনাবিচারে আটক দেশের প্রথম মহিলা রাজবন্দী

“মস্তক বন্দিয়া ব্রাহ্মণের পদরজঃ।
কহে কাশীরাম দাস গদাধরা গ্রজ।। ”

কাশীরাম দাসের পিতার নাম কমলাকান্ত, পিতামহের নাম সুধাকর এবং প্রপিতামহের নাম প্রিয়ঙ্কর ছিল। কাশীরাম দাসের দুই সহোদর। কৃষ্ণদাস জ্যেষ্ঠ, কাশীরাম মধ্যম ও গদাধর কনিষ্ঠ। কিন্তু অনেকে বলেন কমলাকান্তের চারটি পুত্র। তার মধ্যে কাশীরাম তৃতীয়। কিন্তু এই বিষয়ে কোন প্রমাণ নেই।

মহাভারতের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কবি এবং শ্রেষ্ঠ কবি কাশীরাম দাস বর্ধমান জেলার গৌরব। কোন কোন পুঁথিতে কাশীরাম তিনটি পর্ব, কোথাও চার পর্ব, কোথাও সাড়ে তিন পর্ব, কোন পুঁথিতে মহাভারত রচনার কথা বলা হয়েছে। একটি পুঁথিতে আছে –

ধন্য ছিল কায়স্থ কুলেতে কাশীদাস।
তিন পর্ব ভারতের করিল প্রকাশ।।
আদি সভা বনের যে রচিল পাঁচালী।
যাহা শুনি সর্বলোক ধন্য ধন্য বলি।।

আরো পড়ুন:  রোদ্দুরে ঘরটা আগুনের মতো গরম,একমনে ঘন্টার পর ঘন্টা লিখেই চলেছেন বিনয় ঘোষ

অন্য একটি পুঁথিতে –

ধন্য ধন্য কায়স্থ কুলেতে কাশীদাস।
চারিপর্ব ভারতের করিলা প্রকাশ।।
আদি সভা বন বিরাট রচিয়া পাঁচালী।
যাহা শুনি সর্বলোক ধন্য ধন্য বলি।।

পৃথ্বী চন্দ্রের গৌরী মঙ্গল কাব্যে আছে –

অষ্টাদশ পর্ব ভাষা কৈল কাশীদাস।
নিত্যানন্দ কৈল পূর্ব ভারত প্রকাশ।
কাশীরামের মহাভারত ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। অপর একটি পুঁথিতে ১৬০২-০৩ খ্রিস্টাব্দে পাওয়া যায়। কাশীরাম বৈয়াসিক মহাভারত ও জৈমিনীর মহাভারত অবলম্বনে স্বাধীন ভাবে মহাভারত পাঁচালী রচনা করেছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘কাশীরাম দাস ‘ সনেটে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন :–
” মহাভারতের কথা অমৃতসমান।
হে কাশী,কবিশদলে তুমি পুণ্যবান।। ”

লেখা : রিয়া দাস (রাই) , ইতিহাস স্নাতকোত্তরের ছাত্রী
ছবি – বাপ্পা দাস
তথ্যসূত্র: মধুসূদন রচনাবলী হরফ প্রকাশনী কলকাতা,বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বিজন বিহারী ভট্টাচার্য

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।