ছোট্ট ডিঙিতে ৩৩ দিনে উত্তাল সমুদ্র পার করেছিলেন বাঙালি ক্রীড়াবিদ পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

ছোট্ট ডিঙিতে ৩৩ দিনে উত্তাল সমুদ্র পার করেছিলেন বাঙালি ক্রীড়াবিদ পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা | দিনটা ছিল ১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি | কলকাতায় গঙ্গার বুকে দাঁড় টানা ডিঙি নৌকোয় দুই যুবক রওনা হয়েছেন আন্দামানের উদ্দেশ্যে | কারা ছিলেন এই দুই যুবক ? পিনাকী। পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। আর ডিউক মানে জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক। বছর তেইশের পিনাকী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ্যার গবেষক, রোয়িংয়ে চ্যাম্পিয়ন | সঙ্গী দিল্লির ছেলে জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক ভারতীয় নৌসেনার অফিসার। পিনাকীর চেয়ে ডিউক দু’বছরের বড় | ৩৩ দিনের এই দুঃসাহসিক অভিযান জয় করে পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় দেখিয়ে দিয়েছিলেন বীরত্ব বাঙালির রক্তে | অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পার হয়ে যখন গন্তব্যের কাছাকাছি তাঁরা, রসগোল্লা খেয়ে উদযাপন করেছিলেন সাফল্যের আনন্দ | বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি, এই রোমাঞ্চকর অভিযানের স্মৃতিও ভুলেই যেতে বসেছে |

কলকাতার সদানন্দ রোডের বাসিন্দা ছিলেন পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় | জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৮ মার্চ | পিনাকী চট্টোপাধ্যায় দক্ষ ক্রীড়াবিদ ও সাঁতারু ছিলেন। ছিলেন রোয়িং চ্যাম্পিয়ন | পেশায় কলিকাতা বিজ্ঞান কলেজের শারীরশিক্ষার অধ্যাপক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস মেডিসিন কোর্স চালু করায় সক্রিয় ছিলেন। অভিযানপ্রিয় এই বাঙ্গালী ক্রীড়াবিদ ছিলেন ‘এক্সপ্লোরার্স ক্লাবের সদস্য। কলকাতার ‘সি এক্সপ্লোরার ইনস্টিটিউট’ এর প্রতিষ্ঠাতা। পর পর দুবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু হয়েছিলেন তিনি | মাত্র তেইশ বছর বয়সে ১০০০ মাইল নৌকাযাত্রায় গড়ে ফেলেন বিশ্বরেকর্ড। পালহীন একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকো। লম্বায় কুড়ি ফুট, চওড়ায় পাঁচ ফুট আর উচ্চতা সাড়ে চার ফুট। আর তাতে করেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন পিনাকী আর ডিউক | নৌকোর নাম ছিল কানোজি আংরে | নামকরণের পিছনেও রয়েছে এক ইতিহাস | শিবাজীর নৌ সেনাপতি তুকোজি আংরের ছেলে ছিলেন কানোজি আংরে। একাই ইংরেজদের বহু জাহাজকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই কানোজির নামেই নৌকোর নামকরণ।নামকরণটা করেছিলেন ওই অভি়যানের প্রাণপুরুষ, বিশ্ববন্দিত সাঁতারু মিহির সেন।

আরো পড়ুন:  বঞ্চনা করা হত "বাঙাল" ফুটবলারদের,সেই রাগেই সুরেশ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করলেন ইস্টবেঙ্গল

১৯৬৯ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি কলকাতার ম্যান অব ওয়ার জেটি থেকে প্রথম এভারেস্ট জয়ী অভিযাত্রী তেনজিং নোরগের পিস্তলের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা শুরু করেন পিনাকী ও ডিউক। গন্তব্য পোর্টব্লেয়ারের আর্বেডিন জেটি।অভিযানের নকশা করেছিলেন ভারতীয় নৌসেনার কমান্ডার রথীন দাস | প্রথম কয়েকদিন বেশ ঠিকঠাকই ছিল | কিন্তু বিপত্তি এল এক সপ্তাহের মাথায় | ৮ তারিখ থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না কানোজি আংরে-র | বেতার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন | প্রায় এক সপ্তাহ সবাই গভীর উৎকণ্ঠায় কাটানোর পর কানোজি আংরে-র সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল | ১৪ তারিখ বায়ুসেনার দু’টো বিমান ওদের দেখা পায়। কলকাতা থেকে ওরা তখন ১৯০ মাইল দূরে | এর পর এগারো দিন দিব্যি সব ঠিকঠাক চলছিল | কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ফের কানোজি আংরে-র খবর নেই | ২৮ তারিখ রাতে দূর সমুদ্র থেকে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ কানোজি আংরে-র খবর পাঠায় শিপিং কপোর্রেশনের জাহাজ এম ভি নিকোবরকে। তখন পোর্টব্লেয়ার থেকে কানোজি আংরের দূরত্ব ৩৮০ মাইল।

আরো পড়ুন:  চার বছর ধরে তিল তিল করে জমানো ১৪ হাজার টাকা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে দান করলেন বৃদ্ধ ভিক্ষাজীবী

এরই মাঝে ইন্দোনেশিয়ায় এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়। আর তাতে সমুদ্র উথালপাতাল | এক-একটা ঢেউ তখন ২০ ফুট উঁচু | নৌকায় জল উঠে যায় | টানা তিন দিন, তিন রাত নৌকো থেকে পাম্প করে জল ফেলতে হয়েছিল ডিউক আর পিনাকীকে | পানীয় জলও কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়। সমুদ্রের জলে ওষুধ দিয়ে তা-ই পান করতে হয়েছিল তাদের |

আরো পড়ুন:  বল গার্ল থেকে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক,ঝুলন গোস্বামী অনুপ্রেরণার আরেক নাম

ঝড়ে কানোজি আংরে-র মাস্তুল দুরমুশ হয়ে যায় | পিনাকীর ডান হাতের আটটা লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। বাকি ক’দিন বাঁ হাতে দাঁড় টানতে হয় পিনাকীকে | সঙ্গী ডিউকের আগেই হার্নিয়া ছিল। সেটা বেড়ে যায় | ঢেউয়ে একটি কম্পাস-ও ভেঙে যায়।এইসব সত্ত্বেও হার মানেননি তাঁরা | ৮ই মার্চ তাঁরা সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে পোর্টব্লেয়ারের অ্যাবার্ডিন জেটিতে পৌঁছান | পোর্টব্লেয়ারের সমুদ্রতীরে তখন জনসমুদ্র | আর কলকাতায় ফেরার দিনটা যেন আবেগের সমুদ্রে ভেসে যাওয়া।

পিনাকী এই অভিযানের পরে কলকাতা হতে নৌকায় ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই অভিযান বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় দুর্ভাগ্যজনকভাবে | পিনাকীর মৃত্যু রহস্যাবৃত | প্রখ্যাত সাঁতারু হয়েও জলে ডুবে তার মৃত্যু হয় ১৯৮৩ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর | পিনাকীর বয়স তখন মাত্র ৩৭ |

পিনাকীদের এই অসামান্য কীর্তির কথা বাঙালি মনে রাখেনি !

ঋণ- আনন্দবাজার পত্রিকা, ‘কানোজি আংরে’, ১২ মার্চ, ২০১৬

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।