একটি পানের দাম ১০০০ টাকা,মিলবে কলকাতার বুকে প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এই দোকানে

একটি পানের দাম ১০০০ টাকা,মিলবে কলকাতার বুকে প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এই দোকানে

বাইরে জমিয়ে ভুরিভোজের পর মুখশুদ্ধির জন্য পকেটে নগদ টাকার বাড়ন্ত? কুড়িয়ে বাড়িয়ে দশ বিশ কি পঞ্চাশ টাকা হবে? তাতে কী? এই টাকায় কিন্তু আর কিছু না হোক ‘পান বিলাস’ হয়ে যাবে। কলেজস্ট্রীট বইপাড়ায় বিখ্যাত শরবতের দোকান প্যারামাউন্টের কাছাকাছিই রয়েছে ‘কল্পতরু পান ভান্ডার’। নামের মতই পানের বাহারে এই দোকান সত্যিই কল্পতরু। জানবেন নাকি এই দোকানের পান বাহার নিয়ে কিছু তথ্য? জানলে কিন্তু বেশ অবাকই হবেন।

৫ টাকা থেকে শুরু এদের পানের সম্ভার….. মুখরঞ্জন, মুখবিলাস, দিলখোস, মন মাতোয়ারা, বেনারস রুচি কিংবা বাদশাহী… রয়েছে হরেক রকম পান। তবে আসল চমক হল এদের হাজার টাকার পানের! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, একটা পানের দাম হাজার টাকা! ৫ টাকার মুখরঞ্জন, ১১ টাকার মুখবিলাস বা ৫১ টাকার মন মাতোয়ারার পাশাপাশি ৫০১ টাকায় বেনারস রুচি এবং ১০০১ টাকায় বাদশাহী পানও পাওয়া যায়। যদিও দোকানে মোটামুটি ১১ কিংবা ২১ টাকার পানই বেশি বিক্রি হয়, কেউ কেউ শখ করে ৫১ টাকার পানও খেয়ে থাকেন। তবে তার চেয়ে বেশি দামি পান সাধারণত বিদেশে যায়। আর এমনি সারাদিন গড়ে ৫০-৬০ খিলি পান বিক্রি হয়। এছাড়া বিয়ের মরশুমে এখন থেকে অর্ডার অনুযায়ীও পান সরবরাহ করা হয়।

কিন্তু ৫০০ বা ১০০০ টাকার পানের বিশেষত্ব কী? কল্পতরু পান ভান্ডারের কর্তৃপক্ষের তরফে কিন্তু বলা হচ্ছে, পানের আসল দামটা মশলা বা পান সাজাবার কায়দার ওপর নির্ভর করে। কয়েক প্রজন্ম ধরে কল্পতরুর পূর্বসূরী ও উত্তরসূরীরা এই পানের মশলার নানারকম গবেষণা চালাচ্ছে। আর মশলা আসেও দেশের নানা জায়গা থেকে। যেমন, সুপারি আসাম থেকে আসে আবার চেন্নাই থেকেও আসে। এবার কী ধরনের পান, সেই অনুযায়ী সুপারি কাটা হয়। কোনওটা কাগজের মত পাতলা, কোনওটা আবার একটু মোটা – তবক দেওয়া। একে ডলার সুপারি বলে। মিষ্টি পানের সঙ্গে পাতলা সুপারি দেওয়া হয়। আবার লঙ্কেশ্বর নামের এক ধরনের সুপারিও ব্যবহার করা হয় যা আওয়ারে এমনিতে মিষ্টি, আবার লবঙ্গের নির্যাসও আছে। আবার মেওয়া সুপারি নামের আরেক ধরনের সুপারি কল্পতরুর একদম নিজস্ব। মালিক পক্ষ বাড়িতেই এটি বানান। এছাড়া বাণারসী, এলাহাবাদ, লক্ষ্মৌ থেকে নানা মশলা এনে নিজেদের মত করে বানিয়েও পানে দেওয়া হয়। মশলার মত কল্পতরুর নিজস্ব জর্দাও আছে। তবে তা কতটা কড়া, তার সেভাবে মাত্রা নির্ধারণ করা নেই। যদিও ক্রেতারা সাধারণত এই নিজস্ব জর্দা খেয়ে খুশিই হন। তবে এইসব নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি মশলা অনেক সময় অন্য দোকানদার নকল করেন। তাতে অবশ্য কল্পতরুর বিশেষ অসুবিধা হয় না। নতুন উদ্যমে ফের মশলা বানানো শুরু করেন তাঁরা। যাই হোক, দোকানের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে তো!

আরো পড়ুন:  প্রায় একশো বছর গোলবাড়ির কষা মাংসে মজে আছে বাঙালি

পান তো সাধারণত আমরা টাটকা খাই। পানকেও সংরক্ষণ করা যায় ভেবেছেন কখনো? কল্পতরু পান ভান্ডারে কিন্তু তাও হয়। কেউ যদি বিদেশে এখানকার পান নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সেই ভাবে সংরক্ষণ করা হয় যাতে বেশ কয়েকদিন পরও সেই পান খাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে প্রথমে পাতা থেকে রস বার করা হয় যাতে পান পচে না যায়। তারপর পান সেজে খিলি বার করা হয়, এতে প্রায় ছয় সাত দিন পান একইরকম থাকে। এরপর পান ফ্রিজে রেখেও খাওয়া যায়। সেই পান খেলে পানের পাতাটা শুকনো থাকলেও স্বাদের কোনও বদল হয় না। স্বাদ একইরকম থাকে। দুবাই সহ মধ্য এশিয়াতে এভাবে পান পাঠায় কল্পতরু পান ভান্ডার।

আরো পড়ুন:  নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করেছেন,প্রয়াত হলেন ভাষাসৈনিক আলী তাহের মজুমদার

বরফের উপরে পান রেখে সাজা কল্পতরুই প্রথম শুরু করে।সারা দেশে বাংলা থেকে পান গেলও কল্পতরুর পান আসে কিন্তু ভুবনেশ্বর থেকে, মিঠা পান। বাংলা পাতা ও ঝালপাতায় তারা কোনও পান সাজেন না। কোনও কারণে যদি ভুবনশ্বর থেকে পান আনা সম্ভব না হয়, তা হলে স্থানীয় বাজার থেকে পান সংগ্রহ করেন কর্তৃপক্ষ।

এই কল্পতরুর ইতিহাস বেশ পুরনো বলা যায়। পূর্ববঙ্গের ঢাকায় স্বর্ণব্যবসায়ী ছিলেন এই দত্ত পরিবার। ঢাকায় ৮৭ বছর আগে তাঁরা পানের ব্যবসা শুরু করেন তিন ভাই রাধাবিনোদ দত্ত, নির্মলকুমার দত্ত ও সনাতন দত্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তাঁরা কলকাতায় চলে এসে পানের ব্যবসা চালিয়ে যান। কোথায় কী মশলা পাওয়া যায় সে ব্যাপারে তাঁদের ধারনা আগে থেকেই ছিল, আর বাঙালি মাত্রই পানের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর রাখেন, শহর ছেড়ে বাইরে গেলে পানের মশলার খোঁজ করেন | তবে দত্ত পরিবারের কর্তারা তার চেয়ে একটু এগিয়ে নিজেরাই পান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, ধীরে ধীরে নিজেদের ব্র্যান্ডিং তৈরি হয়।

আরো পড়ুন:  ছো নাচের মুখোশ তৈরীর আঁতুরঘর পুরুলিয়ার "মুখোশগ্রাম" চড়িদা

কল্পতরু পান ভান্ডারের পান খেয়ে গুনগান করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসক থেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল সহ অনেক নামকরা ব্যক্তিত্বরাও। এ ছাড়াও দোকানে টাঙানো থাকতো বিশিষ্ট কিছু মানুষের দেওয়া কল্পতরুর পানের সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেট প্রদানকারীদের তালিকায় প্রাক্তন রাজ‍্যপাল পদ্মজা নাইডু থেকে শুরু করে পিসি সরকার (সিনিয়র) ,ইন্দিরা গান্ধী, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, উত্তম কুমার, মান্না দে কে না ছিলেন |

দেশজোড়া নাম, খ্যাতি সবই হয়েছে। তবে এখন আক্ষেপ একটাই বিয়েবাড়িতে আজকাল সেভাবে আর পানের চল নেই বললেই চলে। ফুচকা, আইসক্রিম থেকে জিলিপি সবারই স্টল থাকলেও পানের বেলাতেই যত কার্পণ্য। পাশাপাশি পরের প্রজন্ম পারিবারিক ব্যবসায় না আসার আশঙ্কাও রয়েছে বর্তমান মালিকদের।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।