জন্মভিটাকে ভালবেসে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’ এর প্রতিষ্ঠাতা যোগেশচন্দ্র ঘোষ

জন্মভিটাকে ভালবেসে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’ এর প্রতিষ্ঠাতা যোগেশচন্দ্র ঘোষ

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস | খান সেনাদের ভয়ে পুরোনো ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার সব মানুষই শহর ছেড়ে পালিয়েছেন | চরম অশান্ত আবহে বাড়ির সবাইকে কলকাতায় পাঠিয়ে নিজে ভিটে আঁকড়ে রয়ে গিয়েছেন অশীতিপর যোগেশচন্দ্র ঘোষ | সঙ্গে তাঁর দুই বিশ্বাসী দারোয়ান সুরজ মিঞা আর রামপাল | যোগেশবাবু জানেন খান সেনাদের হত্যালীলার কথা | কিন্তু যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো ? হ্যাঁ,সত্যিই সাধনা ঔষধালয় কারখানা তাঁর কাছে সন্তানের মতই | তিল তিল করে নিজে হাতে গড়ে তুলেছেন সব | বিরাট এলাকা জুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা | এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, গবেষণা করেছেন | তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল এই কারখানা, এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া |

৩ এপ্রিল | গভীর রাত | যোগেশবাবুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটি মিলিটারী জীপ | ৫/৬ জন খানসেনা নেমে এল জিপ থেকে | কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে গেটের তালা ভেঙ্গে ফেলল তারা | পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠল | ভয় পেল খানসেনারা | রাতের আধারে পাক সেনারা পালিয়ে গেল | সুরুজ মিয়া বুঝলেন খানসেনারা আবার আঘাত হানবে | যোগেশবাবুকে অনুরোধ করলেন পালিয়ে যেতে | কিন্তু যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো ?

আরো পড়ুন:  বয়স প্রায় ১৬০ বছর,দেব সাহিত্য কুটীর আজও বাঙালির কাছে নস্টালজিয়া

৪ এপ্রিল সকাল। পাকিস্তানী আর্মি আবারও ফিরে এলো, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাক সেনারা নীচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করালো। এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে গেল। রাইফেলের মুখে ওই বয়স্ক মানুষটা কি বলেছিলেন তা কোনদিন আর জানা হবে না ! পাক সেনারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তাদের উল্লাসধ্বণী নীচে ভেসে আসছিল ! নীচের লোকজনরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন | পাক আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত সমস্ত সম্পদ। কেবল নিতে পারেনি এ দেশের জন্য যোগেশ বাবুর একবুক ভালোবাসা |

কে এই যোগেশচন্দ্র ঘোষ ?
যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুরের গোঁসাইরহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০২ সালে ঢাকার কে এল জুবিলী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফ.এ. পাশ করেন। এর পর ১৯০৬ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে বি.এ. এবং ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে এম.এ. পাশ করেন | ১৯১২ পর্যন্ত ভাগলপুর কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, তার পর অধ্যাপনা শুরু জগন্নাথ কলেজে। ১৯৪৮ সালে সেখান থেকেই অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নেন। তিনি ‘রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি’র ফেলো এবং ‘আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’-র সদস্যও ছিলেন |

আরো পড়ুন:  আইআইটি থেকে পাস করে চাকরি না করে ব্যবসা,শিল্পপতি অশোক মুখার্জী অনুপ্রেরণার আরেক নাম

১৯০৫ সাল | বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করলেন লর্ড কার্জন | শুরু হল স্বদেশী | গড়ে উঠতে লাগল একের পর এক স্বদেশী শিল্প | আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালস,সুরেন্দ্রমোহন বসুর ডাকব্যাক,খগেন্দ্রচন্দ্র দাস, আর এন সেন এবং বি এন মৈত্রের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছে ক্যালকাটা কেমিক্যালস -এর মত কোম্পানি | যোগেশচন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র ছিলেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ | আচার্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই ‘সাধনা ঔষধালয়’ স্থাপন করেছিলেন তাঁর সুযোগ্য ছাত্র যোগেশচন্দ্র ঘোষ |

যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯১৪ সালে ঢাকায় আয়ুর্বেদ ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সাধনা ঔষধালয় প্রতিষ্ঠা করেন | স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, চিন-এ আয়ুর্বেদিক ওষুধের বিপুল বাজার তৈরি করেছিলেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ | আয়ুর্বেদ চিকিৎসা ব্যবস্থায় খুলে গিয়েছিল এক নতুন দিগন্ত | নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু থেকে তৎকালীন যুগপুরুষ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন ঢাকার যোগেশ চন্দ্র ঘোষের সাধনা ঔষধালয়ে।

তবে ১০৫ বছর পেরিয়ে আজ প্রায় বন্ধ হবার মুখে সাধনা ঔষধালয় | গোটা ভারত জুড়ে এখনও প্রায় ১৩০টি দোকান তাদের | পশ্চিমবঙ্গে ৩০ টি | কলকাতার অনেক মোড়ে এখনও হঠাৎ চোখে পড়ে ‘সাধনা ঔষধালয় (ঢাকা)’-র ব্যানার | কিন্তু ঐটুকুই | সাধনা ঔষধালয় এর বেশির ভাগ দোকান বছরের অধিকাংশ দিন বন্ধ থাকে, বহু ওষুধই আর পাওয়া যায় না | লাইসেন্সের সমস্যায় ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০১২ পর্যন্ত সংস্থার ওষুধ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল | কলকাতা ও সন্নিহিত এলাকায় এক সময় মোট পাঁচটা কারখানা ছিল ‘সাধনা’-র | দক্ষিণদাঁড়ির পর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একে একে লেক টাউন, টালিগঞ্জ, কাশীপুর ও বেলুড়ে কারখানা হয়।। কিন্তু এখন টিমটিম করে চালু শুধু দক্ষিণদাঁড়ির কারখানা | এক সময় খাঁটি সোনা, রুপো, বহু গাছগাছড়া, এমনকি ওষুধবিশেষে পাঁঠার মাংসের তেল ব্যবহার করা হত | আজ সবই ইতিহাস |

আরো পড়ুন:  বার্ণপুরে ইস্কো ইস্পাত কারখানার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি স্যার বীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়-কে

যোগেশচন্দ্র বিয়ে করেছিলেন কিরণবালাকে। এক ছেলে ও দুই মেয়ে হয় তাঁদের | ছেলে নরেশচন্দ্র ছিলেন এমবিবিএস ডাক্তার এবং যোগ্য উত্তরসূরি | যোগেশচন্দ্রের পর তিনি এগিয়ে নিয়ে যান সাধনা-কে | একসময় ভারতের প্রায় প্রতিটি শহরে ‘সাধনা’-র দোকান ছিল। বিশেষ করে বিহার ও অসমে ছিল অসম্ভব চাহিদা | আজ সবই ইতিহাস | বাঙালির মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, উদ্যোগী মানসিকতা এবং সফল ব্যবসায়িক প্রচেষ্টার প্রায়-বিস্মৃত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল “সাধনা” |

তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা (পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।