সম্পর্কে তিনি রঞ্জিত মল্লিকের দাদু,ইকমিক কুকারের আবিষ্কারক ইন্দুমাধব মল্লিককে চেনেন আজকের বাঙালিরা?

সম্পর্কে তিনি রঞ্জিত মল্লিকের দাদু,ইকমিক কুকারের আবিষ্কারক ইন্দুমাধব মল্লিককে চেনেন আজকের বাঙালিরা?

ইন্দুমাধব মল্লিককে চেনেন? শুধু নাম বললে হয়তো কেউই সেভাবে চিনবেন না। অথচ তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে তাঁর মত বৈচিত্র্যময় পণ্ডিত খুবই কম আছে। ভবানীপুরের মল্লিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর বংশযুক্ত। তাঁর পুত্র ছিলেন কবি ও শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র মল্লিক, আর এই উপেন্দ্র মল্লিকের পুত্র চলচ্চিত্র শিল্পী রঞ্জিত মল্লিক এবং পরবর্তী বংশলতিকা সবারই জানা। এবার হয়তো আধুনিক বাঙালি কিছুটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই।

তবে বংশ পরিচয়, ছেলে কিংবা নাতি….. এই কোনও কিছুই ইন্দুমাধব মল্লিকের পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। মাত্র ৪৮ বছরের স্বল্প জীবনে তিনি ছিলেন দার্শনিক, আইনজীবী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, প্রাণীবিদ্যাবিদ, লেখক এবং সমাজ সংস্কারক। তাঁর লেখা ‘জাহাজে বিলেত’ ও চিন ভ্রমণের ওপর প্রামাণ্য বইগুলি বিশেষ সমাদৃত। তবে এতকিছুর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইন্দুমাধব মল্লিকের ইকমিক কুকারের আবিষ্কার। গবেষক নারায়ণ সেনের মতে চিন ভ্রমণকালে সেখানকার পথে ঘাটে খাবার বিক্রির ব্যবস্থা দেখেই নাকি “ইকমিক কুকার” আবিষ্কারের পরিকল্পনা তাঁর মাথায় আসে। আবার কারও মতে পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেবের রান্নাঘর দেখেই আইডিয়াটা ঝিলিক মেরেছিল তাঁর মাথায়। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলেন, জ্বলন্ত উনুনে প্রথমে বড় একটি হাঁড়ি, তার পর ক্রমশ ছোট থেকে আরও ছোট, এই ভাবে পর পর ছ’টা হাঁড়ি বসানো। প্রতিটি হাঁড়িতেই খাবার রয়েছে। এই ভাবেই শত শত লোকের জন্য ভোগ রান্না হচ্ছে। তাঁর মনে হয়েছিল , এই ভাবে রান্না হলে পরিশ্রম বাঁচবে। সময় বাঁচবে। জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং খাদ্যগুণ বজায় রাখাও সম্ভব হবে। এই কুকার বিশেষ করে যেখানে রান্না ব্যবস্থার অভাব বা ছোট পরিবার কিংবা অবিবাহিত মানুষ – তাদের পক্ষে যথেষ্ট জনপ্রিয় ও সুবিধাজনক হয়েছিল। এছাড়া এই কুকারকে খুব সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত। যার ফলে এটি বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে।

আরো পড়ুন:  পাখিদের অজানা জগৎ চিনতে শিখিয়েছিলেন ‘বার্ডম্যান অফ বেঙ্গল’ পক্ষীবিদ অজয় হোম

১৯১০ সাল নাগাদ এই ইকমিক ষ্টিম কুকার আবিষ্কার হয়। এই কুকারের সাফল্যের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল এতে চাল, ডাল, সবজি খুব তাড়াতাড়ি রান্না করা সম্ভব। নিচে কাঠ-কয়লার আঁচে মাত্র কুড়ি – পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই সমস্ত রান্না সারা হয়ে যেত। অনেকটা আমাদের প্রেসার কুকারের মত আর কি! রান্না শেষে নিচে পড়ে থাকত কাঠ-কয়লার ছাই। এই অবস্থায় যদি তখনই খোলার দরকার না হত তবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাবার নিজে থেকেই গরম থাকত।

আরো পড়ুন:  থার্মোকল থেকে মজবুত হালকা ওজনের হেলমেট আবিষ্কার করে চমক বাঙালি বিজ্ঞানী শান্তনু ভৌমিকের

তবে আধুনিক কুকারের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় এর ব্যবহার অনেক দিন বন্ধ। শুধু বাইরের পিতলের অবয়বটি অবশিষ্ট আছে। সেভাবে খুঁজলে এখনও হয়তো বাজারে কিছু পরিবর্তিত রূপে ইকমিক কুকার কিনতে পাওয়া যায়। তবে এতে কিন্তু শুধু ডাল-ভাত নয়, এই ইকমিক কুকারে টক-অম্বল এমনকি ডিম-মাংস রান্নাও হত। কুকারটির সবচেয়ে বড় গুণ ছিল এতে একসঙ্গে ৩-৪ টি পদ রান্না করা যেত যা ছিল খুবই সুস্বাদু। আর যেহেতু এটা কাঠকয়লায় রান্না হয়, তাই এর গুনাগুনই আলাদা ছিল।

আরো পড়ুন:  ১৪ নতুন প্রজাতির প্রাণী আবিষ্কার করে চমক বাঙালি প্রাণীবিদ শান্তনু মিত্র'র,মিলল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ইন্দুমাধব মল্লিক ১৮৬৭ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বর্ধমানের কালনা গুপ্তিপাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। প্রয়াত হন ১৯১৭ সালের ৮ই মে। শুধু কিন্তু ইকমিক কুকার আবিষ্কারের জন্যই তাঁকে মনে রাখা উচিত নয়। ইন্দুমাধব মল্লিকের নানা বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে কোন চলচ্চিত্র বানালেও তা সফল হত। সমাজের স্বাস্থ্যের হাল ফেরাতেও তিনি চেষ্টা করেন । দেশে যাতে অটোভ্যাকসিন পদ্ধতি চালু হয় সে ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। মূল্যবান পান্ডুলিপি সংগ্রহ তো করতেনই। এছাড়া জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্নও ছিলেন। দেওঘরে বোমা পরীক্ষা করার সময় উল্লাসকর দত্ত গুরুতর আহত হলে এই ইন্দুমাধব মল্লিকই গোপনে তাঁকে চিকিত্‍সা করে সুস্থ করে তোলেন। তাই এমন পণ্ডিতের কাছে বাঙালির অনেক ঋণ আছে। আক্ষেপ, সিংহভাগ বাঙালি তাঁকে চেনেনই না।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।