প্রফুল্ল চাকিকে হত্যার বদলা,সার্পেন্টাইন লেনে নন্দলাল ব্যানার্জীকে গুলি করে হত্যা করে শ্রীশ পাল ও রণেন গাঙ্গুলি

প্রফুল্ল চাকিকে হত্যার বদলা,সার্পেন্টাইন লেনে নন্দলাল ব্যানার্জীকে গুলি করে হত্যা করে শ্রীশ পাল ও রণেন গাঙ্গুলি

তারিখটা ছিলো ১৯০৮ সালের ৯ই নভেম্বর | তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা | মধ্য কলকাতার সার্পেন্টাইন লেন ধরে ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরছেন কোলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের দুঁদে সাব ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী | তখনও কোলকাতার রাস্তায় ইলেক্ট্রিকের আলো চালু হয়নি | সেদিন সন্ধ্যা থেকেই কেমন যেন একটা কুয়াশা মতো জিনিস নেমেছে | গ্যাসবাতির কমজোরি আলোয় অল্প দূরেরও কোনো কিছুই ঠিক মতো ঠাহর করা যাচ্ছে না | সবার অগোচরে পুরোনো শিবমন্দিরের সামনে অন্ধকারে দুজন মানুষ হাতে চিনে বাদামের ঠোঙা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কারো জন্যে অপেক্ষা করছেন | নন্দলালবাবু গুনগুন করে একটা প্রিয় গান গাইতে গাইতে এগোচ্ছেন | মনটা ওনার সেদিন খুব ভালো | ওপর মহল থেকে পাকা খবর এসেছে খুব শিগগিরই উনি প্রোমোশন পেয়ে ইন্সপেক্টর হয়ে যাবেন | আর হবেনই না কেন | সরকার বাহাদুরের জন্যে কয়েকদিন আগেই যে কাজটা তিনি করেছেন সেটা করার মতো বুকের পাটা কজনের থাকে | হঠাৎ পাশের অন্ধকার গলি থেকে ধূমকেতুর মতো ধুতি পড়া দুই যুবক একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালো | আলোয়ান দিয়ে মুখ ঢাকা দুজনেরই | কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনের জন কোমর থেকে রিভালবার বার করে দারোগা সাহেবের বুক লক্ষ্য করে পর পর দুটো গুলি চালালেন | মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন নন্দলাল ব্যানার্জি | মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তে শেষবারের মতো আততায়ীদের দেখার শেষ চেষ্টা করলেন | কিন্তু ততক্ষণে দুই যুবক ভোজবাজির মতো অন্ধকারে মিলিয়ে গেছেন |

কে এই নন্দলাল ব্যানার্জী আর কেই বা তাকে গুলি করে মারলো | কিছুই পরিষ্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে না তো ! ঘটনাটা কি আর কেন জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে গত শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিনগুলিতে | সারা দেশ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে | যদিও ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত ভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কিছু কিছু সশস্ত্র বিক্ষোভ দেখা দিলেও সেগুলি কোনো সংগঠিত ঘটনা ছিলোনা | এছাড়াও নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবী কার্যকলাপ গুলিকে বিদেশী শাসকরা সহজেই দমন করতে সক্ষম হচ্ছিলো | ইংরেজদের অত্যাচারে জর্জরিত মানুষের একটা বড়ো অংশ ধীরে ধীরে কংগ্রেস তথা অন্যান্য নরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির অহিংস রাজনীতির উপর আস্থা হারাতে শুরু করে | দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবীরা বেশ বুঝতে পারছিলেন যে সঙ্গবদ্ধ ভাবে সশস্ত্র প্রত্যাঘাত না করলে ইংরেজদের দেশ থেকে তাড়ানো যাবে না | সেই সময়ে দেশের নানা জায়গায় বেশ কিছু গুপ্ত সংগঠন তৈরি হয় | ১৯০২ সালে অবিভক্ত বাংলায় প্রখ্যাত বিপ্লবী প্রমথনাথ মিত্রের উদ্যোগে তৈরি হয় অনুশীলন সমিতি | মূলত এদের প্রাথমিক কার্যকলাপ ঢাকা থেকে পরিচালিত হলেও কোলকাতাতেও তাদের শাখা ছিল | ১৯০৫ সালে প্রস্তাবিত বঙ্গ ভঙ্গ বিরুদ্ধে সারা বাংলা জুড়ে আন্দোলনের সময় ১৯০৬ সালে শ্রী অরবিন্দ ও তার ভাই বারীন ঘোষ অনুশীলন সমিতির কোলকাতার শাখাকে যুগান্তর নাম দিয়ে নতুন ভাবে সংগঠিত করেন | ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত , রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক ও আরো বেশ কিছু এপার বাংলার বিপ্লবীও তাদের সাথে ছিলেন | যদিও এর সাথে আরো বেশ কিছু গুপ্ত রাজনৈতিক সংগঠন বাংলায় গড়ে উঠেছিল তবুও ঢাকা অনুশীলন সমিতি আর যুগান্তর দলের বিপ্লবী সদস্যরাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটা সশস্ত্র প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাত করতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন | স্বাভাবিক ভাবেই এই সব সংগঠন গুলো ইংরেজ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায় আর সরকার তাদের বেআইনি ঘোষণা করে | এরা গোপনে মিটিং করতো | লিফলেট বিলি করতো | এই গুপ্ত সংগঠনগুলোর বেশ কয়েকটার নিজস্ব পত্রিকাও ছিলো | বহু বাঙালি মানুষজন গোপনে এদের নিয়মিত অর্থ সাহায্য দিতেন | ইংরেজ সরকার বহু চেষ্টা করেও এইসব সংগঠনগুলি ভেঙে দিতে পারেনি | যদি ইংরেজদের হাতে এই গুপ্ত সমিতিগুলির সাথে সামান্যতম যোগাযোগ আছে এমন কেউ ধরা পড়তো তাহলে চলতো অমানুষিক অত্যাচার | বিচারের নাম প্রহসন করে, মিথ্যা মামলায় নাম জড়িয়ে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে দীর্ঘদিনের জন্যে জেলে পাঠানো ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা |

ডগলাস কিংসফোর্ড | চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট | সেটা তখন স্বদেশী জাগরণের উত্তাল সময় | কিংসফোর্ড ছিলেন ভয়ঙ্কর অত্যাচারী | ইংরেজ সরকারের বিপক্ষে যারা যত সামান্যই বিরুদ্ধাচারন করুক না কেন তাদের তিনি কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দিতেন | ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ পরায়ন | একটা আস্ত শয়তানের প্রতিমূর্তি | বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে জড়িত কেউ ধরা পড়লেই সবার সামনে উলঙ্গ করে চাবুক মারার আদেশ , সশ্রম কারাদণ্ড এমনকি সোজা আন্দামান | সেই সময় কোলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা দৈনিক যুগান্তর, বন্দে-মাতরম ইত্যাদি যেগুলিতে ওনার অত্যাচারের বিরুদ্ধে লেখা হতো সেগুলিকে প্রায়ই উনি বাজেয়াপ্ত করার নির্দশে দিতেন | এরকমই একবার কোলকাতা হাইকোর্টে ওনার এজলাসে যুগান্তর পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক শ্রী অরবিন্দ আর প্রকাশক বিপিন চন্দ্র পালের বিচার চলছে | কিংসফোর্ডের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যে এজলাসের বাইরে বহু সাধারণ মানুষ জড়ো হয়েছেন | কিংসফোর্ডের নির্দেশে পুলিশ উপস্থিত মানুষজনকে ছত্রভঙ্গ করার জন্যে নির্মম ভাবে লাঠি চালালো | বহু লোক হাত পা ভেঙে মাথা ফেটে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন | এই ঘটনার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ালেন মাত্র পনেরো বছরের এক বালক সুশীল সেন | কিংসফোর্ড এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে এসে সবার সামনে সুশীল সেনকে উলঙ্গ করে পনেরো ঘা বেত মারার হুকুম দিলেন | সবার চোখের সামনে রক্তাক্ত সুশীল অমানুষিক বেত্রাঘাতে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো | ব্যাস | এতদিন ধরে বাংলার বিপ্লবীদের মনে যে আগুন জ্বলছিল তাতে যেন ঘৃতাহুতি পড়লো | এবার কিংসফোর্ডের খেলা শেষ করতে হবে | দায়িত্ব নিলেন বাংলার অন্যতম বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের সভ্যরা | ডাকা হলো উনিশ বছর বয়সের তরুণ বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে | অন্য একজন তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর সঙ্গে চাকীকে একাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন:  করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন রাজ্যের দুই চিকিৎসক

এখানে প্রফুল্ল চাকী সম্পর্কে কয়েকটা কথা জানার প্রয়োজন আছে | আসলে অন্যান্য সমসাময়িক সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীদের তুলনায় কোনো অজ্ঞাত কারনে প্রফুল্ল চাকী সম্পর্কে ইতিহাসের পাতায় বিশদে কোনো আলোচনা হয়নি | ১৮৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার বিহার গ্রামের এক মধ্যবিত্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারে প্রফুল্ল চাকী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ ও মাতা স্বর্ণময়ী। তাঁর পিতা ছিলেন বগুড়ার নওয়াব পরিবারের একজন কর্মচারী। প্রফুল্ল চাকী মাত্র দুবছর বয়সে পিতাকে হারান।

মাতা কর্তৃক লালিত-পালিত চাকী তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলেই শুরু করেন। ১৯০৪ সালে তিনি রংপুরের জেলা স্কুলে ভর্তি হন। রংপুরে তিনি বান্ধব সমিতিতে যোগ দেন। এটি ছিল একটি স্থানীয় শরীরচর্চা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকারের কার্লাইল সার্কুলার লঙ্ঘন করে ছাত্র সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য চাকী স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি রংপুরের জাতীয় স্কুলে ভর্তি হন। এসময়েই তিনি জিতেন্দ্রনারায়ণ রায়, অবিনাশ চক্রবর্তী ও ঈশানচন্দ্র চক্রবর্তী-র মতো বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন এবং এর ফলেই তাঁর মাঝে উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে। ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে যুগান্তর দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ রংপুর ভ্রমণে আসেন। বারীন্দ্র ঘোষের সঙ্গে প্রফুল্ল চাকীর পরিচয় হয় এবং তিনি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করতে সক্ষম হন। এরপর ১৯০৭ সালে বারীন ঘোষ কলকাতায় গোপন বোমা কারখানা গড়ে তোলার সময় তিনি চাকীকে কলকাতায় নিয়ে যান।

এদিকে পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার বিপ্লবীদের প্রতি তাঁর হিংসাত্মক মানসিকতার জন্য জনগণের চরম ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন। বারীন ঘোষ তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। ফুলারের দার্জিলিং ট্যুরের সময় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয় ও চাকীর ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়। কিন্তু ট্যুর বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

যাই হোক ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীকে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার গুরুদায়িত্ব দেয়া হলো | ক্ষুদিরামের বয়স তখন আঠারো বছরেরও কম আর প্রফুল্ল চাকী উনিশ | আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এর আগে দুজন পরস্পরকে চিনতেন না | ইতিমধ্যে কিংসফোর্ডকে সেশন জজ হিসেবে মুজাফ্ফরপুরে বদলি করা হয়। তাঁরা দুজন মুজাফ্ফরপুরে গিয়ে কিংসফোর্ডকে খুব কাছ থেকে কয়েকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এরপর তাঁদের পরিকল্পনা তৈরি করেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাঁরা ইউরোপীয়ান ক্লাবের প্রধান ফটকের সামনে আত্মগোপন করে কিংসফোর্ডের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর কিংসফোর্ডের গাড়ির অনুরূপ একটি গাড়ি গেটের কাছ আসলে তাঁরা বোমা নিক্ষেপ করে গাড়িটি উড়িয়ে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটি ছিল মিসেস ও মিস কেনেডির গাড়ি। ঘটনাস্থলেই তাঁরা দুজন মারা যান। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম পৃথক পৃথক ভাবে পলায়ন করেন। তারা তখনও জানতেন না যে তাদের আসল লক্ষ্য হাত থেকে ফস্কে গেছে | সারা রাত প্রায় পচিঁশ কিলোমিটার হেটে পরদিন ভোরে ক্ষুদিরাম ওয়াইনি স্টেশনের কাছে এক চায়ের দোকানে খাওয়ার জল চাইতে গিয়ে দুই পুলিশ কনস্টেবলের হাতে ধরা পড়েন | এদিকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পায়ে হেটে প্রফুল্ল চাকী পরদিন বিকেলে পৌঁছান সমস্তিপুর স্টেশনে | ত্রিগুণা চরণ ঘোষ নামে একজন রেল কর্মচারী প্রফুল্ল চাকীকে এক সেট নতুন জামা কাপড় আর একজোড়া নতুন জুতো কিনে মোকামা ঘাট স্টেশনে যাওয়ার একটা ইন্টার ক্লাসের টিকিট কেটে দিলেন যাতে সেখান থেকে ট্রেন বদলে কলকাতায় যাওয়া যায় | খুব দুঃখিত ত্রিগুণা বাবু | ইতিহাস বড়ো বেইমান | আপনাকে কেউ মনে রাখেনি | কোনো বইয়ের পাতায় আপনার নাম লেখা হয়নি | অথচ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সংখ্যায় কম হলেও আপনাদের মতো লোকেদের ভূমিকা বিরাট |

আরো পড়ুন:  অগ্নিযুগের পদাতিক কানাইলাল দত্ত, চন্দননগর কলেজ এবং অশরীরীর কাহিনী

এদিকে কোলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন সাব ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী তখন সবে সিংভূম জেলায় (এখন ঝাড়খণ্ডে) বদলি হয়েছেন | তিনি ছুটিতে বাড়ি ফিরছিলেন | সমস্তিপুর স্টেশনে উস্কো খুস্কো চুল অথচ নতুন জামা প্যান্ট জুতো পরা এক তরুণকে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখে ওনার মনে সন্দেহ হলো | কারন আগেরদিন সন্ধ্যায় মুজাফ্ফরপুর ইউরোপিয়ান ক্লাবের ঘটনা তখন দাবানলের মতো ছড়িয়েছে | উনি প্রফুল্ল চাকীকে চিনতে না পারলেও বেশ ভালো বুঝতে পারলেন যে এই তরুনের সাথে ওই ঘটনার কোনো যোগ আছে | ইতিমধ্যে উনি কথায় কথায় ভুলিয়ে ওই ছেলেটির সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছেন | প্রফুল্ল চাকীও একজন বাঙালিকে দেখে খানিকটা ভরসা পেয়ে ওনার গন্তব্যস্থানের নাম বলে ফেললেন | নন্দলাল প্রফুল্ল চাকীর সাথে একই ট্রেনে উঠে পাশাপাশি বসে গল্প জুড়ে দেন | যদিও ধূর্ত নন্দলাল বাঙালি ছেলেটির সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক কথাই বার করে নিয়েছিলেন কিন্তু প্রফুল্ল চাকী নিজের আসল নামটা না বলে দীনেশ রায় নামে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন | মাঝপথে শিমুরাইঘাট স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ালে নন্দলাল বগি থেকে নেমে স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে মুজাফ্ফরপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে টেলিগ্রাম করে মোকামা ঘাট স্টেশনে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করতে বলেন | খানিকক্ষণ বাদে ট্রেনটি মোকামা ঘাট স্টেশনে পৌঁছালে নন্দলাল ইশারায় প্লাটফর্মে মোতায়েন পুলিশ কনেস্টেবলদের ইশারা করেন | বেশ কয়েকজন উর্দিধারী সিপাহী বগিতে উঠে প্রফুল্ল চাকীর হাত দুটো চেপে ধরে | প্রফুল্ল চাকী ছিলেন যথেষ্ট শক্তিশালী পুরুষ | বাঘের মতো গায়ের জোর ছিল তার | ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পুলিশের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে তার বেশিক্ষণ সময় লাগেনি | দৌড়ে বগির দরজা দিয়ে বাইরে প্লাটফর্মে লাফ দিয়ে নামার মুহূর্তেও নাকি তিনি চিৎকার করে নন্দলালকে বলেছিলেন ‘আপনি বাঙালি হয়েও একজন বাঙালিকে ধরিয়ে দিলেন’ | প্রফুল্ল চাকী ভুল বলেছিলেন | নন্দলাল ব্যানার্জীদের মতো বেইমানদের কোনো জাত হয়না, ধৰ্ম হয়না, দেশ হয়না | এরপর তিনি প্লাটফর্ম থেকে দৌড়ে বাইরে আসার চেষ্টা করেন | পিছন পিছন পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে ধাওয়া করতে থাকে | শেষে যখন প্রফুল্ল চাকী বুঝতে পারেন যে তিনি ধরা পড়বেনই তখন নিজের কোমরে গোজা রিভালবার বার করে নিজের মাথার পর পর দুটো গুলি করে মাটিতে পড়ে যান | ব্রিটিশ সরকারের পদলেহী পুলিশের হাতে ধরা পরার থেকে তিনি আত্মহননকেই বেশি সম্মানজনক ভেবেছিলেন |
এখানেই আমার একটা খটকা লাগে | আপনাদের কি মনে হচ্ছে না যে কোনো মানুষ নিজের মাথায় একবার গুলি করার পর দ্বিতীয়বার কি নিশানা ঠিক রেখে নিজের হাতে গুলি চালাতে পারে ? কি জানি হয়তো পারেওবা | সব বইতে তো তাই লেখা আছে | আমি খুব বেশি লেখা পড়া করা মানুষ নই তবুও আমার যুক্তিটা একবার ঠান্ডা মাথায় ভাবুন না | আমার নিজের ধারণা পুলিশই নিরস্ত্র প্রফুল্লর মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায় | পরে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে মাথায় গুলি করার অন্যায়টা ঢাকার জন্যেই ঘটনাটা সাজিয়েছিলো |

এর পরের কাহিনীটা বীভৎস বললেও কম বলা হবে | তখনও পুলিশ বাহিনী নিশ্চিন্ত নয় যে মৃত ব্যক্তিই মুজাফ্ফরপুর ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে থেকে আগের দিন সন্ধ্যায় ফেরার প্রফুল্ল চাকী | কারন নন্দলালের কাছে তিনি নিজের নাম বলেছিলেন দীনেশ রায় | তাই পরদিন মুজাফ্ফরপুর জেলে বন্দি ক্ষুদিরাম বসুর কাছে একটা খাটিয়ায় বেঁধে প্রফুল্লর দেহটা পাঠানো হলে তিনি চাকীকে সনাক্ত করেন | বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে প্রফুল্লর দেহ পুড়িয়ে ফেলার আগে নন্দলাল ব্যানার্জির উদ্যোগে ধর থেকে মাথাটা কেটে আলাদা করে একটা কাঁচের বাক্সে স্পিরিটে চুবিয়ে রাখা হলো | তার পরের দিন বীর বিক্রমে পুলিশ পুঙ্গব নন্দলাল সেই কাঁচের বাক্স নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন | কারন যদি তিনি প্রমান করতে পারেন যে কাটা মাথাটা প্রফুল্ল চাকীর তাহলে আর্থিক পুরস্কার, পদক আর প্রমোশন আটকায় কে ?
কোলকাতা হাইকোর্টে সেই বছরই ২১শে মে ক্ষুদিরাম বসুর বিরুদ্ধে শুনানি আরম্ভ হয় | শুনানি চলাকালীন সেই স্পিরিটের জারে রাখা মাথাটা আবার দেখানো হলে তিনি আদালতে সেটাকে প্রফুল্ল চাকীর বলে সনাক্ত করেন | ১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট ভোর পাঁচটায় ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয় |

এখানে একটা প্রশ্ন হয়তো আপনাদের মাথায় আসতে পারে | শহীদ প্রফুল্ল চাকীর কাটা মাথাটা কোথায় গেলো | এটা আজও রহস্য | সরকারি নথি বলছে ওই মাথাটা দীর্ঘদিন লর্ড সিনহা রোডে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অফিস সংলগ্ন বাগানের মাটিতে পোঁতা ছিলো | অনেক পড়ে সেটা তুলে লালবাজারে ক্রিমিনাল রেকর্ড রুমে পাঠানো হয় | আমাদের যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ শিক্ষক শ্রী অমলেন্দু দে প্রায় কুড়ি বছর ধরে এই নিয়ে গবেষণা করেছিলেন | তিনি দাবি করেছিলেন তিনি লালবাজারের মহাফেজখানায় কোনো দেরাজে একটা মানুষের মাথার খুলি দেখেছিলেন যার ডানদিকের কপালে দুটো ফুটো ছিলো | তিনি নিশ্চিত ভাবে বলেছেন যে ওটাই প্রফুল্ল চাকীর মাথার খুলি | উনি আরো নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে পুলিশ কমিশনারের কাছে ডি-এন-এ টেস্ট করার অনুরোধ করলেও সেটা নাকচ করা হয় | তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছেও উনি এ ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠান | কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি | বর্তমান সরকারের মন্ত্রী সাধন পান্ডেও বেশ কিছুদিন আগে বিধান সভায় এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন | কিন্তু রহস্য এখনো একই তিমিরে | আজও লালবাজারে মহাফেজখানায় কোনো আলমারির ভেতরে অনাদরে অবহেলায় বোধহয় সেটা পড়ে আছে | এটাই বোধহয় প্রফুল্ল চাকীর আত্মত্যাগের চরম স্বীকৃতি | তার শেষ প্রাপ্য |যাই হোক এবার মূল প্রসঙ্গে আসি | এদিকে বাংলার বিপ্লবী সংগঠনগুলো প্রফুল্ল চাকীর নির্মম মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে | ঠিক করা হলো বিশ্বাসঘাতক নন্দলাল ব্যানার্জীকে চরম শাস্তি দিতে হবে | কিন্তু কাজটা করবে কে | এগিয়ে এলেন বাংলার অন্যতম গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন ঢাকা মুক্তিসংঘের কলকাতার প্রতিনিধি শ্রীশ চন্দ্র পাল | ১৮৮৭ সালে ঢাকায় জন্ম ওনার | নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের অন্ধ ভক্ত শ্রীশ চন্দ্র বিখ্যাত বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে ১৯০৫ সালে বাংলার বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেন | অসম সাহসী এই যুবক অকুতোভয়ে যে কোনো বিপ্লবী কার্যকলাপে প্রধান ভূমিকা নিতেন | আত্মন্নতি সমিতির আরেক ডাকাবুকো বিপ্লবী রণেন গাঙ্গুলিকে উনি সাথে নিলেন |

আরো পড়ুন:  ক্ষুদিরাম হেমবাবুকে বলল,স্যার আমি যে মায়ের কথা বলছি সে আমার,আপনার,সারা দেশবাসীর মা

১৯০৮ সালের ৯ই নভেম্বর সন্ধ্যাবেলার ঘটনা এই লেখার প্রথমেই উল্লেখ করেছি | দুটো গুলিই শ্রীশ পাল চালিয়েছিলেন | বিশ্বাসঘাতক বেইমান কলকাতা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জির ভবলীলা সাঙ্গ হলো | যেভাবে অন্ধকার ফুঁড়ে দুই মূর্তি বেরিয়েছিলেন ঠিক নিমেষের মধ্যেই দুজনে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন |

                    শ্রীশ পাল

পুলিশ কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা করতে পারেনি | শ্রীশ চন্দ্র পাল আর রণেন গাঙ্গুলি দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে ছিলেন | ধরাই পড়েননি কেউ | এর পর আবার ১৯১৪ সালের ২৬শে আগস্ট শ্রীশ চন্দ্র পাল খবরের শিরোনামে | ওনার নেতৃত্বে আর নিখুঁত পরিকল্পনায় বিখ্যাত রডা কোম্পানির অস্ত্র ডাকাতি | কাস্টম হাউস থেকে সাতটা গরুর গাড়িতে বাক্স ভর্তি বন্দুক গুলি পিস্তল চাপিয়ে কোম্পানির গোডাউনে নিয়ে যাওয়ার সময় শেষ গাড়িতে দেশোয়ালি গাড়োয়ানের ছদ্মবেশে বিপ্লবী হরিদাস দত্তকে চালকের আসনে বসিয়ে দেন তিনি | বৌবাজারের কাছে শেষ গরুর গাড়িটা হটাৎ ভোজবাজির মতো কোথায় হারিয়ে গেলো | পঞ্চাশটা মাউসার পিস্তল আরপাঁচ লক্ষ বুলেট লুট করে শ্রীশ পাল পৌঁছে দিলেন যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি সমেত বাংলার সমস্ত গুপ্ত সংগঠনগুলোর হাতে | সে এক অন্য রোমহর্ষক কাহিনী | আরেক দিন বলা যাবে |

১৯১৬ সালে শ্রীশ চন্দ্র পাল পুলিশের হাতে ধরা পড়েন | ওনার বিরুদ্ধে নন্দলাল ব্যানার্জির হত্যাকাণ্ডের চার্জ গঠন করলেও সাক্ষীর অভাবে আদালতে সেটা প্রমান করা যায়নি | আজও লালবাজারের রেকর্ডে সেটা আনসল্ভড মার্ডার কেস হিসাবে লিপিবদ্ধ আছে | তবে রডা অস্ত্রলুন্ঠনের ঘটনায় প্রত্যক্ষ যোগের জন্যে ওনার দীর্ঘমেয়াদি সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয় | বিভিন্ন কারাগারে ঘোরানোর পর শেষ পর্যন্ত ওনার স্থায়ী ঠিকানা হয় হাজারীবাগ জেলে | তবে শারীরিক অসুস্থতার কারনে ১৯১৯ সালে শ্রীশ চন্দ্র পাল জেল থেকে ছাড়া পান | ১৯৩৯ সালের ১৩ই এপ্রিল মাত্র ৫১ বছর বয়সে কলকাতায় নিজের বাড়িতে কোনো অজানা রোগে বাংলার এই নির্ভীক সংগ্রামীর মৃত্যু হয় |

শ্রীশ চন্দ্র পাল, আমরা সত্যি বেইমান | ইতিহাস বইতে আপনার নাম লেখা নেই | কোলকাতার কোনো মেট্রো স্টেশন, কোনো রাস্তা, কোনো পার্ক বা কোনো স্মারকের জন্যে আপনার নাম প্রস্তাবিত হয়নি | রুপালি পর্দার বিপথগামী কোনো নায়কের জীবন কাহিনী নিয়েএদেশে বায়োপিক তৈরি হয় কিন্তু আপনাদের চরম রোমাঞ্চকর আর রোমহর্ষক কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো বই লেখা হয়না | জন্মদিন আর মৃত্যুদিনে কেউ আপনাকে স্মরণ করেনি | কিন্তু আজকে আপনাদের প্রচণ্ড প্রয়োজন ছিলো | ফিরে আসুন না একবার | কোমরে রিভালবার গুঁজে কোনো সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে থাকুন কোনো গলির মোড়ে | দেখবেন আজ শুধু একটা নন্দলাল না, জন সাধারণের মেকি প্রতিনিধি সেজে হাজার হাজার নন্দলাল ব্যানার্জিরা চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে | আর একবার গর্জে উঠুক আপনার হাতের পিস্তল ……

-আনন্দ চট্টোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।