বুকে বুলেট বিঁধল নির্মল সেনের, তবুও থামল না তার রিভলভার

বুকে বুলেট বিঁধল নির্মল সেনের, তবুও থামল না তার রিভলভার

আজ থেকে প্রায় ৮৮বছর আগের কথা। সেদিনও ছিল ১৩ই জুন। সাল ১৯৩২। ধলঘাটের নাম শুনেছেন? চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। কিন্তু স্বাধীনতার আগে এই গ্রামটিই ছিল বিপ্লবীদের তীর্থক্ষেত্র। বহু বিপ্লবীর জন্মস্থান এই ধলঘাট। আবার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রধান একটি ঘাঁটিও বটে। সেই ধলঘাটেই সাবিত্রীদেবীর বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন ও নির্মল সেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের পর দু’বছর কেটে গেছে। মাস্টারদা আর নির্মল সেন ছাড়া অভিযানের প্রথম সারির প্রায় সকল নেতাই কারারুদ্ধ। কিছুদিন আগে তাঁদের দ্বীপান্তরের আদেশও দিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু সংগঠনের প্রধান দুই নেতা তখনও অধরা। মাস্টারদা আর নির্মল সেন ক্রমাগত পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন; বদলাচ্ছেন তাঁদের গোপন আস্তানা। সরকার তাঁদের মাথার দাম ঘোষণা করেছে দশ হাজার টাকা। তবু তাঁদের সন্ধান পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। অন্যদিকে সংগঠনের কাজও থেমে নেই। যোগ দিয়েছে চট্টগ্রামের আরো অনেক তরুণ তুর্কি। তবে মাস্টারদা আর নির্মলদার সবচেয়ে বড় ভরসা তখন দুই কলেজ ছাত্রীর ওপর। কল্পনা দত্ত আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বোমা বানানো থেকে গোপনে বিপ্লবীদের সাংগঠনিক কাজকর্ম সামলানোতে ইতিমধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তাঁরা। তাই মাস্টারদা এবার তাঁদের পাঠাতে চান প্রত্যক্ষ ‘অ্যাকশন’-এ। সেই বিষয়েই আলোচনা করার জন্য ধলঘাটের ‘আশ্রম’-এ তিনি জুন মাসের এক সকালে ডেকে পাঠালেন প্রীতিলতা’কে। প্রীতি তখন কলেজের পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসেছেন চট্টগ্রামে। তখন তিনি নন্দন কানন গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। কিন্তু কল্পনা তখন পুলিশি সন্দেহের কারণে গৃহে অন্তরীন। প্রীতিলতা এলেন। সাবিত্রীদেবীর বাড়িতে তখন মাস্টারদা আর নির্মলদা ছাড়াও আত্মগোপন করে আছেন অপূর্ব সেন (ভোলা) আর মণিলাল দত্ত। পরিকল্পনা ছিল কিছুদিন সেখানে থেকে আলাপ আলোচনা শেষে ১৪ই জুন প্রীতি ফিরে যাবেন নিজের বাড়ি আর বাকিরা স্থানান্তরিত হবেন নতুন ঠিকানায়। কিন্তু নিয়তির মনে ছিল অন্য কিছু।

আরো পড়ুন:  হুগলির এই মন্দিরের অনুকরণে তৈরি হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির

১৩ই জুন রাত ন’টা। মাস্টারদা আর প্রীতিলতা নীচের তলায় খেতে বসেছেন। মণিলাল দত্ত কিছুক্ষণ আগে ফিরে গেছেন নিজের বাড়ি। আর নির্মল সেন আর ভোলা শুয়ে আছেন ওপরে। দুজনেরই শরীরটা ভালো নেই। সবেমাত্র মুখে খাবার তুলেছেন তাঁরা, বাইরে শোনা গেল অস্পষ্ট পায়ের আওয়াজ। পুলিশ! ওপরে উঠে এলেন মাস্টারদা। ডেকে তুললেন নির্মল সেন আর ভোলাকে। গোছাতে শুরু করলেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, টাকাপয়সা আর অস্ত্রশস্ত্র। নীচে প্রীতিলতাও হাতে বন্দুক নিয়ে তৈরী। পটিয়া থানার অফিসার-ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন কোনভাবে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানার খবর পেয়েছিলেন। সেই কারণেই পুরস্কার এবং পদোন্নতির আশা নিয়ে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন দুজন সাব-ইন্সপেক্টর, সাতজন সিপাহী, একজন হাবিলদার এবং দুজন কনষ্টেবল নিয়ে রাত প্রায় ৯টার দিকে ধলঘাটের ঐ বাড়িতে নিঃশব্দ আক্রমণ চালাতে উপস্থিত হন।

সাবিত্রীদেবী বিধবা মহিলা। ছেলে রামকৃষ্ণ আর মেয়ে স্নেহলতাকে নিয়ে একাই থাকেন এই টিনের ছাউনি দেওয়া কাঁচা মাটির দোতলা বাড়িতে। কিন্তু বিপ্লবীদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ‘মাসীমা’ তিনি। বহুকাল ধরেই গোপনে বিপ্লবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে চলেছেন তিনি। ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের নির্দেশে সে বাড়ির টিনের দরজা ঠেলে ঢুকলেন এস.আই. মনোরঞ্জন বোস। পেছনে একজন হাবিলদার। সাবিত্রী দেবী বাধা দেওয়ার সময়ও পেলেন না। নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন ক্যামেরন। কয়েক ধাপ উঠতেই ওপর থেকে ধেয়ে এল একের পর এক গুলি। গুলিবিদ্ধ ক্যামেরন গড়িয়ে পড়লেন সিঁড়ি দিয়ে। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হল তাঁর। গুলিগুলো ছুঁড়েছিলেন নির্মল সেন। তাঁর করা দুটো গুলিতেই প্রাণ হারান ক্যামেরন। ছুটে এলেন মনোরঞ্জন বোস। ওদিকে বাড়ির বাইরে চারদিক থেকে ঘিরে থাকা সিপাইরাও গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছে। নীচে থেকে প্রীতিলতা আর ওপর থেকে নির্মলদা, মাস্টারদা আর ভোলাও প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন। বাড়ির ভেতরে মনোরঞ্জন বোসের বন্দুকও চুপ নেই। আর এমন সময়েই ঘটল চূড়ান্ত অঘটন। দক্ষিণের জানালা দিয়ে একটা গুলি এসে সোজা বিঁধল নির্মল সেনের বুকে। তবু তাঁর বন্দুক থেমে রইল না। মাস্টারদা বুঝলেন তাঁর বহুকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী, বিপ্লবী কাজেকর্মে তাঁর ডান হাত এই মানুষটির ডাক এসে গেছে। তিনি চলে যাবেন অথচ সেই রক্তাপ্লুত অবস্থাতেও তিনি বারবার অনুরোধ করছেন মাস্টারদা যেন প্রীতিলতা আর ভোলাকে নিয়ে এখনি পালিয়ে যান। ততক্ষণ উনি পুলিশকে ঠেকিয়ে রাখবেন। মাস্টারদা তাঁর শেষ অনুরোধ মেনে নিলেন। প্রীতিলতার চূড়ান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাস্টারদা দুজনকে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু বাইরেও পুলিশ। অতএব পালাতে হবে ডোবার মধ্য দিয়ে। সেইভাবেই অন্ধকারে ডোবার মধ্যে সারা শরীর ডুবিয়ে পালাচ্ছিলেন তিনজন। তবু পুলিশের গুলিরও বিরাম নেই। হঠাৎই আমের শুকনো পাতায় পা পড়ার অস্পষ্ট আওয়াজ পেয়ে ডোবা লক্ষ্য করে গুলি চালালো পুলিশ। একটা গুলি এসে লাগল ভোলার গায়ে। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হল তাঁর। বিধ্বস্ত, ভগ্নহৃদয় মাস্টারদা আর প্রীতিলতা পালালেন অন্ধকারে।কচুরিপানা ভরা পুকুরে সাঁতার কেটে আর কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে পটিয়ার কাশীয়াইশ গ্রামে দলের কর্মী সারোয়াতলী স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র মনিলাল দত্তের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান তাঁরা। সেখান থেকে পৌঁছালেন জৈষ্ট্যপুরা গ্রামের গোপন ডেরা ‘কুটির’-এ। পুলিশ প্রায় সকাল অবধি অপেক্ষা করল ধলঘাটে। কিন্তু জীবিত ধরতে পারেনি কাউকে। শেষে সাবিত্রীদেবীকে বিপ্লবীদের আশ্রয়দানের অভিযোগে তাঁর পুত্র-কন্যা সহ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আর লুইস গানের গুলিবর্ষণে প্রায় ধ্বংস করে দেয় বাড়িটা। “চট্টগ্রামে সৈন্য ও বিপ্লবীদের সংঘর্ষ” শিরোনামে ধলঘাট সংঘর্ষের খবরটা ১৫ই জুন ১৯৩২ সালে দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ঃ
“এইমাত্র সংবাদ আসিয়াছে যে, গতরাত্রে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার নিকটে বিপ্লবী ও সৈন্যদের এক সংঘর্ষ হইয়া গিয়াছে। ফলে গুর্খা বাহিনীর ক্যাপ্টেন ক্যামেরন ও দুইজন বিপ্লবী নিহত হইয়াছেন। বিপ্লবীদের নিকট দুইটি রিভলবার ও গুলি ইত্যাদি পাওয়া গিয়াছে। নিহত বিপ্লবীদের একজনকে নির্মল সেন বলিয়া সনাক্ত করা হইয়াছে।”

আরো পড়ুন:  নেতাজির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সু কি’র বাবা বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা জেনারেল আং সান,ইতিহাস এভাবেই জুড়ে রেখেছে বাংলা আর বার্মাকে

ধলঘাটের সেই রাতের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিলেন প্রীতিলতা পাহাড়তলি ক্লাব আক্রমণ করে। তবে সেই ১৩ই জুন মাস্টারদা হারিয়েছিলেন তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বন্ধুকে। নির্মল সেন ছিলেন বিপ্লবীদের পিতৃসম। তাঁর স্নেহ, ত্যাগ, হাস্যরস, অতি কঠিন সময়েও বিপ্লবীদের দৃঢ় থাকতে অনুপ্রাণিত করত। তিনি ছিলেন দলের অস্ত্র সংগ্রহের মূল কারিগর। দলে যোগ দেওয়া নতুন ছেলেরা অনেকেই প্রথমে তাঁকেই মাস্টারদা ভেবে ভুল করত। চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের জন্ম হয়েছিল যে ক’জনের হাত ধরে, নির্মল সেন ছিলেন তাঁদের একজন। সেই মানুষটির মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল সংগঠনের ভিতকে। প্রীতিলতার মৃত্যুর পশ্চাতেও এই রাতের ঘটনার প্রভাব ছিল অনেকখানিই। সত্যি বলতে নির্মল সেনের মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলন আরো দু’বছর অব্যাহত থাকলেও আর সেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

আরো পড়ুন:  "তোমরা নিজের ভাষাকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ঠকে যাবে" ডি ভ্যালেরা বলেছিলেন সুশীল চৌধুরীকে

আজ ১৩ই জুন। বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেনের স্মরণে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই অমূল্য স্বাধীনতার মান যেন আমরা ভারতবাসী রাখতে পারি এই কামনা করি।

-শ্রেয়সী সেন

তথ্যসূত্র : Chittagong Armoury Raiders’ Reminiscences, by Kalpana Dutta
Do and Die : The Chittagong Uprising 1930-34, by Manini Chatterjee
উইকিপিডিয়া

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।