বাংলার প্রাচীন নৃত্যশিল্পের উৎস সন্ধানে

বাংলার প্রাচীন নৃত্যশিল্পের উৎস সন্ধানে

বাংলার প্রাচীন নৃত্যশিল্পের উৎস কোথায় রয়েছে লুকিয়ে ? সামাজিক-রাষ্ট্রিক বিপর্যয়ের ফলে সেই নৃত্য যদি লুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উৎস সন্ধানে আমাদের যেতে হবে কতদুর ! রাজনৈতিক , সামাজিক নানা উথান পতনের ভেতরে সংস্কৃতির যে ধারা থাকে চির প্রবাহমান , সেখানেই রয়েছে তার উৎস । প্রাচীন বাংলার সমাজ জীবনের ধর্মীয় বিশ্বাস , সংস্কার , রীতি পদ্ধতির বিশ্লেষণ থেকেই করতে হবে তার অনুসন্ধান ।

“বর্তমান কালে বাংলাদেশে প্রাচীন নৃত্যশিল্পের যে অভ্যুদয় দেখা যায় , তার সঙ্গে বাঙালির নৃত্যশিল্পসাধনার নিজস্বধারার কোনো যোগ নেই , একে পুণরুভ্যুত্থান বা revival বলা যায় না , কারণ এই নৃত্যচর্চা বাঙালি জাতির বিলুপ্ত একটি শিল্পের পুণঃপ্রতিষ্ঠা নয় , বরং একদিক থেকে দক্ষিণভারতীয় নৃত্যের অনুকরণ অন্যদিকে আধুনিক নৃত্যের নব-রূপায়ন । ” – প্রাচীন বাংলার নৃত্যশৈলীর স্বরূপ সন্ধানে এই মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতিবিদ শ্রদ্ধেয় আশুতোষ ভট্টাচার্য । আসলে মধ্যযুগে তুর্কী আক্রমণের বিপর্যয়ের সম্মুখে রাষ্ট্রের সহানুভূতি বঞ্চিত বাংলার যেসকল চারুকলা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল , বাংলার নৃত্যশিল্প ছিল তাদের অন্যতম । তুর্কী আক্রমণ বা মুসলমান বিজয়ের পর বাংলার কোনো কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে লোকনৃত্যের ধারা দীর্ঘকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলেও শিল্পসম্মত শাস্ত্রীয় নৃত্যের ধারা যে এগোচ্ছিল অবলুপ্তির পথে , তা অস্বীকৃত নয় ।

মনে রাখতে হবে , প্রত্যেক দেশেই ক্ষেত্রবিশেষে তার ঐতিহাসিক উপাদান হয় ভিন্ন । উড়িষ্যা থেকে আরম্ভ করে সমগ্র দক্ষিণভারত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যে যে অগণিত হিন্দু মন্দিরগুলো হাজার হাজার বছর ধরে আজও অক্ষত রয়েছে , তাতে উৎকীর্ণ মন্দিরগুলোর নৃত্যভঙ্গীমা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় ভারতীয় নৃত্যশিল্পের ক্রমবিকাশের ধারা এগোচ্ছিল কোন পথে । এই মন্দিরগুলোতে একসময় প্রত্যক্ষভাবে নৃত্যশিল্পের অনুশীলন যেমন হতো , তেমনি যুগ যুগ ধরে সেই নৃত্যচর্চা রাষ্ট্রের সহানুভূতি ও সহযোগিতা লাভ করে সমৃদ্ধ হয়েছিল । ফলে দুরাগত কাল থেকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণভারতীয় জনজীবনে নৃত্যের সংস্কার রয়েছে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে । শুধু দক্ষিণভারত কেন , ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুরেও সঙ্গীত-নৃত্যকলা সাংস্কৃতিক জনজীবনের সঙ্গে যেভাবে মিশে রয়েছে ; প্রত্যেক মহিলা নৃত্যবিদ্যায় পারদর্শী , প্রত্যেক পুরুষ পুং (মৃদঙ্গ) চালনায় দক্ষ , অধিকাংশ পুরুষ জানেন থাং তা (মার্শাল আর্ট) -র ক্রিয়া কৌশল – তাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বহু উত্থান পতনের ধাপ পেরিয়ে আজও সেই নৃত্যশৈলী সমাজদেহ থেকে যে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি তার প্রমাণ আমাদের সামনে স্পষ্ট ।

 

মনিপুরী মার্শ্যা্ল আর্ট থাংতা । ছবিঃ pinkzamazingmanipur.blogspot.com

 

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনুরূপ পরিবেশ ছিল কোথায় ? বাংলাদেশে বিধর্মী রাজশক্তির আক্রমণের সম্মুখে মন্দিরের ইঁট-পাথর শুধু যে ধ্বংস হয়েছে এমন নয় ,সেইসঙ্গে বিধ্বস্ত হয়েছে মন্দির সম্পর্কিত যে কোনোরকম সংস্কার বা জনশ্রুতি । তাই সমগ্র ভারতবর্ষের মন্দিরগুলোকে আশ্রয় করে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের যে বিকাশ তরান্বিত হয়েছে আধুনিক কাল পর্যন্ত , সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাচীন বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পের ইতিহাসের একটা সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া কতটা সহজসাধ্য হবে তা ভেবে দেখার বিষয় । আর সেকারণেই মনে হয় , এদেশে প্রাচীন নৃত্যশৈলীর ঐতিহ্যের ধারা কেবল ভাস্কর্য কিংবা স্থপতির নশ্বর কীর্তিতে নয় , অনুসন্ধান করতে হবে বাংলার সমাজজীবন সম্পর্কিত ধর্মীয় বিশ্বাস , সংস্কার , সামাজিক রীতি পদ্ধতির সন্ধানী বিশ্লেষণ থেকে । একই কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ লোকধর্মগুলির বিচার বিশ্লেষণ , আদিমকাল থেকে যার আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নৃত্যপ্রক্রিয়া রয়েছে গভীরভাবে জড়িত । একসময় আদিমসমাজে ধর্মীয় আচারমূলক অনুষ্ঠানের প্রথা হিসেবে ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া সংগঠনের জন্য নৃত্যের যে আবশ্যকতা দেখা দেয় ; নৃত্য সেখানে ধর্মীয় আচারমূলক অনুষ্ঠান ছাড়া তার বেশি কিছু নয় । কিন্তু ক্রমেই এই নৃত্যধারা তার ধর্মীয় সংস্কারের সংকীর্ণ বেড়াজাল পেরিয়ে উত্তীর্ণ হয় নান্দনিক শিল্পবোধে । মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণ সম্পর্কিত ওঝানৃত্যের কথাই যদি এখানে ধরি , লোকনৃত্যের মধ্যে ব্যাতিক্রমী এই এককনৃত্যটি আগে ওঝা বা পুরোহিত শ্রেনীর লোকদের মধ্যে ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়ানুষ্ঠানের অংশস্বরূপ ritual dance বা magical dance হিসেবে পরিচিত ছিল । এরা ঐন্দ্রজালিক নৃত্যের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ দ্বারা মেঘের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন বলে বিশ্বাস প্রচলিত ছিল জনমানসে । প্রাকৃতিক নানা ভেষজ উপাদান দ্বারা রোগ নিরাময়ের ক্ষমতাও এদের ছিল । পূর্ববাংলার পল্লী অঞ্চলে এদের পসার ছিল বিস্তৃত । এছাড়া ছোটনাগপুর এবং উড়িষ্যার উপজাতি অঞ্চলেও এই নৃত্যের প্রচলন ছিল বহুল । কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হলো , নৃত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আচারটি সমাজ থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরেও নৃত্যটি কিন্তু লুপ্ত হয়ে যায়নি । উপরোন্তু অনেকটা পরিবর্তন পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে এই ওঝানৃত্য ক্রমে হয়ে উঠল নান্দনিক শিল্পকলার এক অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ।

আরো পড়ুন:  প্রায় তিন'শ বছরের ইতিহাস সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পদুয়ার গুপ্ত এস্টেট জমিদারবাড়ি

এর থেকে ধারণা করা যেতে পারে এই নৃত্য একসময় রাষ্ট্রিক অনুমোদন লাভে সমর্থ হয়েছিল । মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলার নৃত্য-গীত চর্চার বর্ণনা থেকে এমনকি স্বয়ং মনসার নৃত্যগীত অভ্যাসের প্রসঙ্গ থেকেও বাঙালির আজন্ম সংস্কার সঞ্জাত নৃত্যচর্চার প্রমাণ এখানে দুর্লভ নয় । অটুট নিষ্ঠা , সংযম , লক্ষ্য , নিয়মানুবর্তিতার দ্বারা শাস্ত্র আধারিত নৃত্যচর্চার ঐতিহ্য যে তখন সমাজে প্রচলিত ছিল এবং তাতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা নৃত্যকালীন শিল্পীর তালভঙ্গ যে হতো সমাজে গুরুতর অপরাধ – দেবসভায় বেহুলার নৃত্য প্রদর্শনের বর্ননা থেকে এমন ধারনা অমূলক নয় । অতএব , এই সমস্ত নৃত্যের একটা স্বরূপ অনুমান করে মনে হয় না যে প্রাচীন সমাজে নৃত্যের প্রয়োজন শুধু ধর্মীয় প্রেরণাতেই সীমাবদ্ধ ছিল , অর্থাৎ শাস্ত্রীয় বিধি নির্দেশ দ্বারা গণ্ডীভুক্ত হয়ে শৈল্পিক বিনোদনের উপকরণ হিসেবেও নৃত্য চর্চিত হয়েছে সেই সমাজে । ‘ শাস্ত্র ’- শব্দটি যদি শাসন শব্দের সঙ্গে প্রযুক্ত হয় , তবে শাষক রাষ্ট্রশক্তির প্রসন্নতা ও অনুমোদন স্বীকৃতির জন্যও নৃত্যচর্চার আবশ্যকতা যে সেই সমাজে ছিল তা অস্বীকার করি কিভাবে !

 

কাছাড় বরাক উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ‘নৌকাপুজায়’ ওঝার নৃত্য । ছবিঃ পার্থ শীল, নিজস্ব সংগ্রহ

 

আসলে বাংলার প্রাচীন নৃত্যশৈলী সামাজিক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে সমাজের মধ্য থেকে যদি লুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকে , তবে তার উৎস সন্ধানে যেতে হবে আরো বহুদুর । প্রাচীন বহু সাহিত্য গ্রন্থাদি থেকে গৌড়বাংলার অধিবাসীদের নাট্যশাস্ত্র অনুমোদিত নৃত্যচর্চার পরিচয় পাওয়া গেলেও লোকসাধারণের সাংস্কৃতিক জীবিনের সঙ্গে সংযুক্ত , লোকমানসে সৃজিত ও লালিত যে নৃত্যধারা – তার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে সর্বাগ্রে । তথ্য প্রমাণের জন্য নির্ভর করতে হবে সেইসব লোক গৌণধর্মগুলির উপর , সমাজ ভাঙনের কালেও যার প্রবাহের গতি ছিল অব্যাহত । আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এই লোকধর্মগুলির মতোই তার সঙ্গে জড়িত নৃত্যগুলিও সমাজ বিপর্যয়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়নি কখনোই – বরং আত্মগোপন করে প্রবলভাবে অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল লৌকিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আড়ালে ।

আরো পড়ুন:  বাঙালির শৈশবের সেই মানুষগুলো আজ আর আসে না,কোথায় হারিয়ে গেল তারা

আদিম সমাজে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অন্যতম অঙ্গ ছিল যে নৃত্যগুলি- তাকে বলা হতো আচারনৃত্য । অনেক সময় দেখা যায় , নৃত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় আচারটি যতদিন না সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হয় ততদিন নৃত্যের প্রয়োজনীয়তা সেখানে বজায় থাকে , আবার অনেক সময় নৃত্যের সঙ্গে জড়িত বিশেষ আচারটি লুপ্ত হয়ে গেলেও নৃত্যটি লুপ্ত হয়ে যায় না । যেমন- পূর্বে ছৌ-নাচ পশ্চীম সীমান্ত বঙ্গের গাজনোৎসবেরই একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল । মুখোস ধারণ করে নৃত্য প্রদর্শন করার উদ্দেশ্য আনন্দ দান করা নয় ; কোনো ঐন্দ্রজালিক পদ্ধতিতে সমাজের মঙ্গল বিধান করা । কিন্তু ক্রমেই এই নৃত্যানুষ্ঠানটি গাজনের আচারমূলক অনুষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন আনন্দানুষ্ঠানে পরিণত হয় । ঠিক একইভাবে গাজন পরব উপলক্ষ্যে প্রচলিত নারীবর্জিত পুরুষদের চড়কনাচ একসময় আদিমসমাজে কতগুলো বীভৎস ও প্রাণহানিকর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল । কিন্তু ক্রমেই বীভৎস প্রথাগুলো লোপ পেয়ে বর্তমানে নৃত্যগীতে ভরপুর এক আনন্দময় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে । রণকৌশল প্রয়োগ করে নৃত্য প্রদর্শন করা হতো যে নৃত্যগুলো , যেমন – অঙ্গদানি নৃত্য , ঢাক বাজিয়ে নৃত্য , রাঁয়বেশে , পাইক নৃত্য , জারী নাচ প্রত্যেকটিই এখন স্বাধীন নৃত্যানুষ্ঠানে পরিণত ।

 

গাজন পরবে চড়কের ভক্ত্যা সন্ন্যাসীদের নৃত্য । ছবিঃ agephotostock.com

ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়ারই লৌকিক রূপান্তর যদি হয় মেয়েলি ব্রতগুলো , তবে আচারনৃত্যকে ব্রতনৃত্য বলতে বোধহয় বাধা নেই কোথাও । তফাৎ অবশ্যই আছে ; ঐন্দ্রজালিক নৃত্যগুলির মধ্যে একধরণের রহস্যময়তা আছে , ওঝা বা পুরোহিত শ্রেণীর ব্যাক্তির দ্বারা তা গোপনে অনুষ্ঠিত হয় । কিন্তু মেয়েলি ব্রতনৃত্যের মধ্যে গোপনীয়তা বা mysticism কিছুই থাকে না – প্রকাশ্যে সেই নৃত্য অনুষ্ঠিত হয় । ব্রত একটি সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠান বলে নৃত্যে সমাজের যে কোনো স্তরের এক বা একাধিক মহিলা তাতে অংশগ্রহন করে থাকেন । পূর্ববাংলায় এবং কাছাড়ের প্রান্তিক অঞ্চল বরাক উপত্যকায় সূর্যব্রত বা ঠাকুরব্রত উপলক্ষ্যে বাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে একাধিক মহিলাদের দ্বারা বৃত্তাকারে অনুষ্ঠিত ধামাইলনৃত্য যাকে ব্রতনৃত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায় অনায়াসেই । যদিও এই ব্রতটিকে খাঁটি মেয়েলি ব্রত বলা যায় না , ব্রাহ্মণ পুরোহিত ব্যাক্তির উপস্থিতিতে আর্যীকরণের প্রভাব এতে স্পষ্ট । কিন্তু অবাক হতে হয় যখন দেখি এই শাস্ত্রীয় রীতি-পদ্ধতির পাশেই মহিলাদের একত্রিত হয়ে বড় বড় করতাল বাজিয়ে নৃত্যগীতের সঙ্গে দ্রুত পদচারণা ও করতালি কোথাও যেন ব্রাহ্মণ্য পুরোহিততন্ত্রকে ছাপিয়ে ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’-কে মুখ্য করে তোলে । সমাজের দুটোস্রোতকেই আমরা এখানে একসাথে পাশাপাশি দেখতে পাই ; পুরোহিত ব্রাহ্মণ্য শাষিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং শ্রেণী বৈষম্যহীন শাস্ত্রধর্ম বহির্ভূত মহিলা সমাজ , যারা নিজেদের ধর্মসাধনায় পৌরোহিত্য করেন নিজেরাই । ধর্মীয় সাধনাই ঈশ্বরের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরির জন্য কোনো মধ্যপন্থা , কোনো বৈদিক মন্ত্র বা কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিত ব্যাক্তির উপর তারা নির্ভরশীল নন । নিজেরাই নৃত্যগীতের মাধ্যমে আনন্দানুষ্ঠানটিকে পূর্ণতার মাত্রায় পৌঁছে দেন । খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলিতে যেমন তার ছড়ায় , আল্পনায় একটা জাতির মনের , চিন্তার সুস্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায় – সূর্যব্রতের সঙ্গে জড়িত গান , নৃত্য এবং চিত্রকলা থেকেও বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের উদ্যম উৎসাহের একটা স্পষ্ট রূপ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । সূর্যব্রত ছাড়া যশোর অঞ্চলের শীতলাব্রতের নাচ , বীরভূম ,পুরুলিয়া , বাঁকুড়া , পশ্চিম বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চলের ভাদুনাচ , বর্ধমান জেলার ভাঁজো ব্রতের নাচ প্রভৃতি ব্রতনৃত্যের নিদর্শন । পূর্ববাংলার মাঘমণ্ডল ব্রতটিও একটি সম্পূর্ণ লোকনৃত্যানুষ্ঠান ।

আরো পড়ুন:  প্রয়াত হলেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানের কিংবদন্তি শিক্ষক জীবেশ গুহ,রয়ে গেল ছাত্রছাত্রীদের জন্যে তাঁর অসামান্য সৃষ্টি

 

আজ থেকে প্রায় ৫০/৫৫ বছর আগে শ্রীহট্ট-কাছাড়ের জনপ্রিয় মাঘমণ্ডল ব্রতের একটি ছবি , রয়েছেন দুই ব্রতিনী । ছবিঃ নিজস্ব সংগ্রহ

 

শ্রীহট্ট কাছাড়ের ধামাইল নৃত্য । ছবিঃ নিজস্ব সংগ্রহ থেকে

 

অতএব , বাংলার প্রাচীন নৃত্যশৈলীর উৎস অনুসন্ধান করতে হবে বিশাল গ্রামীণ জনজীবনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে । যদিও সীমিত কিছু নৃত্য ছাড়া অধিকাংশ নৃত্যের উল্লেখ পর্যন্ত আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে । যেমন – শিকার নৃত্য , যুদ্ধ নৃত্য , নবান্ন উৎসবের নৃত্য , মুখোশ ধারন করে নৃত্য এবং আরও অনেক । কিন্তু কোনো নৃত্যই যেমন ধর্মীয় লোকনৃত্য নয় , তেমনি ধর্মীয় প্রভাবমুক্তও নয় । এই ধর্ম অবশ্যই মানবধর্ম । তবু ব্রতকেন্দ্রীক নৃত্যগুলোকে আলোচনার বিষয় করে তোলা হলো এই কারণে , ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় জীবনের ইতিহাসে দীর্ঘ বছর ধরে ক্ষমতার অধিকার , লুন্ঠন , নরহত্যা , শঠতা আর বহু উত্থান-পতনের মধ্যে মানুষকে যা বেঁচে থাকার প্রেরনা যুগিয়েছে তা হলো এই লোকধর্মানুষ্ঠানগুলি । তাছাড়া এই ব্রতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আরো একটি প্রসঙ্গে – যে কারণে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে নৃত্যে নারীর অধিকার লুপ্ত হয়ে যায় অথচ বেঁচে থাকে পল্লী গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে । এইসব ধর্মকেন্দ্রীক লোকাচার অনুষ্ঠানের আচ্ছাদনেই মানুষ সমন্বয়ের ভেতর দিয়ে করেছে গণ-মানসের আরাধ্য দেবতার আরাধনা । নৃত্য সেখান সংযোজন করেছে মুক্তির আস্বাদ । মুক্তি – ধর্ম কলহ থেকে ; মুক্তি – সবধরনের ক্রূড়তা , লোভ , হিংস্রতা থেকে ; মুক্তি – ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে , মুক্তি ভক্ত সাধকের সঙ্গে ভগবানের একাত্মতার চরমতম মুহুর্তে । শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে এমন অসংখ্য ব্রতানুষ্ঠান এবং তার সঙ্গে জড়িত নৃত্যশৈলী রয়েছে এখনো অনাবিষ্কৃত , যা সামাজিক দুর্যোগের কালেও সমাজের বহুনীচে , তলদেশে আত্মগোপন করে সমাজের উঁচু শাখা-প্রশাখাগুলো্কে করেছে প্রাণরসে উজ্জীবিত । বাংলার প্রাচীন নৃত্যশৈলীর উৎস আলোচনায় যার গুরুত্ব অপরিসীম । আমরা রইলাম তাকিয়ে ভূ-গর্ভস্থিত সেই সমস্ত লোকধর্ম ও নৃত্যানুষ্ঠানগুলি যেদিন অন্ধকার ভেদ করে উজ্জ্বল সূর্যালোকে আবিষ্কৃত হবে সেই অপেক্ষায় ।

– মঞ্জরী ভট্টাচার্য

তথ্যসূত্র – ১। বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য ।

২। বঙ্গীয় লোকসঙ্গীত রত্নাকর , আশুতোষ ভট্টাচার্য ।

৩। গ্রামীণ নৃত্যকলা , মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য ।

ফিচার ইমেজ : TravelTourGuru

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।