আধুনিক পোশাক, শিক্ষা, প্রতিবাদে উজ্জ্বল ছিলেন ঠাকুরবাড়ির নারীরা

আধুনিক পোশাক, শিক্ষা, প্রতিবাদে উজ্জ্বল ছিলেন ঠাকুরবাড়ির নারীরা

দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর… ঠাকুরবাড়ির পুরুষ মানেই প্রতিভার বিস্ফোরণ। পুরুষদের প্রতিভার কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কম যেতেন না ঠাকুরবাড়ির নারীরাও। নিজ নিজ গুণে তাঁরাও কম ব্যক্তিত্বময়ী, প্রতিবাদী, গুণী, বিদ্রোহী, সাহসী ছিলেন না। তবে পুরুষদের আলোর তেজের সামনে অন্দরমহলের প্রতিভার আলো অনেক সময় চাপা পড়ে যেত। জানবেন নাকি সেই সব মহীয়সীদের অজানা কাহিনী।

প্রথমেই আসি জ্ঞানদানন্দিনীর কথায়। মাত্র সাত বছর বয়সে মোমের পুতুলের মতো জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন আর স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ আদর করে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘জ্ঞেনুমনি’। এই ছোট্ট মেয়েটাই কিন্তু পরবর্তীকালে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে ফটোগ্রাফার নিয়ে আসার মত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তাই নয়, ঠাকুরবাড়িতে জন্মদিন পালনের রেওয়াজও তিনিই শুরু করেন। মেয়েদের স্বাধীনতা তিনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন। স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে সর্বদা উজ্জীবিত করতেন। বিদেশে গিয়ে মেয়েদের স্বাধীনতা দেখছেন তিনি আর স্ত্রীকে একের পর এক চিঠি লিখে উৎসাহিত করেন তিনি। বলেছিলেন, ‘আমার ইচ্ছা তুমি আমাদের স্ত্রীলোকের দৃষ্টান্তস্বরূপ হইবে। কিন্তু তোমার আপনার উপরই তাহার অনেক নির্ভর।’ জ্ঞানদানন্দিনী স্বামীর ইচ্ছেকে সন্মানিত করতে পেরেছিলেন। প্রথমে দেওর হেমেন্দ্রনাথ আর তারপরে ব্রাহ্মসমাজের আচার্য অযোধ্যানাথ পাকড়াশির কাছে লেখাপড়া শিখে নতুন সাধনা শুরু করেন। তবে এর জন্য তাঁকে অনেক লড়াই প্রায় একাই লড়তে হয়েছে। শাশুড়িসহ অন্দরমহলের অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে। জ্ঞানদানন্দিনী বাঙালি মেয়েদের আধুনিক পোশাকও প্রচলন করলেন। প্রথমে ফরাসি দোকানে ফরমাশ দিয়ে ওরিয়েন্টাল ড্রেস বানানো হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে রুচিশোভন পার্শি স্টাইলের শাড়ি পরে বোম্বাইয়ে দুই বছর কাটিয়ে যখন জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুরবাড়ি ফিরেছিলেন, বাড়ির কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলত না। কিন্তু হাল ছাড়েননি জ্ঞানদানন্দিনী। এতটাই মনের জোর ছিল তাঁর। একবার সত্যেন্দ্রনাথের অসুস্থতার সময় লাটভবনে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে একাই গিয়েছিলেন। এছাড়া ছোটোদের পত্রিকা প্রকাশ থেকে শুরু করে নাটক অভিনয়— সবেতেই ছিল তাঁর দক্ষ হাতের ছোঁয়া।

আরো পড়ুন:  পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট,মৃত্যুর পর দেহ পাঠানো হয়নি মর্গে

ঠাকুরবাড়ির অভিমানী বধূ ছিলেন কাদম্বরী। সেই আমলে স্বামীর সঙ্গে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যাওয়ার স্পর্ধা তিনিও দেখিয়েছিলেন। তাছাড়া তেতলার ছাদে নন্দনকাননের মতো সাহিত্য আসর বসানোর পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।

আরেকজন হলেন স্বয়ং দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবী। অসাধারণ রূপ থাকলেও সেই রূপকে ছাপিয়ে যায় তাঁর নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব। একটা সময় ছিল, যখন দ্বারকানাথের সঙ্গেই শুদ্ধাচার মেনে গৃহদেবতার সেবা করতেন। তারপর দ্বারকানাথের বিলাসিতা সে শুদ্ধাচার অতিক্রম করে। দ্বারকানাথের ভোজসভায় মদ মাংসের বাহুল্য ছিল বলার মত। দিগম্বরী প্রথমে এই কথা বিশ্বাস করেননি। তারপর একদিন অন্দরমহল থেকে বৈঠকখানা বাড়িতে এসে স্বচক্ষে দেখলেন স্বামীর পরিবর্তন। তারপরেই শুধুমাত্র কর্তব্য পালন ছাড়া স্বামীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চললেন দিগম্বরী। শুধু ভোরে স্বামীকে প্রণাম করতেন। স্বপাক আহার ধরলেন।সেই আমলে মেয়েরা যখন একাদশীতে মাছের টুকরো হলেও মুখে দিত, দিগম্বরী চারটি একাদশী উপবাসী থাকতেন। অন্য একাদশীতে সামান্য ফলমূল খেয়ে বলতেন, তাঁর এই উপবাসে স্বামীর কোনো ক্ষতি হবে না। কোনো প্রয়োজনে স্বামীর সঙ্গে দেখা করলে সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে শুদ্ধ হতেন। বলা বাহুল্য, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এত মনের জোর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জোরেই পেয়েছেন।

আরো পড়ুন:  একসময় দুই বাংলার মধ্যে চলত বিজয়া দশমীর কুশল বিনিময়,নিরাপত্তার কড়াকড়িতে হারিয়েছে ইছামতিতে বিসর্জনের ঐতিহ্য

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে স্বর্ণকুমারী আবার দিব্যি লিখে ফেলেছিলেন অসংখ্য গল্প, উপন্যাস  যখন তাঁর লেখা উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশিত হয়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভেবেছিলেন, এ লেখা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। নিজের লেখার অনুবাদও করেছিলেন তিনি। তাঁর ‘সখি সমিতি’ নারীকল্যাণমূলক কাজ করত। সেই আমলে মেয়েদের নিয়ে কাজ করাও কিন্তু মুখের কথা নয়।

আরো পড়ুন:  সিংহাসনে বসার জন্য কোরান ছুঁয়ে মিথ্যা শপথ করতে একটুও দ্বিধাবোধ করেনি মীরজাফর

স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে সরলাদেবীরও ছিলেন বিদূষী তো বটেই, স্পষ্টবক্তাও। সেই আমলে কলকাতায় যুবক সভায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছে তাঁর নানা বিষয়ে। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রেখেছিলেন। ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে উৎসব করার আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়। সরলা দেবী যেভাবে পরিবারের খ্যাতিমান পুরুষের মতের বিরোধিতা করার মতো স্পর্ধা দেখাতে পেরেছিলেন, তাতে তিনি বিদ্রোহিনী তো বটেই। স্বামী বিবেকানন্দ এবং নিবেদিতার কাছের মানুষ ছিলেন সরলাদেবী। হিন্দুস্থান পত্রিকার দায়িত্ব সামলাতেন। মহাত্মা গান্ধীরও খুব কাছের ছিলেন সরলাদেবী। সবিমিলিয়ে সরলাদেবী ছিলেন ঠাকুরবাড়ির তেজস্বিনী মেয়ে।

আবার দেবেন্দ্রনাথের মেয়ে শরৎকুমারীর সন্তান সুপ্রভা। বিয়ের পর তিনি পৌত্তলিক গুরুর কাছে মন্ত্রগ্রহণ করেছিলেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে শিবপুজোও করতেন। শুধু তাই নয়। মূর্তি পুজো করার পরও সুপ্রভা জোড়াসাঁকোয় আসা যাওয়া দিব্যি বজায় রেখেছিলেন। ব্রাহ্ম সংস্কার ভেঙেছেন বলে এতটুকু অপ্রতিভ হননি। এও যে একরকমের বিদ্রোহ।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।