মাহেশের রথযাত্রার সঙ্গে ছড়ানো ছিটানো গির্জা……বয়ে যাওয়া সময়ের গল্প বলে শ্রীরামপুর

মাহেশের রথযাত্রার সঙ্গে ছড়ানো ছিটানো গির্জা……বয়ে যাওয়া সময়ের গল্প বলে শ্রীরামপুর

পুরীর রথের কথা তো আমরা সবাই জানি। পুরীর রথ, রথযাত্রা, রথের কাঠামো আর এই নিয়ে নানা পুরাকাহিনী সবই জগৎ। তবে পুরীর রথযাত্রার পর সবচেয়ে প্রাচীন রথযাত্রা কোনটি জানেন? আমাদের বাংলাতেই খুব কাছেই হয় সেই উৎসব। সে হল শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা। ইতিহাসের বিচারে মাহেশের উৎসব বাংলার সবথেকে পুরোনো আর পুরীর পরে ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীন রথযাত্রা। তবে মাহেশের রথ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র হিসাবেও এই জনপদটির যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। যেমন, উইলিয়াম কেরি এবং তাঁর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস ছাড়া তো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে ভাবাই যায় না। এর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রথম আধুনিক লাইব্রেরি, প্রথম কাগজকল আর দ্বিতীয় কলেজও তৈরি হয়েছিল এই শ্রীরামপুরেই। এছাড়া ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার বণিকদের কুঠি গড়ে উঠেছিল এখানে।

এই শ্রীরামপুর নামটা কোথা থেকে এল, তার সঠিক মীমাংসা এখনো হয়নি। তবে প্রাচীন গ্রন্থে কিন্তু এই জায়গার উল্লেখ মেলে। সম্রাট শাহজাহানের আমলে আবদুল হামিদ লাহোরি তাঁর ‘বাদশাহনামা’ বইতে শ্রীপুরকে উল্লেখ করেছিলেন শ্রীরামপুর হিসেবে। আবার মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে লেখা আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’-তে বলা আছে যে এখানকার শ্রীপুরে রাজা মানসিংহ তাঁর শিবির বসিয়েছিলেন। শ্রীরামপুর অঞ্চলের আকনা আর মাহেশ এই দুটো জায়গার উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫ শতকে লেখা বিপ্রদাস পিপিলাই-এর লেখা ‘মনসাবিজয়’ কাব্যে। এটি মনসামঙ্গল ধারার একটি সাহিত্য। চৈতন্যদেবের সময়ে লেখা একটি পুঁথিতেও পাওয়া যায় চাতরার নাম। শেওড়াফুলির রাজা মনোহরচন্দ্র রায় ১৭৫২ সালে একটি রামসীতার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীপুরে। তাঁর ছেলে রামচন্দ্র শ্রীপুর, গোপীনাথপুর আর মনোহরপুর – এই তিনটে মৌজা দেবসেবার জন্য দেবোত্তর করে দেন কয়েকজন ব্রাহ্মণের নামে। এই শ্রীপুর কিংবা রামসীতার মন্দির থেকে গোটা অঞ্চলটির নাম শ্রীরামপুর হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তবে নামকরণ যেখান থেকেই হোক না কেন এই জনপদটির প্রাচীনতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহের অবকাশই নেই।

আরো পড়ুন:  ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঝুলন্ত ফাঁসির দড়িকে চুম্বন করেছিলেন আসফাক উল্লাহ খান

আবার জানা যায়, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে দিনেমার কোম্পানি সোয়েটম্যান নামের এক প্রতিনিধিকে নবাব আলিবর্দি খাঁর কাছে পাঠিয়েছিল বাংলায় বাণিজ্য করার অনুমতি পাওয়ার জন্য। সোয়েটম্যান ১৭৫৫ সালে শ্রীপুরে তিন বিঘে আর আকনায় সাতান্ন বিঘে জমি কিনে তাঁদের কুঠি বসান। তারপর শেওড়াফুলির জমিদারের থেকেও দিনেমার বণিকরা খাজনার বিনিময়ে অধিগ্রহণ করেন আরও কিছু জমি। ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম ফ্রেডরিকের নাম অনুসারে জায়গাটার নাম দেওয়া হয় ফ্রেডরিক্সনগর। দিনেমারদের উদ্যোগে এই ফ্রেডরিক্সনগর গড়ে উঠতে থাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে। পরে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর শহরটার নাম নাকি হয় শ্রীরামপুর। এখানে মাহেশের রথযাত্রা যেমন বিখ্যাত, ঠিক তেমনই থমকে যাওয়া পুরনো সময়ের গল্প বলে এখানকার চার্চগুলো।

এমনই এক চার্চ বা গির্জা হল সেন্ট ওলাভস চার্চ। ১৭৫৫ সাল থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে দিনেমারেরা বেশ কিছু স্থাপত্য গড়ে তুলেছিলেন ফ্রেডরিক্সনগর বা শ্রীরামপুরে। সাউথ গেট, ড্যানিশ ট্যাভার্ন ইত্যাদির সঙ্গে সেন্ট ওলাভ’স চার্চও দিনেমার যুগের সাক্ষ্য বহন করছে। ১৭৭৬ সালে ফ্রেডরিক্সনগরের গভর্নর হিসেবে ডেনমার্ক থেকে আসেন কর্নেল ওলাভ বা ওলি বি। খ্রিস্টানদের জন্য নতুন চার্চ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে চাঁদা তোলা শুরু করেন তিনি। চাঁদা এসেছিল ফ্রেডরিক্সনগর থেকে, কলকাতা থেকে, এমনকি সুদূর কোপেনহেগেন থেকেও। ১৮০০ সালে ওলি বি-র উদ্যোগে একটি লুথারান গির্জা তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ গির্জাটি দেখে যেতে পারেননি। ১৮০৫ সালে যখন তাঁর মৃত্যু হয়, তখন গির্জার টাওয়ার আর সামনের অংশটা গড়ে উঠেছে। ওলি বি-র উত্তরসূরী ক্যাপ্টেন ক্রেফটিং তারপর গির্জা নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। গির্জা তৈরির কাজ শেষ হয় ১৮০৬ সালে। নরওয়ের সেন্ট ওলাভের নামে এই গির্জার নামকরণ হয়, যাঁর সঙ্গে ওলি বি-র নামের সাদৃশ্য ছিল। গির্জার চূড়ায় যে ঘড়ি বসানো আছে, তা গঙ্গার ওপারে ব্যারাকপুর থেকেও দেখা যায়।

আরো পড়ুন:  হাওড়া স্টেশনে বসে সিগারেটের প্যাকেটের পিছনে ‘কফি হাউজ’ গানের শেষ লাইনগুলি লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

তবে এই চার্চ কিন্তু একসময় বন্ধ হয়ে গেছিল। আসলে ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রেডরিক্সনগর কিনে নেয়। সেন্ট ওলাভ’স চার্চের দায়িত্ব নেন বিশপ অফ ক্যালকাটা। অনেক পরে শ্রীরামপুর কলেজ কর্তৃপক্ষ গির্জাটি তত্ত্বাবধানের ভার নিজের হাতে তুলে নেয়। এদিকে ধীরে ধীরে এই চার্চ জীর্ণ হতে শুরু করেছিল। ছাদের কড়িকাঠ, জানলা-দরজা, দেওয়ালের পলেস্তারা, আসবাব ক্ষয় পেতে থাকে। ২০১১ সালে বিপজ্জনক ঘোষণা করে চার্চটিকে বন্ধ করে দেয় শ্রীরামপুর কলেজ। তবে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ডেনমার্কের সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার শ্রীরামপুরের দিনেমার স্থাপত্যগুলির মূল কাঠামো বজায় রেখে সংস্কার আরম্ভ করেছিল। তারই অঙ্গ হিসেবে সেন্ট ওলাভ’স চার্চ মেরামতি শুরু হয়। আবার স্বমহিমায় ফিরে আসে এই গির্জা। এমনকি সংস্কারের পর সেন্ট ওলাভ গির্জা ইউনেস্কোর থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক সম্মান অর্জন করে।

আরো পড়ুন:  ব্যরিস্টার রাসবিহারী ঘোষই ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অন্যতম কারিগর

এছাড়া এখানে আছে জননগর ব্যাপটিস্ট চার্চ। ১৮০০ সালে হুগলি নদীর তীরে উইলিয়াম কেরি এই চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। জোশুয়া মার্শম্যান যুক্ত ছিলেন এই গির্জার সঙ্গে। এই গির্জার বিশেষত্ব হল, এর একটি অংশে ছাপাখানা ছিল। পণ্ডিতদের সাহায্য নিয়ে বাংলা, সংস্কৃত, ওড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি এবং অসমীয়া ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন উইলিয়াম কেরি। লিখেছিলেন বাংলা ব্যাকরণ এবং বাংলা অভিধান। ১৮২২ সালে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের উদ্যোগে গড়ে ওঠে জননগর চার্চ।

এছাড়াও শ্রীরামপুরে আছে ইমাকুলেট কনসেপশন অফ দ্য ব্লেসড ভার্জিন মেরি চার্চ বা ক্যাথলিক গির্জা। ১৭৬৪ সালে এটির যাত্রা শুরু হয়, তবে এর সমন্ধে খুব বিষদে জানা যায়নি। মাহেশের রথ থেকে ছড়িয়ে থাকা গির্জাগুলো, প্রাচীন এই জনপদটিতে সত্যিই যেন থমকে যাওয়া সময়রা গল্প বলে। দেখার চোখ আর শোনার কান থাকলেই সেইসব গল্প জানা যাবে।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।