রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সত্যজিৎ রায়,গয়না বড়িতে মজেছিলেন সবাই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সত্যজিৎ রায়,গয়না বড়িতে মজেছিলেন সবাই

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত আগন্তুক সিনেমা | এই সিনেমার এক জায়গায় আগন্তুককে দেওয়া হয় একটি বিশেষ খাবার | খাবারটি দেখে চমকে গেলেন আগন্তুক-ও | কি সেই খাবার ? সেই খাবারটি ছিল গয়না বড়ি | এটি বিউলির ডাল, পোস্ত ও বিভিন্ন ধরনের মশলার মিশ্রণে প্রস্তুত এবং গহনার মত সূক্ষ্ম নকশা সমন্নিত অতি দৃষ্টিনন্দন একপ্রকার বড়িবিশেষ | পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাড়ির মহিলারা বাড়িতেই প্রস্তুত করে থাকেন এই গয়না বড়ি | সত্যজিৎ রায়ের অত্যন্ত প্রিয় ছিল এই গয়নাবড়ি |

গয়না বড়িতে মুগ্ধ ছিলেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯৩০ সালে সেবা মাইতি নামে শান্তিনিকেতনের এক ছাত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তার মা হিরন্ময়ী দেবী ও ঠাকুমা শরতকুমারী দেবীর তৈরী গয়না বড়ি উপহার দেন। রবীন্দ্রনাথ গয়না বড়ির শিল্পকলা দেখে এতটাই আকৃষ্ট হন যে তিনি গয়না বড়িগুলির আলোকচিত্র শান্তিনিকতনের কলা ভবনে সংরক্ষণ করার অনুমতি চেয়ে হিরণ্ময়ী দেবী ও শরতকুমারী দেবীকে চিঠি লেখেন। এর ফলে গয়না বড়ি চারুকলার নিদর্শন হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গহনা বড়িকে শিল্প বলেই মনে করতেন, তাকে রান্না করা বা খাওয়াকে শিল্পকর্ম ধ্বংসের সামিল বলে মনে করতেন | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একদা বলেছিলেন, গয়না বড়ি শুধুমাত্র দেখার জন্য, খাওয়ার জন্য নয়। তিনি গয়না বড়ির শিল্পকর্মের সাথে মধ্য এশিয়ার খোটানে আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্বের শিল্পকর্মের সাদৃশ্য খুঁজে পান এবং গয়না বড়ির প্রদর্শনীর যথাযথ ব্যবস্থা করেন | নন্দলাল বসু গয়না বড়িকে বাংলা মায়ের গয়নার বাক্সের একটি রত্ন বলে বর্ণনা করেন।

আরো পড়ুন:  কলকাতা হাইকোর্টের সামনে ক্ষুদিরাম বসুর মূর্তির স্রষ্টা তিনি,আমরা কি মনে রেখেছি তাপস দত্তকে?

গয়না বড়ির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আগমনের আগে গয়না বড়ি প্রস্তুতিতে পোস্তর প্রচলন ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের পরে, ব্রিটিশরা বেআইনি আফিমের এক বিশাল বাজার আবিষ্কার করে চীনে। ব্রিটিশরা তখন বাংলার রাঢ় অঞ্চলের চাষীদের পোস্ত চাষে বাধ্য করে এবং তার থেকে বিপুল পরিমাণ আফিম নিষ্কাশন করে তা চীনে পাচার করতে শুরু করে। আফিম নিষ্কাশনের পর পোস্তর বীজ ফেলে দেওয়া হত। ক্রমে পোস্তর বীজ বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার রান্নার উপাদান হয়ে ওঠে। মেদিনীপুরে গয়না বড়িতে পোস্ত দানার ব্যবহার শুরু হয়।

কি ভাবে তৈরী করা হয় এই গয়না বড়ি ?

গয়না বড়ির মূল উপকরণ বিউলি ডাল ও পোস্ত | এছাড়া লাগে সামান্য তেল। রঙীন বা মশলাদার বড়ির জন্য প্রয়োজন বাড়তি উপকরণ। গয়না বড়ি সাধারণতঃ কাঁসার থালায় দেওয়া হয়। বড়ি দেওয়ার জন্য লাগে একটি মাঝারি আকারের রুমালের মত একটুকরো মোটা কাপড়, যার মাঝখানে থাকে একটি বৃত্তাকার ছিদ্র | এই কাপড়কে পুঁটলি বলা হয়। কোনো কোনো জায়গায় ওই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয় একটি ধাতব চোঙ যাকে বলা হয় চোঙপুঁটুলী।

গয়না বড়ি তৈরী হয় শীতকালে। কার্তিক মাসের পোড়া অষ্টমীর দিন বড়ি দেওয়ার শুভ সূচনা হয়। বড়ি দেওয়ার দিন বাড়ির মহিলারার স্নান করে, পরিষ্কার কাচা কাপড় পরে শুদ্ধ হয়ে গয়না বড়ির প্রস্তুতিতে হাত দেন। বড়ি দেওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় ভাঙা বিউলির ডালকে জলে ভেজাতে দেওয়া হয়। সারা রাত জলে ভেজার পর বিউলির ডাল ফুলে ওঠে। পরের দিন ভোরবেলা বিরিকলাইগুলো ধুয়ে তার থেকে খোসাগুলো ছাড়িয়ে ফেলে দেওয়া হয় যাতে বড়ি কালো না হয়ে যায়। তারপরে বিউলির ডাল শিলনোড়ায় মিহি করে বাঁটা হয়। এরপর বাঁটা বিউলির ডালকে একটা বড় গামলায় ফেটাতে হয় । যত বেশি এবং যত ভালো ফেটানো হবে বড়ি তত মুচমুচে ও সুস্বাদু হবে।

আরো পড়ুন:  বিশ্বযুদ্ধের বাতিল মালপত্র দিয়ে গবেষণা,তিনিই পদার্থবিদ্যায় বাংলার প্রথম মহিলা ডক্টরেট

এরপর একটি কাপড় তেলে ভিজিয়ে সেই কাপড় আলতো করে বুলিয়ে নেওয়া হয় কাঁসার থালার উপর | তারপর থালার উপর বিছিয়ে দেওয়া হয় পোস্তর একটি আস্তরণ । এবার বড়ি দেওয়ার পালা। যিনি বড়ি দেন তার এক হাতে থাকে পুঁটলি ও আর এক হাতে কাঠি। তিনি পুঁটলিতে একটু করে লেই নিয়ে হাতের চাপে পুঁটলির ছিদ্র দিয়ে লেইয়ের একটি সরু ধারা নিঃসরণ করান। তারপর শৈল্পিক দক্ষতায় কাঁসার থালার উপর সৃষ্টি করেন অপূর্ব নকশা সমন্বিত বড়ি। এক একটি বড়ির প্যাঁচ শেষ হয়ে গেলে লেইয়ের ধারাটিকে অন্য হাতে ধরা কাঠি দিয়ে কেটে পরের বড়িটি দেওয়া শুরু করেন। এটি অত্যন্ত দক্ষ হাতে করতে হয় যাতে বড়ি দেওয়া হয়ে গেলে বোঝা না যায় বড়ির প্যাঁচের শুরু আর শেষটা কোথায়। বড়ি দেওয়ার সময় নকশায় সামান্য ত্রুটি হয়ে গেলে বা রেখা জুড়ে গেলে তা কাঠি দিয়ে ঠিক করে দেওয়া হয়। রঙীন বড়ির ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা রঙের জন্য পৃথক পাত্রে লেই প্রস্তুত করা হয় এবং প্রত্যেক রঙের জন্য পৃথক পুঁটলি ব্যবহার করা হয়।

আরো পড়ুন:  চায়ে চুমুক দিয়ে মুগ্ধ নেতাজি বললেন,তোকে আশীর্বাদ দিলাম ভুলু একদিন তোর বোস কেবিনের সুনাম ছড়াবে

বড়ি শোকানোর জন্য প্রয়োজন শীতের সকালের হালকা রোদ। কড়া রোদে বড়ি ভেঙে যায়। সেই জন্য রোদ জোরালো হলে বড়িগুলোকে হালকা আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এক দিক ভালো করে শুকিয়ে গেলে বড়িগুলো উল্টে দেওয়া হয়। রোদে শুকিয়ে যাওয়ার পরই তৈরী গয়না বড়ি |

শিল্পীরা নকশার জন্য কোন মডেল বা স্কেচ ব্যবহার করেন না, পরম্পরাগতভাবে চলে আসা গয়নার নকশাই ব্যবহার করেন। বড়িগুলি আকৃতিতে সাধারণত বৃত্ত, বর্গক্ষেত্র, ত্রিভূজ ও উপবৃত্তের মত হয়। নকশায় থাকে মূলতঃ স্বর্ণালঙ্কারের প্রভাব। মুকুট, নেকলেস, দুল, টায়রা, বাজুবন্ধ, লকেট, কানপাশা, মাকড়ি, ঝরোখা ইত্যাদির নকশা ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও নানাবিধ জ্যামিতিক নকশা, বিভিন্ন ধরনের কল্কা, শাঁখ, পদ্মফুল ও বিভিন্ন বশুপাখি যেমন বিড়াল, টিয়া, কাকাতুয়া, ময়ূর, পেঁচা, হাঁস ও প্রজাপতি নকশায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আই আই টি খড়গপুর কয়েকবছর আগে থেকেই গয়না বড়ির জি আই শংসাপত্রের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে | আইআইটি খড়গপুরের হাত ধরে মহিষাদলের গয়না বড়ির জিআই মার্ক পাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা |

তথ্য : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।