অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক “বিল্বমঙ্গল” গিরিশ ঘোষ লিখেছিলেন মাত্র ২৮ ঘণ্টায়

অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক “বিল্বমঙ্গল” গিরিশ ঘোষ লিখেছিলেন মাত্র ২৮ ঘণ্টায়

তিনি এক অদ্ভুত মানুষ | অদ্ভুত চিন্তা করতেন এবং তাও খুব দ্রুতগতিতে | আবার পরক্ষণে সেইসব কথা ভুলেও যেতেন | তার চিন্তাগুলো সবই মৌলিক কিন্তু তিনি ভুলে যাওয়ার দরুন সেগুলো আর কাজে লাগাতে পারছিলেন না | কি করা যায় ? অনেক ভাবতে ভাবতে এক উপায় এল | তিনি দেবেন্দ্রনাথ মজুমদারকে সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ করলেন | দেবেন্দ্রনাথ বাবু সর্বদা তিনটে পেন্সিল নিয়ে ওনার পিছনে ঘুরতেন | পরিস্থিতি এমন যে দোয়াতের কলমও ব্যবহার করতে পারতেন না দেবেন্দ্রনাথ বাবু কারণ দোয়াতে কালি ভরা সময়সাপেক্ষ | উনি যা বলতেন লিখে ফেলার চেষ্টা করতেন দেবেন্দ্রনাথ বাবু | একবার কি হল, উনি কিছু একটা বললেন কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ বাবু সেটা বুঝতে পারলেন না | ওনাকে জিজ্ঞেস করায় খেলেন ধমক | কারণ ? এতে তার চিন্তার ব্যাঘাত হল | তাই এরপর দেবেন্দ্রনাথ বাবু কিছু বুঝতে না পারলে সেখানে ডট বসিয়ে দিতেন আর পরে ওনার থেকে জিজ্ঞেস করে সেগুলি ভরতেন | তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক বিল্বমঙ্গল লিখেছিলেন মাত্র ২৮ ঘণ্টায়। ‘সধবার একাদশী’র জন্য ২৬ টা গানও লিখেছিলেন মাত্র এক রাতে। লিখেছিলেন চল্লিশের কাছাকাছি নাটক এবং পরিচালনা করেছিলেন ৮০ টির মত নাটক | তিনি গিরিশ চন্দ্র ঘোষ ।

একাধারে সংগীতস্রষ্টা, কবি, নাট্যকার, উপন্যাসিক, নাট্য পরিচালক ও মঞ্চাভিনেতা গিরিশচন্দ্র ঘোষ ২৮শে ফেব্রুয়ারী ১৮৪৪ সালে কলকাতার বাগবাজারে জন্মগ্রহণ করেন।বাংলার থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত তারই অবদান। পিতা নীলকমল ঘোষ ছিলেন সওদাগরী অফিসে করণিক। গিরিশচন্দ্র ছিলেন তাদের অষ্টম সন্তান। এগারো বছর বয়সে গিরিশচন্দ্র তাঁর মাকে হারান এবং পিতাকে হারান তখন তার বয়স মাত্র চোদ্দ। সংসারে হাল ধরে বোন কৃষ্ণ কিশোরী। উচ্ছৃঙ্খল গিরিশচন্দ্রকে শোধরাতে পনেরো বছর বয়সেই তার বিয়ে দিয়ে দেন।

আরো পড়ুন:  জন গণ মন গানটিকে ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতের জন্যে প্রথম প্রস্তাব করেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

ধরাবাঁধা পড়াশোনায় মন ছিলো না আর তাই ক্লাস টেনে উঠে স্কুল যাওয়া ছেড়ে দেন। কিন্তু বিয়ের যৌতুক বাবদ যে টাকা পেয়েছিলেন সেই টাকা দিয়ে তিনি ক্লাসিক ইংরাজী সাহিত্যের অনেক বই কিনে নিজেই পড়াশুনা শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ইংরাজী ভাষা রপ্ত করে নেন এবং সাথে বায়রন, শেক্সপিয়ারের পাতার পর পাতা লেখা কন্ঠস্থ করে ফেলেন। ভালো ইংরেজি লিখতে পারার জন্য ওনার শ্বশুর একটা কেরাণীর চাকরি জোগাড় করে দেন। চাকরির সাথে সাথে চলতে থাকে বিদেশি নাটক পড়া এবং অনুবাদ। বাংলায় প্রথম অনুবাদ করে ফেলেন শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথের সংলাপ।

স্টার থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা নাটকে ঠাকুর রামকৃষ্ণ চৈতন্য চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন এবং বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ গিরিশচন্দ্রের মোট পাঁচটি নাটক চৈতন্যলীলা, প্রহ্লাদ চরিত্র, বৃষকেতু, নিমাই সন্ন্যাস ও দক্ষযক্ষ দেখেন। স্বেচ্ছাচারী বেপরোয়া গিরিশচন্দ্র পরবর্তীকালে ঠাকুর পরমহংসের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর মধ্যে নৈতিক পরিবর্তন হয় এবং আধ্যাত্মিক ভাব জাগরিত হয়।

আরো পড়ুন:  মানিকবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন,"এতবছর কাজ করলাম,সৌমিত্র কোনওদিন বলেনি সে বাঘাযতীনের আত্মীয় !"

একবার গিরিশচন্দ্র ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন প্রভু আমি পাপী, আমার কি করা উচিত। আমি এত মদ খেয়েছি যে মদের বোতল গুলি একটার ওপরে একটা রাখলে হিমালয়ের সমান উঁচু হবে। ঠাকুর বলেন তুমি যা করছো তাই করো। অভিনয় চালিয়ে যাও। গিরিশচন্দ্র বললেন আমি ওসব করি পেটের জ্বালায়। তখন ঠাকুর বলেন তাহলে সকাল সন্ধ্যে দুবেলা ঈশ্বরের নাম নিতে। গিরিশচন্দ্র বলেন কখন সকাল হয় কখন সন্ধ্যে হয় তা আমার জ্ঞানে থাকে না। ঠাকুর বলেন তাহলে শুধু খাবার আগে এবং শোবার সময় ঈশ্বরের নাম করতে। তখন গিরিশচন্দ্র বলেন কখন আমি খাই আর কখন ঘুমাই শুধু ঈশ্বরই জানেন। ঠাকুর বলেন তুমি এটাও যদি না করতে পারো তাহলে থাক আমিই তোমার হয়ে ঈশ্বরের নাম করবো।

১৮৮৬ সাল। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস সেই সময় দুরারোগ্য গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থারও যথেষ্ট অবনতি ঘটেছিল। উত্তর কলকাতার কাশীপুর অঞ্চলের একটি বাগানবাড়িতে চিকিৎসার সুবিধার জন্য তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। পয়লা জানুয়ারি একটু সুস্থ বোধ করায় তিনি বাগানে বিকালের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে ছিলেন। সে দিন ছুটির দিন। ভক্তরা বাগান বাড়ীতে এসে বিভিন্ন জায়গায় বসে গল্প করছেন। গিরিশচন্দ্রও সুরেন্দ্রনাথ, রামচন্দ্র দত্ত ও অন্যদের সাথে একটি গাছ তলায় বসে কথাবার্তা বলছেন। হঠাৎ তারা দেখলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। ঠাকুর সুস্থ হয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন দেখে তারাও খুব খুশি। ভক্তরাও উঠে দাঁড়ালেন। ঠাকুর সেই গাছ তলায় এসে সেখানে তিনি তাঁর অনুগামী নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষকে বলেন “গিরিশ তুমি আমার সম্বন্ধে কি সব বলে বেড়াচ্ছো, তুমি কি দেখেছো, তুমি কি জানো আমার সম্বন্ধে, তোমার কী মনে হয়, আমি কে?”। গিরশচন্দ্র হাঁটু গেড়ে বসে হাত জোড় করে বললেন “বাল্মিকী যাঁর সম্বন্ধে বলে শেষ করতে পারেন নি, আর আমি কে যে আপনার সম্বন্ধে বলবো”। রামকৃষ্ণ পরমহংস তখন বলেন, “আমি আর কী বলব? তোমাদের চৈতন্য হোক”। এরপর তিনি সমাধিস্থ হয়ে তাঁর প্রত্যেক শিষ্যকে স্পর্শ করেন। গিরিশ সহ রামকৃষ্ণ অনুগামীদের মতে তাঁর স্পর্শে সেদিন অদ্ভুত এক আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছিল।

আরো পড়ুন:  ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করা প্রথম এশীয় মহিলা ছিলেন এই বঙ্গতনয়া

সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাসিম আর ছত্রপতি শিবাজী নাটক করে গিরিশচন্দ্র ইংরেজদের রোষানলে পড়েন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পথিকৃৎ লক্ষ্মীবাঈ কে নাটক লেখা শুরু করলেও বৃটিশ হুমকিতে শেষ করতে পারেন নি।

সে সময় মেয়েদের চরিত্রে ছেলেরাই অভিনয় করতো। গিরিশচন্দ্রই বাংলা নাটকে প্রথম মহিলাদের থিয়েটারে সুযোগ করে দেন। তিনি পতিতালয় থেকে মেয়েদের নিয়ে শিখিয়ে নাটকে নামান। বিনোদিনী, তিনকড়ি, তারাসুন্দরী সহ অনেক প্রতিভাবান নটী তাঁর হাতে গড়া। ১৯১২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি ৬৮ বছর বয়সে মহান এই নাট্যকার যাত্রা করেন অমৃতলোকের পথে!

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।