মেটিয়াবুরুজের এই ফুটবলারই প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশী ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন,প্রাপ্য সম্মান পাননি সেলিম

মেটিয়াবুরুজের এই ফুটবলারই প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশী ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন,প্রাপ্য সম্মান পাননি সেলিম

প্রত্যেক সংস্কৃতির সৃষ্টিশীলতা বেঁচে থাকে তার চর্চার মাধ্যমে এবং উৎকর্ষতা বৃদ্ধি হয় পরবর্তী প্রজন্মের সেই চর্চার প্রবাহমনতার মধ্যে দিয়ে | ফলে প্রয়োজন প্রচুর অনুশীলন ও প্রচার, ক্রীড়া সংস্কৃতিও তার বাইরে নয় | ভারতীয় ফুটবলে জন্ম লগ্ন থেকেই এই প্রচার নামক পদ্ধতিটির ব্যবহার খুবই নগন্য | কারণ আজও অধিকাংশ ভারতীয়দের কাছে ক্রীড়া শুধুমাত্র অবসর বিনোদন, সংস্কৃতি নয় !!! তাই পরবর্তী ফুটবল প্রজন্ম তাদের আদর্শকে খুঁজে পায় না। তাই বলে কী ভারতীয় ফুটবলের আদর্শ হওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিত্ব নেই ? আছে। যার কথা বলছি তার পরিবার উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তৎকালীন যুক্তপ্রদেশ প্রদেশ থেকে বাংলায় আসেন | পিতা মেটিয়াবুরুজ এলাকার এক পাট কলে কাজ করতেন । দারিদ্র্য, অনটনে তার পুঁথিগত বিদ্যা লাভ হয়নি, কিন্তু ছোট থেকেই তার ছিলো পেটানো চেহারা এবং আর ছিল অকৃত্রিম ফুটবল প্রেম | পায়ে ছিল অনবদ্য স্কিল, দুরন্ত ড্রিবিল করার দক্ষতা, প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন তাঁর ড্রিবলিং এতটাই নিখুঁত যে মনে হত বল মাটিতেই পরছে না |

মহম্মদ সেলিম ।জন্ম ১৯০৪ সালে।তার ফুটবল জীবনের কথা বলার আগে একটা ঘটনা বলা দরকার, সেলিমের দাদা আজিজের একটি সুগন্ধী দ্রব্যের দোকান ছিল নিউমার্কেট এলাকায়, কিশোর সেলিম রোজ খাবার দিতে যেত, একদিন হল কী সেলিম খুবই অসুস্থ, তো তার মা অন্য একজন কে দিয়ে দাদার জন্য খাবার পাঠালেন। সন্ধ্যাতে দাদা বাড়ি ফিরে বলে….. “আম্মা তুমি রোজ আমায় খাবার পাঠাও কারী মাখিয়ে, আজ কেন কারী মাখিয়ে পাঠালে না ! ” মা তো শুনে বাকরুদ্ধ….. পরে রহস্যের উন্মোচন হল…..কিশোর সেলিম প্রত্যেক দিন ময়দানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় টিফিন বাক্স দিয়েই দেখাত তার কেরামতি, পরে দাদার কাছে সেই খাবার নিয়ে যাওয়ার ফলে খাবারের মিশ্রণ হয়ে যেত |

আরো পড়ুন:  কফি হাউসে বসে আড্ডার মাঝেই চিরকুটে সলিল চৌধুরী লিখে ফেললেন বিখ্যাত গান-'পা মা গা রে সা/ তার চোখের জটিল ভাষা'

সেলিমের ফুটবল জীবন শুরু হয় বৌবাজার ক্লাবে খেলার মধ্যে দিয়ে, পরে যান মহামেডান বি টিমে | সেখান থেকে আসেন স্পোর্টিং ইউনিয়নে। এরপর যান ইস্টবেঙ্গলে কাটান একবছর। সেখান থেকে তাকে এরিয়ান্স এ নিয়ে যান বিখ্যাত খেলোয়াড় সন্তোষকুমার (ছোনে) মজুমদার । সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে ফেরেন মহামেডানে, শুরু হল এক অনবদ্য অধ্যায় এর । ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ পরপর পাঁচ বার কলকাতা লীগ জয় করে মহামেডান নজির সৃষ্টি করে। তার অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন সেলিম। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর হল ১৯৩৬ সাল। এই বছর তিনি বন্ধু হাসিমের পরামর্শে চড়ে বসলেন “এস এস সিটি অফ কায়ারো” জাহাজে। বন্ধু হাসিম ছিল ওই জাহাজেরই বার সহায়ক। সেলিম পৌঁছে গেলেন বিলেতে। ইংল্যান্ডের ক্লাব গুলিতে প্রচন্ড কড়াকড়ি থাকায় হাসিম সেলিম কে নিয়ে চলে এলেন স্কটল্যান্ড এ। সেলিম খালি পায়ে খেলে বলে প্রথমে সেখানেও সেল্টিক ক্লাব কর্তারা গররাজি হন। হাসিম কিছুদিন চিনে জোঁক এর মত লেগে থাকার পর সেল্টিকের ম্যানেজার উইলিমেলো এফ এ সুপারিশ করে এবং এফ এ সেলিম কে ট্রায়ালের ছাড়পত্র দেয়। এরপর যা হল ভারতীয় ফুটবলে তা এক ইতিহাস, তাঁর দুরন্ত ফুটবল প্রতিভা সবাইকে অবাক করে দিল।তাদের সামনে তিনি দেখালেন তার সেই পাগল করা ড্রিবলিং,রাইট আউট থেকে সেন্টার করার ভাঁজ দেখিয়ে বিপক্ষ রক্ষণ ও গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে গোল করে হৃদয় জিতে নিলেন হাজার খানেক সাদা সবুজ সেল্টিক জনতার।ট্রায়ালে থাকা তিন কোচ বাকরুদ্ধ ! সেল্টিকে সুযোগ পেলেন সেলিম। প্রথম ও একমাত্র ভারতীয় যিনি খেললেন বিশ্বের প্রথম সারির এক ক্লাবে। অসাধারণ খেললেন। প্রথম ভারতীয় হিসেবে বিদেশের মাটিতে করলেন হ্যাট্রিক গ্লাডস্টোনের বিরুদ্ধে, ৭-১ গোলে জিতেছিল সেল্টিক সেই ম্যাচ। যার মধ্যে চারটি গোল সেলিমের। দুটি প্রতিযোগিতামূলক ও আরও কয়েকটা চ্যারিটি ম্যাচ খেললেন। মাতিয়ে দিলেন স্কটল্যান্ড। মরশুম শেষে সেল্টিক কর্তারা তার সাথে পরের মরশুমের চুক্তি করতে চাইলেন, প্রস্তাব এল সুদূর জার্মানি থেকেও। কিন্তু চিরকালীন হোমসিক সেলিম ফিরে এলেন কলকাতায়। মহামেডান এর হয়ে কাঁপালেন মাঠ। তারপর দেশভাগ হল তার বন্ধু হাসিম চলে যায় পূর্ব পাকিস্তানে । সেলিম কিন্তু কলকাতা ছাড়েননি,ফিরে যাননি পূর্ব পুরুষের ভিটাতেও |

আরো পড়ুন:  ইংরেজদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে গৌরমোহন দত্ত তৈরি করেছিলেন "বঙ্গজীবনের অঙ্গ" বোরোলিন

পঞ্চাশের দশক সেলিম থাকতেন বেলেঘাটাতে, অত্যন্ত দারিদ্র্য গ্রাস করেছে পরিবারকে, জলের ব্যবস্থা নেই বাড়িতে, আন্তর্জাতিক মানের এই ফুটবলার রাস্তা থেকে জল নিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। তাঁর প্রাণের ক্লাব মহামেডান খোঁজও নেয়নি | একদিন ছেলে রশিদ কে দিয়ে চিঠি লেখালেন সেল্টিক ক্লাবে।কিছুদিন উত্তর এল না, ভাবলেন দেশই দেখল না, বিদেশ কেনই বা মনে রাখবে তার বাবাকে ! কিন্তু না, ১৯৫০ এর ২৬ শে জুন…..এল চিঠি সেল্টিক ক্লাব এর লিখেছেন স্বয়ং ক্লাব চেয়ারম্যান, সঙ্গে ছিল ১০০ পাউন্ডের ব্যাঙ্ক ড্রাফট নোট। চিঠির শিরোনামে লেখা “ডিয়ার সেলিম….. ” সম্বোধন সেলিমের চোখকে অশ্রু সিক্ত করল। সঙ্গে ছিল আরও এক সম্বোধন “ম্যাজিসিয়ান”…..হ্যাঁ মাত্র কয়েকটি ম্যাচেই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল সেই ম্যাজিক, সেটাই তাদের মননে গেঁথে রেখেছে | কিন্তু যেখানে সারাজীবন দিলেন সেই জায়গা সেলিমকে কী মূল্য দিল ? ১৯৭৯ সালে তাঁর একটা ব্যক্তিগত সাক্ষাতকারের কথা শুনলেই তা বোঝা যাবে, ১‌৯৭৭ সালে লীগের খেলা মোহনবাগান বনাম মহামেডান, বৃদ্ধ সেলিম ক্লাবে গেলেন একটা টিকিটের খোঁজে, সামনে ভিড় থাকায় তিনি ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে গেলেন, গেট খুলতে অনুরোধ করলে দ্বাররক্ষী তাঁকে জানিয়ে দেয় যে, যে কোনও লোকের জন্য ক্লাবের গেট খোলা হয় না। ৭৩ বছরের বৃদ্ধ আমৃত্যু আর ক্লাব মুখো হননি।

আরো পড়ুন:  ভাই বাইশ গজে ভেল্কি দেখাতেন,দাদা রাইটার্সে "ক্লিন বোল্ড" করেছিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে

অবসর কাটিয়েছেন ময়দানের শিশু কিশোর দের নিজের অগাধ ফুটবল অভিজ্ঞতার কিছুটা দিয়ে।বর্তমানে ভারত জানেই না এই অসামান্য ফুটবল ব্যক্তিত্ব এর কথা। ২০১০ সালে দেবায়ন সেন পরিচালিত “ইন্ডিয়ান ফুটবল” নামের এক তথ্যচিত্র প্রকাশ পায় ৭টি খন্ডে। তার প্রথম খণ্ডে সেলিমের ছেলে রশিদ গভীর দুঃখের সাথে সাক্ষাতকারে জানায় যে ভারতীয় ফুটবল বিশ্বাস করে না যে তার বাবা বিদেশে খেলা প্রথম ভারতীয় খেলোয়াড় ! স্বীকৃতি দেয়নি তার বাবার ফুটবল প্রতিভাকে…. সত্যিই অদৃষ্টের কী নিদারুণ পরিহাস !

“সেলিম” এই আরবি শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “সুরক্ষিত বা অক্ষতিগ্রস্থ”। কিন্তু বাস্তবে তার ক্ষেত্রে হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই সে প্রকৃত পক্ষে আজ অ-“সুরক্ষিত” ! গত ৫ই নভেম্বর ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। তাই ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে তাঁর চরণে রইল সশ্রদ্ধ প্রণাম |

-কৌস্তভ বিশ্বাস

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।