লন্ডনে সরকারি ভবনে কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলন করে কারাদণ্ড ভোগ করেন অর্থনীতিবিদ নলিনাক্ষ সান্যাল

লন্ডনে সরকারি ভবনে কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলন করে কারাদণ্ড ভোগ করেন অর্থনীতিবিদ নলিনাক্ষ সান্যাল

একাধারে দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী আবার অন্যদিকে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সফল ব্যবসায়ী, স্পোর্টসম্যান। হ্যাঁ, একই অঙ্গে এত রূপ ছিল ড: নলিনাক্ষ সান্যালের। বাংলার এক অকুতোভয় সন্তান ছিলেন নলিনাক্ষ সান্যাল। নদিয়া জেলার ‘জলঙ্গী’ তীরস্থ ধোড়াদহ বহু প্রাচীন একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। বর্তমানে গ্রামের অবস্থা হীন হয়ে এসেছে। এই গ্রামেই ১৮৯৮ সালের ২২ নভেম্বর জমিদার বংশে  জন্মেছিলেন নদিয়া তথা বাংলার কৃতী সন্তান নলিনাক্ষ। পিতা রজনীকান্ত সান্যাল ছিলেন ইংরেজ আমলে বহরমপুর কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী। রজনীকান্তের তিন পুত্র – অনাদিকান্ত, নলিনাক্ষ ও শক্তিপদ। ছোটো পুত্র শক্তিপদ ছিলেন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। বড়ো দাদা অনাদিকান্ত বিপ্লবী বারীন ঘোষের অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অনাদিকান্তকে স্বদেশী ডাকাতি মামলার দায়ে ইংরেজ পুলিশ গ্রেপ্তার করে। রংপুর জেলে  ইংরেজ পুলিশের শত অত্যাচারেও তাঁর মুখ দিয়ে কোন কিছু স্বীকার করানো যায়নি।

সেই দাদার ভাই নলিনাক্ষর দেশপ্রেমও কিছু কম নয়। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের ছাত্র ছিলেন। খ্যাতনামা পণ্ডিত হ্যারল্ড ল্যাস্কির অধীনে গবেষণা করে ১৯২৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তিনি অন্যতম প্রথম ভারতীয় হিসাবে অর্থনীতিতে বিদেশ থেকে পিএইচ ডিগ্রি লাভ পান। নলিনাক্ষ বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠ শেষ করে স্কলারশিপ পেয়ে বিলেত যান।

যাইহোক, লন্ডনে গিয়ে নলিনাক্ষ একটা ঐতিহাসিক কান্ড ঘটান। লন্ডনে থাকাকালীনই তিনি জাতীয়তাবাদী ও দেশাত্মবোধক রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। সেদেশে একটি সরকারি ভবনে কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন। সাইমন কমিশনের বয়কটের জন্যও তাঁর কারাবাস হয়। লন্ডনে কারাবাসকালীন তিনি তাঁর থিসিস পেপারের বেশ কিছু অংশ লেখেন। অন্য দেশে গিয়ে এভাবেই বাংলার তথা সারা ভারতের মাথা উঁচু করেন।

আরো পড়ুন:  জাপানে বাড়ির পাইনগাছের ফলকে লিখে রাখতেন স্বাধীনতায় প্রাণ দেওয়া বিপ্লবীদের নাম

এরপর দেশে ফিরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যাপনা শুরু করেন নলিনাক্ষ সান্যাল। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের কার্যকলাপের সাথে প্রত্যক্ষ যুক্ত থাকার কারণে ব্রিটিশ সরকারের কুনজরে পড়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত হন। বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখার্জির স্নেহধন্য ছাত্র ছিলেন নলিনাক্ষ। স্বাধীনতা আন্দোলনের হাতেখড়ি বিপ্লবী বাঘা যতীনের ‘যুগান্তর দলে’। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের হাত ধরে তিনি জাতীয় কংগ্রেসে পা রাখেন। পরবর্তীতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির প্রথম সারির নেতাও হন। কলকাতায় ১৯৩৩ সালে নিষিদ্ধ কংগ্রেস অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতিত্ব করার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৩৬ সালে প্রথমবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিধায়ক হয়েছিলেন। দারুন সুবক্তা ছিলেন। ১৯৩৭-৪৭ টানা দশ বছর বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় তিনি ব্রিটিশরাজের কড়া সমালোচনা করেন। সেই ভয়াবহ মন্বন্তরের জন্য ব্রিটিশ সরকারকেই দায়ী করেন তিনি। ব্রিটিশ বিরোধী ভূমিকা পালন করার জন্য তাঁকে মোট সাতবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গার সময় তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে এই দাঙ্গা রোধ করার চেষ্টা করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য এলাকার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে তিনি সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দেন।

আরো পড়ুন:  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গর্জে উঠেছিল বীণা দাসের রিভলভার

ওনার খুবই কাছের বন্ধু ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৪ সালে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেন বন্ধু কাজী নজরুল ইসলামকে। যা নিয়ে সেই সময় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বিবাহ বাসরে। বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে নজরুল বহরমপুরে আসেন এবং বরযাত্রীও গিয়েছিলেন। সেখানে অন্য বরযাত্রীদের থেকে দূরত্ব রেখে নজরুল ইসলামকে খেতে দেওয়া হয়। নলিনাক্ষ সান্যালের ভাই শশাঙ্কশেখর সান্যাল ওই দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে দাদাকে ওই বিয়ে বন্ধ করতে বলেন। শেষে নজরুলই সবাইকে বুঝিয়ে শান্ত হতে বলেন। শোনা যায়, সেই রাতেই নজরুল জাতের নামে বজ্জাতি গানটি লেখেন। এর আগে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য কারাদণ্ডের সূত্রে ১৯২৩-এর মে মাসে কোনও এক সময় নজরুল বহরমপুর জেলে ছিলেন। ঐ বছর ১৫ই ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে নজরুল ছাড়া পেলে সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কবিকে সর্বপ্রথম সংবর্ধনা দিয়েছিলেন তাঁর সুহৃদ নলিনাক্ষ সান্যাল।

সবদিক দিয়েই আধুনিকমনস্ক, সংস্কারমুক্ত চিন্তার মানুষ ছিলেন নলিনাক্ষ সান্যাল। সংকীর্ণ জাতপাতের ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। সমাজকে শিক্ষার আলো দিতেও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। নিজের গ্রাম ধোড়াদহের সাধারণ ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে শিক্ষাব্রতী নলিনাক্ষ নিজ  উদ্যোগে এলাকার বিদ্যোৎসাহী মানুষের সহায়তায় তাঁর পিতা রজনীকান্ত সান্যালের নামে ১৯৬১ সালে ১ ফেব্রুয়ারি ‘ধোড়াদহ রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। করিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হতো উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য প্রায় আশি কিমি দূরে কৃষ্ণনগরে অথবা বহরমপুরে যেতে। এলাকার সাধারণ মানুষের  স্বার্থে যাতে তারা সহজেই উচ্চতর শিক্ষাব্যবস্থায় অংশ গ্রহণ করতে পারে, সেইজন্য নলিনাক্ষ সান্যাল অন্যান্য শিক্ষানুরাগীদের সাথে নিয়ে ১৯৬৮ সালে করিমপুর পান্নাদেবী কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন।

আরো পড়ুন:  বিপ্লবীদের মুক্ত করতে হবে,গান কটন নিয়ে বোরখা পরে আদালতে অপেক্ষায় কল্পনা দত্ত

রাজনৈতিক জীবনও ছিল বর্ণময়। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আলাদা বাংলা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন এবং করিমপুর বিধানসভা থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে  মতবিরোধে আবার দল পরিত্যাগ করে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এর পি ডি এফ মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। নলিনাক্ষ সান্যালের পর পরবর্তীতে করিমপুর বিধানসভা থেকে নির্বাচিত কোন বিধায়ক মন্ত্রীসভায় স্থান পাননি।

ওনার স্ত্রীও মামনি সান্যালও খুবই সাহসী ছিলেন। খুবই বিনয়ী ও ভদ্রও ছিলেন। বালিগঞ্জ হিন্দুস্তান রোডে তিনি গোপনে বিপ্লবী বীণা দাশের সঙ্গে পিস্তল চালানো অভ্যাস করতেন। ২৯ অক্টোবর, ১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর কলকাতার হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতে প্রয়াত হন বাংলার এই কৃতী সন্তান। এত গুণী এই মানুষটির কথা কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম প্রায় জানেই না। এ বোধহয় আমাদেরই দুর্ভাগ্য।

তথ্য : বঙ্গদর্শন (দীপক সাহা)

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।