ভাই বাইশ গজে ভেল্কি দেখাতেন,দাদা রাইটার্সে “ক্লিন বোল্ড” করেছিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে

ভাই বাইশ গজে ভেল্কি দেখাতেন,দাদা রাইটার্সে “ক্লিন বোল্ড” করেছিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে

১৯৪২ সালের জানুয়ারির শেষ । রঞ্জি ট্রফির খেলায় মুখোমুখি বাংলা বনাম বিহার | বিহারের দলে তখন প্রায় ৭ থেকে ৯ জন বাঙালি খেলতেন | বাংলা করেছে ২৬৩ | বিহারের ৭ উইকেট পড়েছে ১৪৯ রানে | প্রথম ইনিংসে লিড না রাখতে পারলে পরের রাউন্ডে যাওয়া যাবে না | এই অবস্থায় ব্যাট করতে নামলেন তেইশ বছরের এক তরুণ | ডাকনাম পটলাদা | ক্রিজে নেমেই চালিয়ে খেলতে লাগলেন পটলাদা | একদিকে উইকেট যাচ্ছে অন্যদিকে পটলাদা চালিয়ে খেলছে | খুব দ্রুত করে ফেললেন অর্ধশতক | বিহারের রান তখন নয় উইকেটে ২৬২ | আর এক রান করলেই বাংলার স্কোর ধরে ফেলবে বিহার | পটলাদা করে ফেলেছেন ৬৬ | এমন সময় সুশীল দত্তের বল ডিপ স্কোয়ার লেগ দিয়ে তুলে মারতে গিয়ে আউট হয়ে গেলেন পটলাদা | ক্যাচটি নিয়েছিলেন আব্দুল জব্বার, যিনি বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেণির তথা রঞ্জি ম্যাচে প্রথমবার শতরান করেন | পটলাদা আউট হওয়ায় বাংলা ১ রানের লিডে পরের রাউন্ডে যায়।

১৯৪৮ – ৪৯ সালের রঞ্জি ট্রফির প্রথম রাউন্ডের ম্যাচে দিল্লীর জেতার জন্য দরকার ছিল মাত্র ৭৭ রান । কিন্তু শুঁটে ব্যানার্জী ও পটলাদা দিল্লিকে মাত্র ৪৮ রানে অল আউট করে দেয়।জয় পায় বিহার | পটলাদা দুই ইনিংসে ১১ উইকেট পান।পটলাদা ছাড়া একসময় পূর্বাঞ্চল ক্রিকেট দল তৈরি হত না। ১৯৪০-৪১ থেকে ১৯৬৩-৬৪ সাল পর্যন্ত খেলেছিলেন ৪৫ টা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ | ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দু’বার, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একবার, এম.সি.সি.র বিরুদ্ধে একবার আর কমনওয়েলথ দলের বিরুদ্ধে তিনবার খেলেছেন পটলাদা | ৪৫ টি রঞ্জি ম্যাচে পেয়েছেন ২০৯ টি উইকেট | দীর্ঘদিন বিহারের অধিনায়ক ছিলেন |

কে এই পটলাদা ? পটলাদার আসল নাম বিমলকৃষ্ণ বসু | চিনতে পারলেন না আশাকরি ! বিমলকৃষ্ণ বসুকে চিনতে গেলে ফিরে যেতে হবে প্রায় নব্বই বছর |

আরো পড়ুন:  গান লিখেছিলেন নেতাজির জন্যে,আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচার চলাকালীন চ্যারিটি শো করে অর্থসাহায্য করেছিলেন উত্তমকুমার

১৯৩০ সালের ২৯ আগস্ট | শুক্রবার | ঘড়ির কাঁটা সকাল নয়টা ছুঁই ছুঁই | ঢাকা মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে আর পাঁচটা দিনের মতই একটি কর্মব্যস্ত দিন | হাসপাতালের সর্বত্রই নিকটবর্তী জেলাগুলির থেকে আসা রোগীদের এবং রোগীদের আত্মীয়স্বজনের থিকথিকে ভীড় | অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে-বেরচ্ছে | স্ট্রেচারে করে রোগীদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালের কর্মীরা | আর মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াদের আসাযাওয়া তো লেগেই আছে | যদিও আজ সকাল থেকেই হাসপাতালের নিরাপত্তা বেশ আঁটোসাঁটো | আজ সকাল নটার সময় পুলিশের আই জি মিস্টার লোম্যান আর তার সহকারী মিস্টার হাডসন নৌ-বিভাগের অসুস্থ পুলিশ সুপার মিস্টার বার্ডকে দেখতে আসবেন। তাই নিরাপত্তায় ঢিলেমি একদম বরদাস্ত নয় ব্রিটিশদের | চারিদিকে ঘোরাফেরা করছে পুলিশের সশস্ত্র রক্ষীরা | সন্দেহভাজন মনে হলেই চলছে তল্লাশি |

মিস্টার বার্ডের ওয়ার্ডে তখন পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ | মাছি গলার উপায় নেই | মিস্টার লোম্যান আর তার সহকারী মিস্টার হাডসন নির্দিষ্ট সময়েই হাসপাতালে আসলেন | দেখা করলেন মিস্টার বার্ডের সঙ্গে | সাক্ষাৎ এবং কুশল বিনিময় চলল মিনিট কুড়ি | এবার ফেরার পালা | বার্ডের ঘর থেকে বেরিয়েই বারান্দার শেষে সিঁড়ি | নামবেন বলে সেই সিঁড়িতে সবে পা দিয়েছেন লোম্যান | দোতলার সিঁড়ির কোণ থেকে দেবদারু গাছের আড়াল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন সাদামাটা ফতুয়া আর ধুতি পরিহিত এক যুবক | কেউ কিছু বোঝার আগেই গর্জে উঠল যুবকের .৩২০ বোরের অগ্নিবর্ষী রিভলভার | দ্রাম ! দ্রাম ! দ্রাম !

প্রথম নিশানা অব্যর্থ | লক্ষ্যভেদ | বুলেট ভেদ করল শিরদাঁড়া | মুখ থুবড়ে মাটিতে বসে পড়লেন লোম্যান | আর উঠলেন না |

আরো পড়ুন:  ইস্পাত কঠিন মানসিকতার জন্যে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে "লৌহমানব" বলেছিলেন পিকে ব্যানার্জি

যুবকের দ্বিতীয় নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল | গুলি লাগল হাডসনের কাঁধে | ক্ষতস্থানে হাত চেপে বসে পড়লেন তিনি | সশস্ত্র রক্ষীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলেন, “There he is! Get him!”

লোম্যানের ঠিক পেছনেই ছিলেন ঢাকার সরকারি কন্ট্রাক্টর সত্যেন সেন। সত্যেন সেন চিনতে পারলেন যুবককে | তিনি আটকাতে গেলেন যুবককে | যুবক একটা ঘুষি মারলেন তাকে | ছিটকে পড়লেন সত্যেন সেন | ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত ব্রিটিশ পুলিশ | আতঙ্কের রেশ কাটিয়ে যখন তারা ওই যুবকের পিছনে ধাওয়া করলেন তখন বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছে | যুবক তখন ছুটছেন উল্কাবেগে | এই হাসপাতালের প্রত্যেকটা গলি, রাস্তা, ওয়ার্ড তাঁর নখদর্পনে | সে নিজেই যে এই কলেজের চতুর্থ বর্ষের মেডিক্যালের মেধাবী ছাত্র | তাঁকে ধরবার আপ্রাণ চেষ্টা করল পুলিশ | কিন্তু সে চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হল | যুবক তখন হাসপাতালের ছাদের কার্নিশের উপর দিয়ে ছুটছেন | তারপর সুকৌশলে সেই ছাদের কার্নিশ বেয়ে লাফ দিয়ে নেমে গেলেন হাসপাতালের রাস্তায় | হাসপাতালের মেথর সুষেন তাঁকে পালতে দেখে খুলে দিলেন পাঁচিলের ছোট দরজা | যুবক হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে গেলেন | সামনেই এক গৃহস্থের জলের ট্যাঙ্ক | যুবক জলের ট্যাঙ্কের উপরে উঠলেন | তারপর ট্যাঙ্ক অতিক্রম করে ঢুকে পড়লেন গৃহস্থের বাড়ির ভেতর | তারপর একেবারে সদর রাস্তায় | তারপর চলে গেলেন ব্রিটিশদের নাগালের বাইরে |

পুলিশের বড়কর্তা নিহত। আঘাতটা যে ব্রিটিশ সিংহ চুপচাপ মেনে নেবেনা তা বলাই বাহুল্য। শুরু হলো অমানুষিক অত্যাচার। পুলিশের সাথে যোগ দিল শহরের নামী গুন্ডার দল। তৎপরতা ব্যর্থ হল না। আততায়ী কে ধরতে না পারলেও তাঁর নামধাম জানতে বাকি রইল না শাসকদের। মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলের ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র বিনয়কৃষ্ণ বসু। বিক্রমপুর রাউথভোগ গ্রামের রেবতী মোহন বসুর ছেলে। তিনিই এ কান্ডের মহানায়ক। দশহাজার টাকা ঘোষণা করা হলো মাথার দাম, যে করে হোক ওর মাথা চাই ! কলেজের ম্যাগাজিনে টেনিস টিমের দল থেকে যুবকের ছবি বের করা হল | ছাপানো হল কয়েক হাজার কপি | ঢাকাসহ বাংলার সর্বত্র সেই ছবি ছেয়ে গেল | ছবির নিচে লেখা – “লোম্যানের হত্যাকারী | হত্যাকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে মোট দশ হাজার টাকা পুরস্কার | পরিচয় গোপন রাখা হবে | নিকটস্থ থানায় খবর দিন |” মরিয়া হয়ে উঠল পুলিশ | যুবককে ধরার জন্যে শুরু হল বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। ছাড় পেল না মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররাও | পুলিশের বেধড়ক মারে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হল বহু ছাত্র | কিন্তু খোঁজ মিলল না যুবকের | কিন্তু কোথায় বিনয় বসু ?

আরো পড়ুন:  গত ৩০ বছর ধরে বিনা পয়সায় ছাত্র ছাত্রীদের পড়িয়ে চলেছেন প্রাক্তন নকশাল নেতা শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সুভাষ কুন্ডু

১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর | আবার দেখা পাওয়া গেল বিনয়কৃষ্ণ বসুর | ইউরোপিয়ান সাহেবের ছদ্মবেশে বিনয়-বাদল-দীনেশ রাইটার্সে প্রবেশ করে হত্যা করে অত্যাচারী সিম্পসনকে | রাইটার্সের অলিন্দ সেদিন দখল নিয়েছিল তিন বাঙালি | রাইটার্সের অলিন্দে কান পাতলে আজও শোনা যায় গুলির শব্দ | সিম্পসনকে আউট করে ব্রিটিশদের ধরা দেবেন না বলে মাথায় গুলি চালিয়ে দিলেন বিনয়কৃষ্ণ বসু | কয়েকদিন পর প্রয়াত হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে | বিনয়কৃষ্ণ বসু ছিলেন পটলাদা মানে বিমলকৃষ্ণ বসুর আপন দাদা | বিনয় নিজেও ক্রিকেট, টেনিসে পারদর্শী ছিলেন | বিনয়কৃষ্ণ বসুর আরও দুই ভাই বিকাশকৃষ্ণ বসু ও বিরাজকৃষ্ণ বসু দুজনেই বিহারের হয়ে রঞ্জি খেলছেন |

আমরা জানি ফুটবল স্বাধীনতায় প্রেরণা জুগিয়েছে | কিন্তু ক্রিকেটও জুগিয়েছে স্বাধীনতার প্রেরণা | বিনয়কৃষ্ণ বসু, বিমলকৃষ্ণ বসু , বিকাশকৃষ্ণ বসু, বিরাজকৃষ্ণ বসু তারই প্রমাণ |

-অভীক মণ্ডল
তথ্য : ক্রিকেট গবেষক সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।