পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বনেদি ঘড়িগুলি বাঁচিয়ে রেখেছেন ‘ঘড়িবাবু’

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বনেদি ঘড়িগুলি বাঁচিয়ে রেখেছেন ‘ঘড়িবাবু’

আপনারা কেউ স্টিভ জ্যাগস’ এর নাম শুনেছেন? ইংল্যান্ডবাসী স্টিভ জ্যাগস ? বেশ ছাড়ুন, আমাদের খোদ কলকাতার বাসিন্দা স্বপন দত্ত ? তার নামও বুঝি শোনেননি ?
আচ্ছা তাহলে ‘বিগ বেন’ নামটা শুনে থাকবেন নিশ্চয়?

ইংল্যান্ড,কলকাতা,বিগ বেন, কি ভাবছেন পাগলের প্রলাপ? না মশাই, একেবারেই তা নয়। বেশ, তাহলে এবার মিলিয়ে ফেলা যাক সব সূত্র।

রাস্তা,ঘাটে,দোকানে,দেওয়ালে সর্বত্রই চোখে পড়ে ঘড়ি।তার কাঁটার সাথে পা মিলিয়ে আমাদের জীবনটিও তার প্যাঁচেই বাঁধা।সেই ঘড়িগুলি চলতে চলতে যখন হোঁচট খায় তখন ডাক পড়ে ওপরে যে নাম দুটি পড়লেন তাদের।তারা হলেন ‘ঘড়িবাবু’ বা ‘কিপার’।

প্রথমজন অর্থাৎ স্টিভ জ্যাগস হলেন লন্ডনের ‘গ্রেট ক্লক’এর কিপার যাকে ‘বিগ বেন’স বস’ নামেও ডাকা হয় আর অপর জন লেক টাউনে অবস্থিত ‘বিগ বেন’ এর কিপার।

স্বপন দত্ত।থাকেন কলেজ স্ট্রিটের কাছে।ঘড়ির দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারেন তার বয়স থেকে,কলকব্জাসহ নির্মাতার নামও।কলকাতা শহরের সবকটা হেরিটেজ ঘড়ির কাঁটা তার দেখভালে রয়েছে,শুধু কলকাতা কেন দিল্লি,পাটনা এমনকি নেপালের ঘড়িও তার কথায় চলে।

আরো পড়ুন:  কলকাতার বনেদি বাড়ির রথযাত্রার ঐতিহ্য

শহরের অনেক ঘড়িই দেহ রেখেছে।কারোর স্ক্রু,পেন্ডুলামে জং ধরেছে আবার কারও কলকব্জা ঢিলে হয়েছে। তবে আজও ঘড়িবাবু স্বপন দত্তের যত্নে বেঁচে আছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ঘড়ি |

ঘড়ির সাথে দত্ত পরিবারের সম্পর্ক প্রায় দেড়শো বছরের।স্বপন বাবুর ঠাকুরদার বাবার আমল থেকে বড়ো বড়ো সাহেবি সংস্থার চিফ টেকনিসিয়ান ছিলেন তাদের পরিবারের কিছু লোকজন।সেই থেকেই ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্ক। কলেজস্ট্রিটের নিজের ছোট ঘরে নানা রকম ছোটো বড়ো ঘড়ির সঙ্গে সারাটা দিন কাটান তিনি।সেখানে ছোটো টাইম পিস থেকে পেল্লায় ঘড়ি সবেরই দেখা মেলে।

 

 

লন্ডনের ‘জিলেট অ্যান্ড জনস্টন’এর তৈরি নিউমার্কেটের ঘড়ি থেকে ইংরেজ, পর্তুগিজ সকলের তৈরি ঘড়ি সারিয়েছেন তিনি। এছাড়াও বর্ধমানের কাছারিবাড়ির ঘড়ি, শিবপুর বি.ই. কলেজের ঘড়ি,ব্যান্ডেল চার্চ, ধর্মতলা চার্চ,শ্রীরামপুর পর্তুগিজদের গির্জা,জোড়াগির্জা এই সব ঘড়ির প্রাণই স্বপন বাবুর মুঠোয় বন্দি।এভাবে তার দায়িত্বে থাকা ঘড়ির লিস্ট করতে গেলে তার শেষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।চলমান ঘড়িগুলির এতো রকমের সব যন্ত্রপাতির আয়ুর তালিকা করে রাখেন তিনি।আয়ু শেষ হওয়ার কিছু পূর্বেই শুরু করে দেন তাদের মেরামতির কাজ।

আরো পড়ুন:  ম্যাডাম নন, স্যার বললেই বেশি খুশী হন এই মহিলা আইপিএস অফিসার

ছোটোবেলায় বাবা পতিতপাবন দত্ত’র হাত ধরেই ঘড়ি চিনতে শেখা,আজ বাবার পথ ধরেই তিনি তৈরি করেছেন নিজের এক আলাদা পরিচয়।স্বপন বাবুর দুই পুত্র , তার মধ্যে সত্যজিৎ এই পেশায় বাবার সঙ্গে থেকে তা এগিয়ে নিয়ে চলেছে।তবে এই প্রজন্মের আর কেউ হয়ত এই পেশায় আসবে না বলে তিনি মনে করেন।

ছেলে সত্যজিৎকে কাজ শেখাতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘড়ির চলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার ঐতিহ্য,তাই সেটিকে আগে বুঝতে হবে। তার থেকে জানা যায় ঘড়িতে নম্বর লেখারও নিয়ম থাকে।কোনটা নম্বর লেখা হবে,কোনটা রোমান হরফ তা সব নির্ভর করে ঘড়ির ঐতিহ্যের উপর। ঘড়িতে রোমান হরফ লেখার একটি নিয়ম আছে, এক্ষেত্রে ৪এর স্থানে ‘IV’ ব্যবহৃত না হয়ে ‘IIII’ লেখা হয়। নেপালের একটি ঘড়ি সারাতে গিয়ে IV এর পরিবর্তে IIII লেখামাত্রই তীব্র নিন্দা হয়েছিল। তবে মূল ঘড়িটির ভিতরে থাকা পুরোনো ঘড়িটিতেও IIII লেখা থাকায় স্বপন বাবু তাদের সংশয় কাটাতে সক্ষম হন।

আরো পড়ুন:  শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজির ঘোড়ায় চড়া মূর্তি এবং এক অজানা ইতিহাস

সারাজীবন ঘড়ি নিয়ে এতো কাজ করার পরেও তার একটা দুঃখের জায়গা রয়ে গেছে। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ঘড়িগুলো অযত্নে পড়ে একের পর এক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।যেমন শিয়ালদার কাছে চার্চের ঘড়ি,বন্ধ হয়ে পড়ে থাকল,কারণ ফাদারের মতে এ ঘড়ি দেখে লোকজন টাইম মেলায় তাই এ ঘড়ি সারানোর দায় তার একার নয়।নিউ মার্কেটের ঘড়ি,কে সাড়াবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভাবে পড়ে রইল।অথচ লন্ডনের ‘বিগ বেন’ এর রক্ষণাবেক্ষণে অনেক টেকনিশিয়ানরা মোতায়েন রয়েছে।এই সকল হেরিটেজ ঘড়ি অমূল্য।একবার হারিয়ে গেলে ফিরিয়ে আনাও অসম্ভব,চোখের সামনে তাই তাদের বিকল হতে দেখতে স্বপন বাবু বড় কষ্ট অনুভব করেন।

-লিলি চক্রবর্তী
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা,বঙ্গদর্শন

Avik mondal

Avik mondal

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।