মোহনবাগানের হয়েই খেলবেন,টটেনহ্যাম হটস্পারের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন চুনী গোস্বামী

মোহনবাগানের হয়েই খেলবেন,টটেনহ্যাম হটস্পারের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন চুনী গোস্বামী

১৯৬০-৬১ মরশুমে নিজের কেরিয়ারের সর্বোত্তম পর্যায়ে ফুটবল খেলছেন তিনি। বিখ্যাত ব্রিটিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারের থেকে একটি চিঠি এসে পৌঁছাল খাস কলকাতায়। খামের ওপর কালো হরফে লেখা সুবিমল গোস্বামী, চিঠির প্রেরক কিংবদন্তি বিল নিকোলসন। সেই বছরই প্রথম ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হয় টটেনহ্যাম হটস্পার । ইংল্যান্ডের ক্লাবটির তরফে তাকে প্রস্তাব জানানো হয়, টটেনহ্যামের হয়ে খেলার জন্যে ইংল্যান্ডে আসতে হবে । তিনি তখন মোহনবাগানের রত্ন হয়ে বিরাজ করছেন । কাজেই প্রত্যাখ্যান করলেন টটেনহ্যাম হটস্পারের প্রস্তাব | তবে যাননি বলে কোনও আফসোস নেই। তিনি বাংলাতেই থাকতে চেয়েছিলেন। মোহনবাগানেই । কারণ, ওটাই তাঁর কাছে ফুটবলের স্বর্গ |

তিনি চুনী গোস্বামী | বাংলার গর্ব |

###

চুনী গোস্বামী তো পূর্ববঙ্গের লোক। তাই ইস্টবেঙ্গলকে গোল দেয় না। এরকম একটা তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর গায়ে । মাঠে নেমে যখন কেউ খেলে সে তখন তাঁর পূর্ব বা পশ্চিম সত্তা কোথায় রাখে কেউ জানে ? খেলাটা মাঠেই হয় | ১৯৬৩ সালে লীগের প্রথম পর্বের ম্যাচে মোহনবাগান ৩ – ০ গোলে হারাল ইস্টবেঙ্গলকে। গোল করলেন চুনী গোস্বামী, জার্নেল সিং এবং সুনীল নন্দী | পরের বছরের গোড়ায় চুনী গোস্বামীর বিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গীয় মেয়ের সাথে। ১৯৬৪ এর রির্টান লীগে মোহনবাগান আবার হারাল ইস্টবেঙ্গলকে। এবার ৩ -১ গোলে। এবার অশোক চ্যাটার্জী, অরুময়নৈগমের সাথে একটি গোল চুনী গোস্বামীর। গুরু বলাইদাস চ্যাটার্জী ঠাট্টা করে বললেন, ‘দেখলি তো পশ্চিমবঙ্গের মেয়েকে বিয়ে করার গুণ’।

আরো পড়ুন:  ফুটবলারের বেশে এক বিপ্লবী - দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা

মধ্যবিত্ত বাবা চিরকালই চেয়েছিলেন যে, পড়াশোনা করে, স্নাতক হয়ে ভাল চাকরি করুক ছেলে। খেলা নিয়ে বকাঝকাও করতেন। তবু পালিয়ে পালিয়ে খেলে বেড়াতেন চুনী। মায়ের প্রশ্রয়ে। এশিয়ান গেমসে সোনা জেতার পর অবশ্য বাবা বলেছিলেন— ‘‘চুনী মুখ উজ্জ্বল করেছে !’’

চুনী গোস্বামীর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারী পূর্ববঙ্গে। আসল নাম সুবিমল গোস্বামী। আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার যশোদল গ্রামে | কলকাতায় চলে আসেন তখন ১৯৪২ সাল। বয়স চার বছর। সেই অর্থে তিনি বাঙাল। কিন্তু বাঙাল হয়েও এই ঐতিহ্যের ম্যাচে ঘাম-রক্ত ঝরিয়েছেন ঘটিদের ক্লাব মোহনবাগানের হয়ে। কারণ তাঁর বেড়ে ওঠা লেখাপড়ায় হাতেখড়ি, ফুটবলের সঙ্গে সখ্য তৈরি হওয়া, তার পুরোটাই এ পার বাংলার জলহাওয়ায় | ১৯৫৪ সালের ২৯ মে মোহনবাগানের হয়ে ইস্টার্ন রেলের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নেমেই গোল করেছিলেন তিনি |

তবে ডার্বি তাঁর কাছে চিরস্মরণীয় ১৯৬৭ সালের জন্য। ১৯৬৭ সালের মরসুম মোহনবাগানের ভাল যায়নি। লিগ হারাতে হয়েছিল। ৩০ জুলাই, ইডেনে মহমেডানের কাছে হারের পরেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম লিগ আসছে না। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হল যে লিগের খেলায় যদি তারা ইস্টবেঙ্গলকে হারাতে পারি, তা হলে মহমেডান লিগ চ্যাম্পিয়ন হবে। আর মোহনবাগানকে হারালে চ্যাম্পিয়ন হবে ইস্টবেঙ্গল। ক্লাবেই কয়েক জন বলতে শুরু করলেন, ‘‘চুনী কিছুতেই গা লাগিয়ে খেলবে না। আমাদের লিগ জয়ের আশা থাকলে তাও খেলত, আমাদের যখন সম্ভাবনা নেই, আর জিতলেই চ্যাম্পিয়ন হবে ইস্টবেঙ্গল, তখন সত্যিকারের চুনীকে পাওয়া যাবে না মাঠে।’’ ৬ অগস্টের সেই ম্যাচে ইডেনে খেলা শুরুর পরেই নামল বৃষ্টি। মাঠে জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় রেফারি ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেন। ফের এক মাস পরে ১০ সেপ্টেম্বর ম্যাচের দিন ধার্ষ হল।

আরো পড়ুন:  ২৫০ বছরের পুরোনো 'আদি হরিদাস মোদক'-এ কলাপাতায় লুচি আর খোসা সমেত আলুর তরকারি আজও একইরকম

ইস্টবেঙ্গলে তখন গোলে পিটার থঙ্গরাজ | রয়েছেন সুনীল ভট্টাচার্য, নইমুদ্দিন, প্রশান্ত সিংহ, পরিমল দে, হাবিব | ম্যাচটায় মোহনবাগান জিতেছিল চুনী গোস্বামীর গোলেই। দ্বিতীয়ার্ধে অশোক চট্টোপাধ্যায়ের থেকে বল পেয়ে পেনাল্টি এরিয়ার বাইরে থেকে বাঁক খাওয়ানো শট নিয়েছিলেন | তাতেই পরাজিত হয় থঙ্গরাজ । গোলের পরে ইডেনে মোহনবাগান সমর্থকরা চেঁচিয়ে উঠেছিলেন। তার মিনিটখানেক পরেই চিৎকার উঠল মহমেডান মাঠ থেকে। ভাবলেন ওই মাঠেও হয়তো গোল হল। পরে জানলাম, তার গোলেই ওদের আনন্দ। ম্যাচ শেষে মোহনবাগানের সমর্থকদের সঙ্গে মহমেডান সমর্থকরাও চুনী গোস্বামীকে কাঁধে নিয়ে সে দিন নেচেছিল । সে দিন রাতে বাড়ি ঢুকেই পেলেন পাড়া মাত করা মোগলাই খানার গন্ধ। প্রচুর বিরিয়ানি, কাবাব। পাঠিয়েছেন মহমেডান ক্লাবের কর্তা ও সমর্থকরা। প্রায় পঞ্চাশ জনের খাবার। কিন্তু এত খাবার কে খাবে ? পাড়ার ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ডাকলে ভাবতে পারে মজা করছি। তাই তাদের আর ডাকতে যাননি। শেষ পর্যন্ত মোহনবাগানের বন্ধুদের ডেকেই সেই নৈশভোজ সেরেছিলেন তার যোধপুর পার্কের বাড়িতে।

১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ অবধি মোহনবাগানের অধিনায়ক ছিলেন তিনি । এই সময়ে মোহনবাগান ডুরান্ড কাপ সহ বহু প্রতিযোগিতায় ভাল ফল করেছিল। তার ফুটবল জীবনের সবথকে বড় কৃতিত্ব ভারতের অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে জাকার্তায় এশিয়ান গেমসের সোনা জয়। ফাইনালে ভারত দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে পরাস্ত করেছিল। গোলদুটি করেছিলেন পি কে ব্যানার্জী এবং জার্নেল সিং। এছাড়া তিনি অধিনায়ক হিসাবে তেল আভিভে এশিয়া কাপের রৌপ্য পদক জয় করেছিলেন |

আরো পড়ুন:  বাবা ফাস্ট ফুডের দোকান চালান, সাঁতারে দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন বাংলার সায়নী ঘোষ

ফুটবল খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পরে চুনী গোস্বামী ক্রিকেট খেলায় মনোনিবেশ করেন এবং রঞ্জি ট্রফিতে তিনি বাংলার অধিনায়কত্ব করেন। তিনি দুবার রঞ্জি ট্রফির ফাইনাল খেলেছিলেন। তিনি ডানহাতি ব্যাটসম্যান ছিলেন এবং ডানহাতে মিডিয়াম পেস বল করতেন। তিনি ৪৬টি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ম্যাচ খেলে একটি সেঞ্চুরি সহ ১৫৯২ রান করেছিলেন। তিনি বল করে ৪৭টি উইকেটও নিয়েছিলেন ।

১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে চুনী গোস্বামী অর্জুন পুরস্কার এবং ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০০৫ সালে তিনি মোহনবাগান রত্ন পান। এই বছর চুনী গোস্বামীর নামে ‘মাই স্ট্যাম্প’ বের করছে ভারতীয় ডাক বিভাগ। ১৫ জানুয়ারি মোহনবাগান রত্নের ৮২ তম জন্মদিন উপলক্ষে সেই ‘স্ট্যাম্প’ প্রকাশ করা হবে। দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে কিংবদন্তি ফুটবলারের বাড়িতে এই অনুষ্ঠান হবে | চুনী গোস্বামী সারাজীবন মোহনবাগান ক্লাবেই খেলেছেন | ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল প্রয়াত হন চুনী গোস্বামী |

তথ্য – উইকিপিডিয়া, এই সময়, আনন্দবাজার পত্রিকা

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।