বুকের উপর হাতি তোলার জন্য কিংবদন্তি ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি ভবেন্দ্রমোহন সাহাকে

বুকের উপর হাতি তোলার জন্য কিংবদন্তি ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি ভবেন্দ্রমোহন সাহাকে

অনেক পুরোনো দিনের কথা | অতীন্দ্রকৃষ্ণ বসু ওরফে ক্ষুদিবাবুর আখড়াতে ব্যায়াম শিখতে আসলেন এক বালক | নাম ভবেন্দ্রমোহন সাহা | জন্ম ১৮৯০ সালে কলকাতার বিডন স্ট্রীটে | ভবেন্দ্রমোহন ছোট থেকেই ভবানী বলে পরিচিত ছিলেন। নয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম | তার পিতা উপেন্দ্রমোহন সাহাও শরীরচর্চা করতেন | তাই ছোট থেকেই শরীরচর্চার প্রতি আকর্ষণ ছিল ভবেন্দ্রমোহন সাহার |শরীরচর্চার পাশাপাশি ক্ষুদিবাবুর কাছে লেখাপড়াও করতেন সেই বালক | তবে পড়াশোনার থেকে শরীরচর্চাতেই বেশি মন ছিল সেই বালকের | ব্যাপারটা ক্ষুদিবাবুর নজর এড়াল না | এই ক্ষুদিবাবুই পরবর্তীতে তিনিই সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন | এরই মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেন ভবেন্দ্রমোহন | শরীর ভেঙে গেল তার | দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ঠিক হন তিনি | তবে ম্যালেরিয়ায় ভুগে একদম শীর্ণকায় হয়ে পড়েন তিনি | এই সময় তার এক পরিচিত ছেলে কোনও এক কারণে তাকে বেদম প্রহার করে | এই ঘটনা বদলে দেয় তার জীবন | নিজের উপর রাগে ও হতাশায় ক্ষুদিবাবুর কাছে ফিরে যান ভবেন্দ্রমোহন | ক্ষুদিবাবু তাকে কুস্তি শেখাতে লাগলেন | কুস্তি রপ্ত করলেন সহজেই | ওই বয়সেই হারিয়ে দিতেন কলকাতার বাঘা বাঘা পালোয়ানকে | এরপর তিনি কুস্তি শিক্ষা করার জন্য দর্জিপাড়ায় ক্ষেতুবাবুর আখড়ায় ভর্তি হন | সেখানে দিনরাত পরিশ্রম করতে লাগলেন তিনি | চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ভবেন্দ্রমোহন রপ্ত করেন কুস্তি |

তখন ভবেন্দ্রমোহনের বয়স মাত্র উনিশ বছর | কলকাতায় সার্কাসের দল নিয়ে খেলা দেখতে আসেন ভারতের প্রসিদ্ধ কুস্তিগীর প্রফেসর রামমূর্তী | ভবেন্দ্রমোহনের খুব ইচ্ছা ছিল প্রফেসর রামমূর্তীর দলে যোগ দেবার | কিন্তু উপায় ? ভবেন্দ্রমোহনকে তো আর চেনেন না প্রফেসর রামমূর্তী ! ভবেন্দ্রমোহন হাজির হলেন সার্কাসের তাঁবুতে | সেখানে তখন হাজার হাজার দর্শকের ভিড় | ভবেন্দ্রমোহন তাঁবুর পাশাপাশি ইতস্ততঃ ঘুরছেন এমন সময় রামমূর্তী তাকে দেখতে পান | ভবেন্দ্রমোহনের বলিষ্ঠ চেহারায় মুগ্ধ হন প্রফেসর রামমূর্তী | তিনি ভবেন্দ্রমোহনকে তার সার্কাসের দলে নিয়ে নেন | এদিকে ভবেন্দ্রমোহনের বাবা তখন প্রয়াত | মাকে সার্কাসে চাকরির কথা বললে মা কখনই রাজি হবেন না | তাই কাউকে কিছু না বলেই প্রফেসর রামমূর্তীর সার্কাসের দলে যোগ দিয়ে রেঙ্গুনে পাড়ি দেন ভবেন্দ্রমোহন |

আরো পড়ুন:  মানতে পারেননি দেশভাগ,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তথ্যচিত্রও বানিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক

 

বারবেল উত্তোলনরত ভীম ভবানী

প্রফেসর রামমূর্তীর সাথে ভবেন্দ্রমোহন রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর হয়ে জাভায় পৌঁছান | সেখানে জনৈক ওলন্দাজ কুস্তিগীর প্রফেসর রামমূর্তীর সাথে কুস্তি লড়তে ইচ্ছা প্রকাশ করেন | ভবেন্দ্রমোহন প্রস্তাব দেন যদি সেই ওলন্দাজ কুস্তিগীর তাকে পরাজিত করতে পারেন তাহলেই প্রফেসর রামমূর্তী স্বয়ং লড়বেন | রামমূর্তী তাতে রাজি হন | ভবেন্দ্রমোহন তিন মিনিটের মধ্যে ওলন্দাজ কুস্তিগীরকে পরাজিত করেন | ভবেন্দ্রমোহন প্রফেসর রামমূর্তীর সার্কাসে বেশি দিন থাকেননি। সেখানে স্বাধীনভাবে খেলা দেখানোর তেমন সুযোগ তিনি পাচ্ছিলেন না।শীঘ্রই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রফেসর বোসের সার্কাসে খেলা দেখাতে থাকেন | এরপর প্রফেসর কে বসাকের বিশ্ববিখ্যাত হিপোড্রোম সার্কাসে যোগ দেন ভবেন্দ্রমোহন | সেখানে তিনি স্বাধীনভাবে খেলা দেখতে থাকেন |

দৈনিক কি খেতেন ভবেন্দ্রমোহন সাহা?
প্রতিদিন সকালে ভবেন্দ্রমোহন ২০০টি বাদামের শরবত এবং এক ছটাক গাওয়া ঘি খেতেন | প্রাতঃরাশে থাকত দুই সের মাংস।দুপুরে সাধারণ ডাল ভাত খেতেন | বিকেলে বিভিন্ন ফলমূল ৫০ টি বাদামের শরবত ও এক সের মাংস। রাতে খেতেন আধ সের আটার রুটি ও তিন পোয়া মাংস |

প্রতিদিন কঠিন পরিশ্রম করতেন ভবেন্দ্রমোহন | রোজ পাঁচ মন ওজনের বারবেল অনায়াসে ভাঁজতেন | সিমেন্টের পিপের উপর পাঁচ সাত জন লোককে বসিয়ে, সেই পিপে দাঁত দিয়ে কামড়ে শূন্যে তুলে ঘোরাতেন। বুকের উপর ৪০ মণ ওজনের পাথর চাপিয়ে তার উপর ২০-২৫ জন লোকের বসার ব্যবস্থা করতেন।লোহার শেকলে আবদ্ধ থেকেও তার ভেঙে ফেলতেন | বুক ও উরুর উপর দিয়ে একসাথে দু’টি গরুর গাড়ি যেতে পারত | প্রতিটিতে ৫০ জন লোক থাকত | দু’খানা চলন্ত মোটর গাড়িকে আটকে রাখতে পারতেন ভবেন্দ্রমোহন সাহা |

বুকের উপর হাতি তুলেছেন ভবেন্দ্রমোহন সাহা

সার্কাসে এইসব খেলা দেখাতেন ভবেন্দ্রমোহন | তার খেলায় বিস্মিত হতেন সকলে | কিছুদিন পর তিনি হিপোড্রোম সার্কাসের সঙ্গে এশিয়া ভ্রমণ করেন।সিঙ্গাপুরে তিনি জি সি হাইডের সাথে কুস্তি লড়েন | চীনের সাংহাইতে বেন ফাসমার নামক জনৈক মার্কিন পালোয়ান তাকে কুস্তি লড়াই করার জন্যে ১০০০ ডলার বাজি ধরেন | কুস্তিতে মার্কিন পালোয়ানকে পরাজিত করেন ভবেন্দ্রমোহন সাহা | শর্ত অনুযায়ী ১০০০ ডলার দিতে বাধ্য হন সেই মার্কিন পালোয়ান | কিন্তু সেই হারের যন্ত্রনা ভুলতে পারেননি সেই মার্কিন পালোয়ান | তিনি ভবেন্দ্রমোহনকে খুনের চেষ্টা করেন | ভবেন্দ্রমোহন সাংহাইয়ের কন্‌সালের শরণাপন্ন হন | সাংহাইয়ের কন্‌সাল তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন | এরপর কন্‌সাল নিজে ভবেন্দ্রমোহনের শক্তি পরীক্ষা করতে চান | ঠিক হয় কন্‌সাল মোটর গাড়ি চালাবেন এবং ভবেন্দ্রমোহন যদি তা থামাতে পারেন, তা হলে সেই মোটর গাড়ি পুরস্কার পাবেন | ভবেন্দ্রমোহন কন্‌সালের চলন্ত মিনার্ভা মোটর গাড়িকে থামাতে সক্ষম হন এবং কনসাল খুশি হয়ে তাকে সেই মিনার্ভা মোটর গাড়িটি উপহার দেন | জাপান ভ্রমণকালে সম্রাট মাৎসুহিতো তার দৈহিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাকে একটি স্বর্ণপদক ও ৭৫০ টাকা পুরস্কার দেন।

আরো পড়ুন:  আই লিগ চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান,সবুজ-মেরুন আলোয় সাজতে চলেছে হাওড়া ব্রিজ

এরপর ভবেন্দ্রমোহন দেশে ফিরে আসেন এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তার শারীরিক দক্ষতার প্রদর্শন করেন।ভরতপুরের মহারাজা তাকে তিনটি মোটর গাড়ি থামাবার আহ্বান জানান এবং ১০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। কথা মত তিনটি মোটর গাড়িতে যথাক্রমে মহরাজা, তার রাজ্যের রেসিডেন্ট ও তার মন্ত্রী চেপে বসলেন। ভবেন্দ্রমোহন গাড়িগুলোর পেছনে মোটা দড়ি বেঁধে অন্য প্রান্তগুলির দু’টি তার হাতে ও অন্যটি নিজের কোমরে শক্ত করে বাঁধলেন। ভবেন্দ্রমোহন ইঙ্গিত করলেই তারা তিনজন একযোগে গাড়ীর ইঞ্জিন চালু করলেন, কিন্তু একটি গাড়িও এক চুল নড়ল না। খুশি হয়ে ভরতপুরের মহারাজা তাকে ১০০০ টাকা পুরস্কার দেন |

 

বাঘছাল পরিহিত ভীম ভবানী

একবার মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন নবাবের হাতীশালে একটি বুনো হাতী আনা হয়, উচ্চতায় নয় ফুট সাত ইঞ্চি। নবাব ভবেন্দ্রমোহনকে হাতিটা বুকের উপর নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ভবেন্দ্রমোহন প্রফেসর রামমূর্তীর কাছে সার্কাসের পোষ মানানো হাতি বুকে তোলার কৌশল শিখেছিলেন। তার হাতি তোলার একটা বিশেষত্ব ছিল। সাধারণতঃ ভারোত্তলকদের বুকের উপর একটি কাঠের তক্তা নির্মিত সেতু ঢালু করে রাখা থাকত এবং তার উপর দিয়ে হাতি হেঁটে চলে যেত। কিন্তু ভবেন্দ্রমোহনের ক্ষেত্রে হাতি তক্তা নির্মিত সেতুর মাঝামাঝি আসলে পুরো এক মিনিট সেখানে অবস্থান করত।ভবেন্দ্রমোহন নবাবের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং কৃতকার্য হন। বাংলার গভর্নর ভবেন্দ্রমোহনের এই সাফল্যে অবাক হয়ে যান এবং পুরস্কার দেন | এরপর ভবেন্দ্রমোহন প্রফেসর কে বসাকের সার্কাস ছেড়ে দেন। তিনি আগাসীর সার্কাসে সপ্তাহে ১৫০ টাকা বেতনে খেলা দেখাতে শুরু করেন। তারপর কিছু দিন নিজেই একটা ছোট সার্কাসের দলও চালিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন:  জেদ ধরে জেলে সরস্বতী পুজো করিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

ভবেন্দ্রমোহন সাহা বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি মোট ১২০ খানা স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক লাভ করেন। এছাড়াও পুরস্কার স্বরূপ শাল, আলোয়ান, আংটি, মোটর গাড়ি ও নগদ টাকাও পেয়েছিলেন। একবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক স্বদেশী মেলায় তিনি তার দৈহিক শক্তি প্রদর্শনের আহ্বান পান। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, অমৃতলাল বসু প্রমুখ। তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে রসরাজ অমৃতলাল বসু তাকে মহাভারতের ভীমের সাথে তুলনা করেন এবং তাকে কলিকালের ভীম বলে বর্ণনা করেন।তিনি তার ডাকনাম ‘ভবানী’-র পরিবর্তে তাকে ‘ভীম ভবানী’ বলে সম্বোধন করেন। সেই থেকে ভবেন্দ্রমোহন “ভীম ভবানী” নামেই পরিচিত হন। বুকের উপর হাতি তোলার জন্য কিংবদন্তিতে পরিণত হন “ভীম ভবানী” ওরফে ভবেন্দ্রমোহন সাহা |

১৯২২ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ভবেন্দ্রমোহন সাহার | একসময় গোটা বিশ্বে শরীরচর্চায় বাঙালির নাম ছিল | কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই সুনাম হারিয়ে গেছে | বাঙালির জীবন থেকে আজকাল হারিয়েই গেছে শরীরচর্চা |

তথ্য : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।