বুকের ওপর ওঠাতেন চলন্ত গাড়ি,যোগকে বিশ্বের দরবারে প্রথম পৌঁছে দিয়েছিলেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ

বুকের ওপর ওঠাতেন চলন্ত গাড়ি,যোগকে বিশ্বের দরবারে প্রথম পৌঁছে দিয়েছিলেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ

উত্তর কলকাতা | এই উত্তর কলকাতার প্রতিটি গলিতেই রয়েছে ইতিহাস | উত্তর কলকাতার গড়পাড় ধরে এগোলেই চোখে পড়বে লাল রঙের একটি বাড়ি | বাড়িটির ঠিকানা ৪/২ নম্বর , রামমোহন রায় সরণি | বাড়িটির সামনে বড় বড় করে লেখা ঘোষ যোগা কলেজ | কে এই ঘোষ ? আসলে এই বাড়িটি ব্যায়ামাচার্য বিষ্ণুচরণ ঘোষ ওরফে বিষ্টু ঘোষের পৈতৃক বাড়ি | বাড়িটির লাগোয়া প্রশস্ত মাঠটিই সেইসময় বিষ্ণুবাবুর আখড়া ছিল | উত্তর কলকাতায় শরীরচর্চার জগতে তখন দুটি শিবির পাল্লা দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে – একটি হল যতীন্দ্র চরণ গোহ বা গোবর গোহের শিবির ,অন্যটি বিষ্টু ঘোষের শিবির ।

ব্যয়ামাচার্য বিষ্ণুচরণ ঘোষ অখণ্ড ভারতের লাহোরে ১৯০৩ সালের ২৪শে জুন জন্মগ্রহণ করেন | বাবা ভগবতীচরণ ঘোষ ও মা জ্ঞানপ্রভা ঘোষ | আট ভাই বোনের মধ্যে বিষ্ণুচরণ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ । অতি অল্পবয়সে মাতৃহারা হওয়ার জন্য বিষ্ণুচরণ সেই সময় অতি দুর্বল ছিলেন । ১৯১৫ সালের একটি টেলিগ্রাম তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল , আর সেই টেলিগ্রামটা করেছিলেন বিষ্ণুচরণের জ্যাঠতুতো দাদা মুকুন্দলাল ঘোষ । এই মুকুন্দলালই পরবর্তীকালে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরমহংস যোগানন্দ নামে জগদ্বিখ্যাত হন । এই টেলিগ্রামে লেখা ছিল, ‘ বিষ্ণু ! রাঁচি স্কুলে চলে এসো |’ দাদার কথা শুনে রাঁচি গেলেন বিষ্ণুচরণ | ভর্তি হলেন তাঁর দাদার প্রতিষ্ঠিত রাঁচি স্কুল অফ বয়েজ-এ | এই বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের আশ্রমিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করা হত এবং তার সাথে শরীরচর্চা,যোগ শিক্ষা | ১৪ বৎসর বয়স থেকেই বিষ্ণুচরণের স্বাস্থ্যোদ্ধার হতে থাকে |

আরো পড়ুন:  নিজে গুলি খেয়েও নেতাজিকে বাঁচিয়েছিলেন কর্নেল নিজামুদ্দিন

রাঁচি থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক অধিকর্তা আর.এন.গুহ ঠাকুরতার ( পুরো নাম রাজেন্দ্র নারায়ণ গুহঠাকুরতা যদিও উনি রাজেন গুহ ঠাকুরতা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন) কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ | মাত্র তিন মাসে ওনার ৩২ পাউন্ড ওজন বৃদ্ধি পায় এবং বুকের ছাতিও নয় ইঞ্চি বৃদ্ধি পায় | বিষ্ণুচরণের চেহারা দেখে গড়পার রোডের আরেক বিখ্যাত বাঙালি যুবক সুকুমার রায় বিষ্ণুচরণকে নিয়ে একটি কবিতা লেখেন ‘পালোয়ান’ নাম দিয়ে। সেই কবিতায় বিষ্ণুচরণের নাম ষষ্ঠীচরণ । সুকুমার রায় লেখেন –
” খেলার ছলে ষষ্ঠিচরণ হাতী লোফেন যখন তখন,
দেহের ওজন উনিশটি মণ, শক্ত যেন লোহার গঠন । ”

বিষ্ণুচরণ প্রাচীন ক্রিয়াযোগেও দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন । মাত্র ২১ বছর বয়সেই বিষ্ণুচরণ বডিবিল্ডিংয়ের সঙ্গে ক্রিয়াযোগের সমন্বয় সাধন করে এক নতুন শরীরচর্চার ঘরানা সৃষ্টি করেন ।বিষ্টুচরণ ঘোষ সৃষ্ট সেই ঘরানার নাম ‘ ঘোষ টেকনিক ‘।এই টেকনিক পরবর্তীকালে পৃথিবী বিখ্যাত হয়। বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস করতেন যে ভার উত্তোলন ও বডি বিল্ডিং এর সাথে কেউ যদি যোগের সমন্বয় করতে পারে তাহলে শরীর এবং মন দুইয়েরই উন্নতি সাধন হবে। এই তত্ত্ব তাকে ভারতের ‘ফিজিক্যাল কালচার’ আন্দোলনের প্রথম সারিতে নিয়ে আসে | এর পাশাপাশি বুকের উপর দিয়ে চলন্ত গাড়ি চলে যাওয়া, ১২ ফুট উপর থেকে পেটের উপরে ব্যক্তির ঝাঁপ, লোহার দন্ডকে একটি কুণ্ডলে পরিণত করা ইত্যাদি খেলাও দেখাতেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ ।

আরো পড়ুন:  প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন ‘মাখনলাল দাস এন্ড সন্স’ - এ আজও পাওয়া যায় দু টাকা দামের সন্দেশ

আইন পড়ার সময় বিষ্ণুচরণ তারই এক কলেজের বন্ধুর সাথে মিলে ‘Muscle Control and Barbell Exercise’ নামে একটি বই লিখে ফেলেছিলেন | এই বইতে মাংসপেশীকে কিভাবে আরও সুগঠিত বানানো যায় এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা যায়, সেই পদ্ধতিগুলি আলোচনা করেন | পরবর্তীকালে বিষ্ণুচরণ নিজেই কলকাতায় ঘোষ কলেজ অব যোগা অ্যান্ড ফিজিক্যাল কালচার প্রতিষ্ঠিত করেন | এখানেই তিনি যোগ শেখাতেন | বিষ্ণুচরণ ঘোষ ৮৪ টি হঠ যোগ ভঙ্গির উদ্ভাবন করেন | বিষ্ণুচরণ ভারতীয় অলিম্পিক কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তিনি জাপানে যোগের প্রচলন করেছিলেন এবং আমেরিকাতেও যোগের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন | বিষ্ণুচরণ ঘোষের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছাত্ররা হলেন মনতোষ রায়(প্রথম ভারতীয় মিস্টার ইউনিভার্স), বুদ্ধ ঘোষ, বিক্রম চৌধুরি।

বিষ্ণুচরণ ভারতীয় অলিম্পিক কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তিনি জাপানে যোগের প্রচলন করেছিলেন এবং আমেরিকাতেও যোগের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন | যোগকে বিশ্বের দরবারে প্রথম পৌঁছে দিয়েছিলেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ |এছাড়াও ক্রিয়াযোগ অভ্যাস করে তিনি একজন যোগী তথা সাধকে পরিণত হন । বিষ্ণুবাবু তাঁর উদ্ভাবিত ঘরানাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিজের বাড়িতেই আখড়া তৈরী করেছিলেন ,যা বর্তমানে ঘোষ যোগা কলেজ নামে প্রসিদ্ধ । বিষ্ণুচরণ শুধু ব্যায়ামাচার্য একথা বললে অত্যন্ত অন্যায় করা হবে । তিনি কলকাতা হাইকোর্টের একজন প্রথিতযশা উকিলও ছিলেন । বডিবিল্ডিংয়ের পাশাপাশি তাঁর আইন সংক্রান্ত লেখা বইগুলোও (মাননীয় বিচারক) অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল । ৬৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের ৮ই জুলাই প্রয়াত হন বিষ্ণুচরণ ঘোষ | তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র ব্যায়ামবিদ ও যোগবিদ বিশ্বনাথ ঘোষ বাবার প্রতিষ্ঠিত কলেজের দায়িত্ব নেন এবং হঠ যোগ ও শারীরিক শিক্ষার বিশ্ব জুড়ে প্রচার ও প্রসার করেন। বর্তমানে পরিবারের সই ধারা অব্যাহত রেখে চলেছেন বিষ্ণুচরণের নাতনি মুক্তমালা।

আরো পড়ুন:  ইংল্যান্ডের রাণী শৈলেন মান্নার পায়ে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন পা সত্যিই রক্ত-মাংসের নাকি লোহার !

একাধারে প্রথিতযশা উকিল অন্যদিকে ব্যায়ামাচার্য্য এবং ক্রিয়াযোগী বিষ্ণুবাবু আজও বাঙালী তথা ভারতীয় ব্যায়ামবীরদের কাছে ঈশ্বরতুল্য হয়ে আছেন | যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালির শরীরচর্চা |

তথ্য : উইকিপিডিয়া,সাহেব বিবি গোলাম ব্লগ

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।