বুলগেরিয়ার জাতীয় খাদ্য “দই” হয়ে উঠল বাঙালির পরমপ্রিয়

বুলগেরিয়ার জাতীয় খাদ্য “দই” হয়ে উঠল বাঙালির পরমপ্রিয়

“খাই খাই করো কেন
এসো বোসো আহারে,
খাওয়াব আজব খাওয়া
ভোজ কহে যাহারে!”
শুক্তো, ভাজা, ডাল, দোলমা, ঝোল, ঝাল, কালিয়া, পাতুরি, অম্বল….. বাঙালি বাড়ির ভোজ মানে এগুলো থাকবেই। আসলে বাঙালির মত খাদ্যপ্রিয়, সর্বভুক জাতি খুব কমই আছে। তাই বাঙালির ভোজ মানে তা মহাভোজই। তবে হ্যাঁ, ভোজে যাই থাকুক না কেন শেষপাতে যদি একটু দই না থাকে তাহলে তা ঠিক সম্পূর্ণ হয় না। অনেকের আবার লাল দইও খুব পছন্দের। যাইহোক, সাদা কিংবা লাল, বিয়ে থেকে অন্নপ্রাশন, জন্মদিন থেকে উপনয়ন কিংবা পুজো অর্চনা… যতই আইসক্রিম বা কুলফির ফিউশন আসুক না কেন মিষ্টি দই সবার সেরা।

দই সারাভারতে মিললেও বাঙালির পছন্দের মিষ্টি দই কিন্তু আবার বাংলা ছাড়া সেভাবে কোথাও পাবেন না। বাংলার বাইরে থাকা মিষ্টি দই প্রেমী অনেকেই তাই বাংলা থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়ার সময় এখানকার মিষ্টি দই অবশ্যই কিনে নিয়ে যান। তবে অবাক কান্ড কী জানেন, এই যে আমরা বাঙালিরা দই নিয়ে এত হইহই করি, আদপে দইয়ের উৎস কিন্তু মোটেও বাংলা নয়! এমনকী ভারতেই দইয়ের উৎপত্তি নয়। দইয়ের পরিচিতি গোটা দুনিয়া জুড়ে। দুগ্ধজাত এই খাবারটির বয়স কমপক্ষে চার হাজার বছর তো হবেই। এবার প্রশ্ন, দুধ ও ব্যাকটেরিয়ার যুগলবন্দীতে তৈরি এই খাবারটির সঙ্গে পুরো দুনিয়ার পরিচয় ঘটল কোন দেশ? উত্তরটি হল বুলগেরিয়া !

আরো পড়ুন:  এই বাঙালি স্থপতির হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর জয়পুর

আশ্চর্য লাগলেও বুলগেরিয়ার প্রায় সব খাবারেই দইয়ের স্বাদ পাওয়া যাবে। তা আবার শুধু এক রকমের দই নয়, নানা পদের নানা স্বাদের দই। যেমন, বুলগেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার হল ট্যারাটর নামের একরকমের ঠান্ডা স্যুপ যার মূল উপাদানই হল দই। বুলগেরিয়ানরা সব সময়ের খাওয়াতেই দই ব্যবহার করে। সকালের জলখাবার থেকে শুরু করে দুপুরবেলার খাওয়া, সন্ধেবেলা স্ন্যাকসের সঙ্গেও এমনকি রাতের খাবারেও তারা দই খুবই পছন্দ করে।

এবার প্রশ্ন, বুলগেরিয়ায় দই এল কীভাবে? এই কাহিনী কিন্তু বেশ পুরনো। শোনা যায়, প্রায় চার হাজার বছর আগে যাযাবর জাতি নোমাডিকদের হাত ধরে বুলগেরিয়ায় দইয়ের প্রচলন। এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা এই নোমাডিকরা দুধ রাখত প্রাণীর চামড়া দিয়ে বানানো থলি বা ব্যাগে। বলাবাহুল্য, এই পদ্ধতি ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টির পক্ষে একদম আদর্শ। এই ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে গাঁজন প্রক্রিয়ায় থলিতে রাখা দুধ হয়ে যেত দই। ঐতিহাসিকদের মতে, সমসাময়িক সময়ে একইভাবে হয়তো আরও কিছু অঞ্চলে দইয়ের প্রচলন ঘটে। সেদিক থেকে প্রথম দই বানানোর দাবিদার নিশ্চিতভাবেই মধ্য প্রাচ্য, মধ্য এশিয়া আর বুলগেরিয়ার বাইরে নয়। তবে যে অঞ্চলই হোক না কেন, বুলগেরিয়া যে বাণিজ্যিকভাবে পশ্চিমি দেশগুলোকে প্রথম দই খাইয়েছে, তা নিয়ে কিন্তু কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

আরো পড়ুন:  সাহেবদের কলোনিয়াল খাবার আর ভারতীয় মশলার মিশেল ১৩০ বছরের পুরোনো এ্যালেন কিচেনে

তবে দই হওয়ার জন্য ঠিক কোন ব্যাকটেরিয়া দায়ী তা আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী ড. স্টামেন গ্রিগোরভ। ১৯০৪ সালে গ্রিগোরভ তখন জেনেভার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সময় দই নিয়ে পরীক্ষাগারে দীর্ঘ এক বছর ঘাম ঝরানোর পর গ্রিগোরভ আবিষ্কার করেন, গাঁজন প্রক্রিয়ায় দুধ থেকে দই হতে ঠিক কোন ব্যাকটেরিয়া দায়ী। আবার ইউনিভার্সিটি অব প্লোভডিভের জাতিতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইলিতসা স্টোইলোভা জানান, বলকান অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় দই এবং লস্যি থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশে দই এবং লস্যি তৈরি হলেও বুলগেরিয়ায় নির্দিষ্ট একটি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা এবং পদ্ধতি অনুসরণ করতে না পারলে এর গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখা যায় না। তাই বলাই যায়, পশ্চিমীদের কাছে দই এবং লস্যি জনপ্রিয় করতে বুলগেরিয়ার ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ ।

আরো পড়ুন:  ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রিয় তেলেভাজার দোকান আজও রয়েছে বরানগরে

গ্রিগোরভের দই নিয়ে আবিষ্কারকে সম্মান করে তাঁর জন্মভূমি বুলগেরিয়ার ত্রার্নেতে একটা জাদুঘরও বানানো হয়। দই নিয়ে এটাই পৃথিবীর একমাত্র জাদুঘর! দইয়ের ব্যাপক চাহিদার জন্য ১৯৫৯ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ডেইরি ইন্ড্রাস্ট্রিজ তৈরি হয় বুলগেরিয়ায়। দই এবং লস্যি হয়ে উঠেছে বুলগেরিয়ানদের জাতীয় প্রতীক। তাহলে, বাঙালি নাকি বুলগেরিয়ান…… সর্বাপেক্ষা দই প্রেমী কোন জাতিকে বলা হবে? সেই প্রশ্ন থাকছে।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।