ব্রিটিশদের কলকাতায় গরীবদের চিকিৎসার জন্য গড়ে উঠেছিল ‘পুয়োর ফার্মেসী’

ব্রিটিশদের কলকাতায় গরীবদের চিকিৎসার জন্য গড়ে উঠেছিল ‘পুয়োর ফার্মেসী’

‘তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা’…….. গানটা আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। কিন্তু সত্যি সত্যি কখনও আমাদের শহরের রাস্তায় ইতিউতি হেঁটে দেখেছি? কাজ ছাড়া এই শহরকে চেনার জন্য ঘুরেছি? যদি ঘুরে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই এই শহরের আনাচে কানাচে হেলায় ছড়িয়ে থাকা মনিমানিক্যের মত নানা ইতিহাসের খোঁজ পাব।

এই যেমন কলেজ স্ট্রিট….. বইপাড়া হিসাবেই আমরা কলেজস্ট্রিটকে চিনি জানি। কিন্তু এছাড়া এর আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস সম্পর্কে সেভাবে জানি না। এই বইপাড়ার সামনেই কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট। এই রাস্তা দিয়েই আবার ট্রামলাইন চলে গেছে নাকবরাবর টানা শ্যামবাজারের দিকে। সেই দিকে কখনও হাঁটলে আসবে সিমলা বা বিবেকানন্দ রোড। এখানেই রয়েছে নরেন দত্ত মানে স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির দরজা। সেই বাড়িকে বাঁ দিকে রেখে ফুটপাথ ধরে একটু হাঁটলেই এক জীর্ণ গাড়ি বারান্দা বাড়ি মিলবে। এমন বাড়িরই জীর্ণ রং ঘষা দেওয়ালের গায়ে আবছা হয়ে যাওয়া সিমেন্ট রিলিফ অক্ষরে রয়েছে এক ইতিহাস! লেখা আছে ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী’, তার তলায় লেখা ‘স্থাপিত ১৯১৯ সাল।’ নামেই বোঝা যাচ্ছে, গরীবদের জন্য খোলা এক দাতব্য চিকিৎসালয়। বাড়ি বা এই নামের ফলক আজ কালের নিয়মে জরাজীর্ন হলেও এই ফার্মেসি স্থাপনের ইতিহাস কিন্তু ততটাই উজ্জ্বল।

আরো পড়ুন:  রক্তের অভাবে মৃত্যু হয়েছিল দিদির,সেই থেকে রক্তদানই একমাত্র নেশা বাপন দাসের

সময়টা ১৭৬৪ সাল। কোম্পানির কর্মকর্তারা তখন ব্যস্ত ভারত শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরিতে। ভারতের জল হাওয়ায়, রোগ ভোগের থেকে রেহাই পেতে কোম্পানির অফিসার, আমলা আর সেনাদের সঙ্গে আনা হতে লাগল বিলেতি ডাক্তারদেরও। এই ডাক্তারদের পরিচয় তখন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস-এর সদস্য ডাক্তার হিসাবে। কিন্তু এরপর যতদিন যেতে লাগল, তত পরিষ্কার বোঝা গেল এত এত ডাক্তার বিলেত থেকে আনা সম্ভব নয়। তাই ঠিক করা হল এখানকার ডাক্তারদেরই কাজে লাগানো হবে। সেই হিসাবেই পরবর্তীকালের মেডিক্যাল কলেজও হয়। ইউরোপীয় চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ শেখানো শুরু হল এদেশের শিক্ষার্থীদের। প্লেগ, কালাজ্বর, কলেরা, ম্যালেরিয়া-সহ বহুবিধ রোগের সঙ্গে লড়াইতে সেদিন পশ্চিমী পদ্ধতির প্রয়োগ দেশের মানুষের সামনে আশার আলো জাগালো।

আরো পড়ুন:  মৃত সন্তানের দেহের সামনে দাঁড়িয়েও কবিগুরুর গানের শুদ্ধতাকে নষ্ট হতে দেননি সুবিনয় রায়

তবে সেই সময় শুধু ডাক্তার নয়, ডাক্তারদের সঙ্গে তাঁদের সাহায্যকারী হিসাবে আরেকটি পেশাও এল, যাকে বলে কম্পাউন্ডার। ফার্মাসি বিদ্যায় দক্ষ এই মানুষগুলি সেদিন বিলিতি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগে দক্ষ ডাক্তারদের যোগ্য সহকারি। ওষুধের কম্পোজিশন, মাপজোক, প্রয়োগ পদ্ধতি, মিক্সচার তৈরির নিয়মকানুন, প্রয়োগের ঘড়ি নির্ধারণ সবই সেদিন ডাক্তারদের মতোই করে চলেছেন কম্পাউন্ডাররা। যদিও এই পেশার মানুষদের আজ আর দেখা মেলে না।

এবার আস্তে আস্তে দেখা গেল, কলকাতার গরীব মানুষও ধীরে ধীরে বিলিতি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু তাদের সামর্থ্য আবার খুবই কম ছিল। এই মানুষটা অর্থের অভাবে যদি ডাক্তার অবধি পৌঁছাতে নাও পারতেন, তবে দ্বারস্থ হতেন ধন্বন্তরি কম্পাউন্ডারদের। বিশ্বাস ছিল কম্পাউন্ডারবাবুর দুটো পুরিয়াই তার রোগের উপশম ঘটাবে। দক্ষ কম্পাউন্ডাররা রোগ ভালও করে দিতেন কিন্তু।

আরো পড়ুন:  অ্যাপেই মিলবে সাইকেল, করোনা আবহে নতুন পরিষেবা শুরু নিউটাউনে

এরকম অবস্থাতেই বেশ কিছু বড়ো বাড়ির দরদী ছেলেরা কলকাতার বুকে খুলে বসলেন ‘পুয়োর ফার্মেসী’। অন্তত যেখান থেকে রোগ বুঝে মিলবে ইউরোপীয় পদ্ধতির প্রয়োগিক চিকিৎসা ও ওষুধ। এমনই এক ফার্মেসী হল এই ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী।’ সেবার অঙ্গীকার নিয়েই এই ধরনের ফার্মেসী খোলা হয়েছিল। এতে বাস্তবিকই অনেক গরীব উন্নত চিকিৎসা পেতেন। বেশ কয়েক বছর এই ‘বসাকস পুয়োর ফার্মেসী’ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ফার্মেসী বন্ধ হলেও এমন ইতিহাস তো আর ফিকে হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়।

তথ্য : বঙ্গদর্শন

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।