বি.এন.দে,দে’জ মেডিক্যাল এবং ছয় দশকের উপর আধিপত্য বজায় রাখা ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’

বি.এন.দে,দে’জ মেডিক্যাল এবং ছয় দশকের উপর আধিপত্য বজায় রাখা ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’

জলে চুন তাজা আর তেলে? তেলে চুল তাজা – এ প্রবাদবাক্য তো আমাদের সকলেরই জানা। তা তেলে চুল তাজা থাকে বইকি, সে তেল যদি হয় খাঁটি ভেষজ পদ্ধতিতে তৈরী বিশুদ্ধ দেশীয় তেল। তাই তো সেই তেল প্রায় চৌষট্টি বছর ধরে ভারতীয় বাজারে বজায় রাখতে পেরেছে তার একচ্ছত্র রাজত্ব। নানা রকমারি ঝাঁ-চকচকে পশ্চিমী ব্র্যান্ডেড তেলের মধ্যিখানেও বাংলার ঘরে ঘরে মানুষের মন জয় করে রেখেছে এই তেলটি – স্বাস্থ্যকর একরাশ ঘন চুলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এক বাঙালীর হাত ধরে তার জন্ম – চুলের তেলের বাজারে তার পরিচয় ‘Jewel of the East’ – সে আমাদের বাঙালীর প্রাণের ‘কিও কার্পিন’।

ভারতবর্ষের আবিষ্কৃত ভেষজ পদ্ধতিতে রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই প্রস্তুত হয়েছে এই তেল – এমনই দাবী করেছিল কিও কার্পিন তার প্রথমদিকের বিজ্ঞাপনে। কিন্তু কিভাবে শুরু হল তার পথচলা?

সময়টা ছিল বড় অস্থির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজেছে বিশ্বজুড়ে। তখন ১৯৪১ সাল। কলকাতা তথা বাংলার বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় ওষুধের আকাল দেখা দিয়েছে। কারণ যুদ্ধে আহত সৈনিকদের শুশ্রুষার জন্য ব্রিটিশ সরকার বাংলার বাজার থেকে তুলে নিয়েছে ওষুধ। এই দুঃসময়ে এগিয়ে এলেন এক বাঙালী। তিনি বি.এন.দে। প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং গৌরমোহন দত্তের মানব- সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত বি.এন.দে একটি ছোট দোকান খুলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ শুরু করলেন। এভাবেই জন্ম নিল বেঙ্গল কেমিক্যালস আর জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস্- এর উত্তরসূরী আরও একটি নিখাদ বাঙালী স্বদেশী ঔষধ-কোম্পানী ‘দে’জ মেডিক্যাল’। আরও ১৫ বছর পর, ১৯৫৬ সালে তাঁরা উৎপাদন করলেন তাঁদের নিজস্ব প্রোডাক্ট – সম্পূর্ণ ভেষজ পদ্ধতিতে তৈরি তেল ‘কিও কার্পিন’।

আরো পড়ুন:  সুইডেনের সর্ববৃহৎ হোটেল চেন "এলিট হোটেলস অফ সুইডেন" এর মালিক এই বঙ্গসন্তান

প্রথম থেকেই মাথার তেলের বাজারে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কিও কার্পিন। তার প্রধান কারণ ছিল দুটি। প্রথমত, এতদিন পর্যন্ত চুলে মাখার ভাল তেল মানেই ছিল ঘন চটচটে তেল। কিও কার্পিন সেই ধারণায় বদল আনল। এত হালকা অথচ সুগন্ধি তেলে মাথায় আরাম পেল সাধারণ মানুষ। তেল মেখেও যে চুলে ফ্যাশন করা যায়, সে ধারণা ইতিপূর্বে ছিল কল্পনাতীত। অথচ এখন তা কত সহজ এবং ঘোর বাস্তব! আর দ্বিতীয় কারণ ছিল তাদের অভিনব বিজ্ঞাপন পদ্ধতি। ‘With strict control over raw materials and manufacturing, Keo Karpin is the healthy oil.’ প্রথম থেকেই কিও কার্পিন ঘোষণা করেছিল, শুধু সাজ নয়, চুলের স্বাস্থ্যের দিকেও থাকবে তার সমান নজর। বাংলার বাজার জয় করে নিল সে। কুড়ি বছর রমরমিয়ে ব্যবসা করার পর যখন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে বিশ্বব্যাপী নির্ধারিত মানে ওষুধ বিক্রির ফলে ওষুধ ব্যবসায় দে’জ মেডিক্যাল পিছু হটতে শুরু করল, তখন কিছুটা বাণিজ্যিক লাভের কথা মাথায় রেখেই জন্ম নিল ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’। সঙ্গে বদলাল বিজ্ঞাপনের স্ট্র্যাটেজি। কারণ ততদিনে মার্কেটিং এর সেরা অস্ত্র এসে গেছে বাঙালীর ঘরে। টেলিভিশন। টিভি’র বিজ্ঞাপন আর ‘হামেশা রেডি’ কিংবা ‘হেয়ার কা ইনশিওরেন্স করো – রোজ কিও কার্পিন করো’-র মতো মনোগ্রাহী ট্যাগলাইন আবার বাংলার বাজারে নতুন করে জনপ্রিয় করল তাকে। ফল মিলল অচিরেই। ১৯৮৯ সালেই ২০ কোটি টাকার লাভের মুখ দেখল ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’। ভারতের বাজারও জয় করতে শুরু করল এই ব্র্যান্ড।

আরো পড়ুন:  একরাতে দৌড়ে নারায়ণগড় থেকে মেদিনীপুরে এসেছিলেন প্রফুল্ল চাকী,পায়ে বিঁধেছিল ৩২ টি কাঁটা

তবে নব্বইয়ের দশকের শেষে প্যারাশ্যুট নারকেল তেলের সাথে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার কারণে আবারও খানিক মন্দার মুখোমুখি হয় এই কোম্পানী। তখন অবস্থা সামাল দিতে ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’ বাজারে আনল আরও দুটি প্রোডাক্ট – কিও কার্পিন হেয়ার ভাটিলাইজার আর স্কিন কেয়ার। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। আবারও উথ্থান আরম্ভ হল ব্র্যান্ড ‘কিও কার্পিন’-এর। সঙ্গে দে’জ মেডিক্যাল প্রথম বাজারে নিয়ে এল মাত্র দশ টাকায় ছোট্ট PET জারে তেল – আরো সহজলভ্য হল কিও কার্পিন। সাথে বিভিন্ন মেলা বা রোড শো-তে বিজ্ঞাপনের অনন্য হাতিয়ারে কিও কার্পিন হয়ে উঠল শহর থেকে গ্রামে অবিসংবাদিত একাধিপত্যের অধিকারী। বাজারে এল আরও দুটি বডি অয়েল।

আরো পড়ুন:  বাংলার এই কোম্পানির উৎপাদিত তেলের জন্যে বিনা পারিশ্রমিকে বিজ্ঞাপন লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এরপরের ইতিহাস শুধুই শিখর ছোঁয়ার। সারেগামাপা থেকে আইপিএল – রিয়ালিটি শো থেকে বিনোদন জগতে বিনিয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে কিও কার্পিন। মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়িয়েছে দে’জ মেডিক্যাল। ২০১৫ সালে ভারতের ‘মোস্ট ট্রাস্টেড হেয়ার অয়েল ব্র্যান্ড’ হিসেবে সম্মানিত হয় এটি। বেশ কয়েকবার লাভ করেছে সুপারব্র্যান্ডের অভিধাও। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি আর উত্তরপ্রদেশে একটি ফ্যাক্টরি রয়েছে এই ব্র্যান্ডের। পরাধীন ভারতে দেশের মানুষের প্রয়োজনে অতি স্বল্প পরিসরে যে যাত্রা শুরু করেছিল একটি ছোট্ট ওষুধের দোকান; বাঙালীর স্বপ্নে আর উদ্যমে কালক্রমে তাই হয়ে উঠল ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত একটি অন্যতম ব্যবহার্য ও প্রয়োজনীয় বস্তুর সবথেকে বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড। বাংলার ঘরে ঘরে সমাদৃত এই তেলটির সুগন্ধ আরো অনেক শতাব্দি যাবৎ ব্যাপ্ত হোক বাংলা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে – বাঙালীর জয়ধ্বজা উড়ুক জগৎব্যাপী! কিও কার্পিন বেঁচে থাক বঙ্গবাসীর হৃদয়ে!

-শ্রেয়সী সেন

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।