কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরে গড়ে উঠেছিল এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা

কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরে গড়ে উঠেছিল এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা

চিড়িয়াখানায় তো আমরা সবাই গেছি, ছোটবেলায় বাবা মার হাত ধরে, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে। বড় হয়ে কখনও আবার নিজেদের সন্তানকেও নিয়ে গেছি। আমরা বাঙালিরা চিড়িয়াখানা মানেই বুঝি আলিপুর চিড়িয়াখানা। কিন্তু জানেন কি, কলকাতার প্রথম তো বটেই, এমনকী ভারতের প্রথম, এশিয়ার প্রথম আর খুব সম্ভবত পৃথিবীর চতুর্থ চিড়িয়াখানা ছিল কলকাতার খুব কাছেই ব্যারাকপুরে।

সময়টা ১৮০২-১৮০৩ সাল। তখনও পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে সাধারণ দর্শকদের জন্য চিড়িয়াখানা খোলা হয়েছিল মাত্র তিনটি। প্রথমটি ভিয়েনায় (১৭৬৫), দ্বিতীয়টি মাদ্রিদে (১৭৭৫), তৃতীয়টি প্যারিসে (১৭৯৫)। এমনকী ‘জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’ তখনও তৈরি হয়নি (তৈরি হবে ১৮২৬ সালে)। লন্ডন চিড়িয়াখানাও তখনও দূর অস্ত্‌, তার শুরু ১৮২৮ সালে, আর সেখানে সাধারণ দর্শকের ঢুকতে তখনও ৪৩ বছর দেরি। রাজারাজড়াদের চিড়িয়াখানায় প্রজাদের প্রবেশাধিকার নেই। সেই সময়ই তৈরি হয় এই ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা। বিশ্বের প্রাকৃতিক ইতিহাসে বৈপ্লবিক এই কাজটি করেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক উদ্যোগী পুরুষ, ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড রিচার্ড কলি ওয়েলেসলি।

আরো পড়ুন:  ‘যে স্বপ্ন দেখতে পারে না, অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারে না’-চারু মজুমদার

লর্ড ওয়েলেসলি গভর্নর জেনারেল পদে কলকাতায় ছিলেন ১৭৯৮-১৮০৫ পর্যন্ত। আমাদের রাজভবনও তিনিই তৈরি করেন। তাঁর বেশ কয়েকটি কাজই ছিল সাধারণ মানের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে এবং সেগুলি বাস্তবে পরিণত করতে কোনও বাধাই তিনি মানেননি। একাধিক বার কোম্পানির ডিরেক্টরদের না জানিয়ে, প্রচুর খরচ করে সেই কাজ শেষ করেছেন। ১৮০৩ সালে কলকাতায় একটি বিরাট অট্টালিকাও বানান, নাম ছিল ‘ক্যালকাটা গভর্নমেন্ট হাউস’, আজ যার নাম ‘রাজভবন’। এছাড়া ১৮০০ সাল থেকে ব্যারাকপুরে গঙ্গাতীরে তৈরি করা শুরু করলেন বিলিতি ধাঁচের এক বাহারি উদ্যান— ‘ব্যারাকপুর পার্ক’। কাজ শুরু করার তিন বছরের মধ্যেই সেই পার্কের আয়তন গিয়ে দাঁড়াল ১০০৬ বিঘা। সেই পার্ককে এখন আমরা ‘লাটবাগান’ বা ‘মঙ্গল পান্ডে উদ্যান’ নামে জানি। পার্কে আর এক প্রাসাদ তৈরির কাজ যখন চলছে, তখন অস্থায়ী ভাবে থাকার জন্য গঙ্গার তীর ঘেঁষে বানালেন একটি বড় দোতলা বাড়ি। প্রাসাদ আর শেষ হয়নি, ক্রমে ওই দোতলা বাড়িটিই হয়ে উঠল ‘ব্যারাকপুর গভর্নমেন্ট হাউস’, সব গভর্নর জেনারেল আর ভাইসরয়দের প্রিয় ‘কান্ট্রি হাউস।

আরো পড়ুন:  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাটশিলা থেকে মুছে গেছে বাংলা ভাষা

অনেক খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন জায়গা থেকে পশু পাখি নিয়ে এসে রাখা হয় এখানে। কিন্তু লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০৫ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় চিড়িয়াখানার গবেষণা মূলক কাজ কর্ম। তবে চিড়িয়াখানা আরো ৭৫ বছর চলেছিল।এখানে বিভিন্ন প্রজাতির জীব ছিল ।বিভিন্ন পাখি যেমন সারস, উটপাখি, পায়রা, ও আরও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। ভাল্লুক,বাঘ এবং নানা প্রজাতির পশু ও এখানে রাখা হয়েছিল।এরপর ১৮১৭ থেকে ১৮১৯ এর মধ্যে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস এর আমলে নির্মাণ করা হয় একটি নতুন পাখি শালা। এরপর ১৮২২ সালে একটি নতুন পশুশালা নির্মাণ করা হয়। ১৮৭৭ পর্যন্ত বাঘ-সিংহের খাঁচাগুলো ছিল। আজ আর পশুশালার বাঘ-সিংহের খাঁচাগুলোও অবশিষ্ট নেই। যদিও আজ ব্যারাকপুর চিড়িয়া মোড়ে ওয়ারেন হেস্টিংসের চিড়িয়াখানা আর কোন চিহ্নই দেখা যায় না। ১৮৩০ সালে লর্ড আমহার্স্ট এর পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায়, এখানে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা বাঘ, তিব্বতি বাইসান ,ভাল্লুক, লেপার্ড, বেবুন, সাদা বাদর ,জিরাফ ইত্যাদি। এরপর ১৮৭৬ সালে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড উদ্বোধন করেন আলিপুর চিড়িয়াখানার। তখন লর্ড লিটন ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানায় থাকা অবশিষ্ট পশুপাখিগুলিকে পাঠিয়ে দেন আলিপুর চিড়িয়াখানায়। বিভিন্ন পশু পাখির সঙ্গে ছিল একটি কচ্ছপ । পরে এর নাম রাখা হয়েছিল আদিত্য। ২০০৬ সালে আলিপুর চিড়িয়াখানায় এটি মারা যায়। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ব্যারাকপুরের হেস্টিংস চিড়িয়াখানার ইতিহাস।

আরো পড়ুন:  ডাইনোসরের নামকরণেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,আবিষ্কারে জড়িয়ে আছেন বাঙালী বিজ্ঞানীরা

তবে এখন আর সেই রাজাও নেই, রাজত্বও নেই। ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানায় এখন কার্যত অতীত স্মৃতিটুকুও নেই। সেখানে গেলে এখন ঘন গাছ, ঝোপঝাড়ে ভাল করে হাঁটাটুকুও যাবে না। গেলে সেভাবে ভগ্নাবশেষও নেই। ভারতের প্রথম চিড়িয়াখানা এভাবেই অনাদরে সকলের বিস্মৃতিতে রয়ে গেছে।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।