তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ উপাধি “র‌্যাংলার” সম্মান পেয়েছিলেন

তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ উপাধি “র‌্যাংলার” সম্মান পেয়েছিলেন

আমরা কেউ বোধহয় অস্বীকার করতে পারব না রাজা রামমোহন রায়,বিদ্যাসাগর মুক্ত চিন্তা চেতনা ও সমাজ সংস্কারের যে আলো জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিলেন,সেই আলোর দিশায় ভারতে নব-জাগরণের সরণীকে আরও দীর্ঘ ও প্রশস্থ করা মানুষদের তালিকায় তিনি থাকবেন একেবারে সামনের সারিতে৷তিনিই প্রথম ভারতীয়, একমাত্র বাঙালি যিনি ইংল্যান্ডের শিক্ষাজগতের অত্যন্ত সম্মানের “র‌্যাংলার”উপাধি পেয়েছেন৷ তিনি আনন্দমোহন বসু ।

সবার কৌতুহল হওয়া স্বাভাবিক “র‌্যাংলার”এর আসল সংজ্ঞাটা কি৷ কারন এই শব্দটির সাথে আমরা হয়ত অনেকেই সম্যক ভাবে পরিচিত নই৷ইংল্যান্ডের বিশ্ববন্দিত বিশ্ববিদ্যালয় কেমব্রীজ ইউনির্ভাসিটির গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ উপাধি হল “র‌্যাংলার”৷মেধাবী আনন্দমোহন বসু একমাত্র ভারতীয় তথা বাঙালি যিনি ১৮৭৪ সালে গণিতের তিনটি পরীক্ষা দিয়ে প্রতিবারই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘র‌্যাংলার’ উপাধি অর্জন করেছিলেন৷বাপ-কাকারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে ছিলেন স্বপ্রতিষ্ঠিত। ময়মনসিংহ জেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের পদ্মলোচন বসুর তিন ছেলে— হরমোহন, আনন্দমোহন এবং মোহিনীমোহন। অবিভক্ত ভারত ও আজকের বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে ১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেছিলেন আনন্দমোহন বসু৷ বাবা পদ্মলোচন বসু,মা উমাকিশোরি দেবী।ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী আনন্দমোহন বসুর শিক্ষার প্রাথমিক পর্বের সূচনা ময়মনসিংহে৷ মেধাবী আনন্দমোহন বসু ১৮৬২ সালে তখনকার হার্ডিঞ্জ স্কুল,আজকের ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৮৬২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করে এনট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন। কলকাতায় এসে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে৷সেখান তাঁর পরীক্ষায় সাফল্য সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়৷ এফ.এ, ও বি.এ,পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার৷অসাধারন রেজাল্টের জন্য ১৮৭০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেলেন “প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি৷ উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমালেন বিদেশে,গন্তব্য ইংল্যান্ড৷সাবজেক্ট গণিতশাস্ত্র৷ ১৮৭৪ সালে সেখানে গণিত বিষয়ক সর্বোচ্চ পরীক্ষায় গণিতের তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ভারতীয় তথা বাঙালি “র‌্যাংলার” সম্মান লাভ করেন৷”র‌্যাংলার” উপাধি লাভ করেও ছেদ পড়ল না তাঁর পড়াশোনার জীবনে৷গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার বছরেই অর্থাৎ ১৮৭৪ সালে ‘বার-এট-ল’ ডিগ্রী লাভ করলেন ইংল্যান্ডে, দেশে ফিরে আইনকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন৷

আরো পড়ুন:  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস

ছাত্রাবস্থায় আনন্দমোহন বসু স্বর্ণপ্রভা দেবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন৷সহধর্মিনী স্বর্ণাপ্রভা দেবী আবার ছিলেন বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী আচার্য জশদীশচন্দ্র বসুর ভগিনী৷তৎকালীন সমাজে নারী শিক্ষার অবরুদ্ধ দুয়ার নারীদের জন্য উন্মোচিত করে দিতে আনন্দমোহন বসু ছিলেন বদ্ধপরিকর৷আর সেই কারনেই বলা যায় নবজাগরনের পথপ্রদর্শক রামমোহন,বিদ্যাসাগরের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আনন্দমোহন বসুর নাম৷তিনি বঙ্গ সমাজের নবজাগরণের এক যোদ্ধা৷পরাধীন ভারতের সন্তান হয়ে “র‌্যাংলার” উপাধি লাভ ঠিক কতটা কঠিন ছিল সেটি সহজেই অনুমেয়৷ ইংরেজ শাসিত ভারতের মানুষকে সব দিক দিয়ে দমিয়ে রাখাই ছিল ব্রিটিশদের নীতি৷সেই শোষণ আর শাসনকে অতিক্রম করে এক তরুন বঙ্গসন্তানের ইংল্যান্ডের গণিত শাস্ত্রে সর্বোচ্চ উপাধি লাভ একেবারেই সহজ ছিল না ! কিন্তু আনন্দমোহন বসুর পাণ্ডিত্য এত উচ্চমার্গীয় ছিল প্রতিভাকে দমিয়ে রাখা যায়নি,বরং সেই হিসেবে বলা যায় আনন্দমোহন বসুর এই সাফল্য আসলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পরাধীন ভারতের মানুষের এক বিপুল বিজয়৷শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক আনন্দমোহনকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে বাঙালি জাতি৷ নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে তিনি সকলকে উদাত্ত কন্ঠে আহ্বান জানান। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এই বিদ্যালয়টিকে অবশ্য বেথুন স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়৷ ১৮৭৯ সালে আনন্দমোহন বসু প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতার সিটি কলেজ,বাংলাদেশের “আনন্দমোহন কলেজের” প্রতিষ্ঠাতার নাম আনন্দমোহন বসু ৷উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে ১৮৬৯ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন আনন্দমোহন বসু৷ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিলেন বিদেশ থেকে দেশে ফিরে।তবে ব্রাহ্মসমাজেও নানা বিষয়ে সভ্যদের মধ্যে মতান্তর হয়৷ আনন্দমোহন তখন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ নামে একটি নতুন সংগঠনের জন্ম দিলেন৷নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় ১৮৭৬ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বঙ্গমহিলা মহাবিদ্যালয়’,যদিও পরে তার সঙ্গে বেথুন স্কুলের সংযোগ ঘটানো হয়৷বেথুন স্কুলের দুই ছাত্রী কাদম্বিনী বসু এবং সরলা দাশ, আনন্দমোহন বসু ও দুর্গামোহন দাসের বিশেষ উদ্যোগে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার উপযুক্ত বিবেচিত হলেন। ১৮৭৮ সালে প্রথম মহিলা হিসেবে কাদম্বিনী বসু এন্ট্রান্স পাশ করার গৌরব অর্জন করেন৷ কার্যত এভাবেই বাংলায় নারী শিক্ষার দুয়ার খুলে যায়৷এরও কিছু বছর পরে আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের আন্দোলনে ১৮৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভের দাবি মেনে নেয় এবং ১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু প্রথম মহিলা স্নাতক হবার গৌরব অর্জন করেন। ‘বেঙ্গল প্রভিনসিয়াল কমিটির মাধ্যমে আনন্দমোহন বসু ১৮৮১-৮২ সালে ছাত্রীদের জন্য হোস্টেলেরও ব্যবস্থা করেছিলেন৷ইদানীং অনেকে বলেন রাজনীতি আমার একেবারেই পছন্দ নয় ! তবে সেকাল বোধহয় একালের মত এমন ছিল না ! বরং সমাজের অত্যন্ত উচ্চমেধার মানুষেরা প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতিতে৷সেই রাজনীতির মূল লক্ষ ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও অর্জন৷ব্যতিক্রম ছিলেন না মেধাবী আনন্দমোহন বসু৷উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করলেও সেইসময় তিনি খোদ ইংল্যান্ডেই আরও কিছু ভারতীয়দের সাথে তৈরি করেছিলেন “ইন্ডিয়া সোসাইটি”৷

আরো পড়ুন:  লকডাউনের অবসরে নতুন আবিষ্কার,অভিনব ল্যান্ডমাইন ডিটেক্টর বানিয়ে চমক আসানসোল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাঁচ পড়ুয়ার

ইংরেজদের শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাঁর রক্তে,অস্থিতে মজ্জায় ছিল খাঁটি স্বদেশপ্রেম৷১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হল ‘স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন’। একই বছরে আনন্দমোহন বসুর সক্রিয় সহযোগিতায় শিশির ঘোষ এবং তাঁর ভ্রাতা মতিলাল ঘোষ প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ইন্ডিয়া লীগ’৷ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের প্রতিষ্ঠিত তাঁর “‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ বা ‘ভারত সভা”প্রথম সাধারণ সম্পাদক আনন্দমোহন বসু, ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি সম্পাদকের পদ অলংকৃত করেছেন৷রাজনীতির প্রতি অমোভ আকর্ষন বরাবর ছিল আনন্দমোহন বসুর,মূল ধারার রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন ১৮৯৮ সালে৷বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধীতা করেছিলেন৷এমন কি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আনন্দমোহন বসু । আনন্দমোহন বসুর হয়ে সেই সভায় সভাপতির বক্তব্য পাঠ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আর এক প্রখ্যাত মানুষ,নামটা শুনতে চাইছেন?তাহলে শুনুন তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ ১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট আকাশের তারা হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান আনন্দমোহন বসু৷প্রগতিশীল হৃদয়,সমাজকর্মী, শিক্ষানুরাগী, বিচক্ষন রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গীয় নবজাগরনে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন আনন্দমোহন বসু, যার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কালোত্তীর্ণ এক মানুষ।

আরো পড়ুন:  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দূরবীন থেকে শুরু করে শতবর্ষপ্রাচীন পিয়ানো, সবই আছে নক্কুবাবুর সংগ্রহে

-অরুনাভ সেন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।